অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে পরিবেশ সুরক্ষায় শুধু বক্তৃতা আর লোকদেখানো কর্মসূচি ছাড়া দৃশ্যমান কিছুই হয়নি বলে মনে করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর ভাষায়, ঘোষণা ছিল অনেক, কিন্তু কাজের প্রমাণ নেই। বিদায়ের সময় নতুন সরকারের কাঁধে দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর উপদেষ্টা শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ও পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ, পলিথিন বন্ধ, নদী-খাল উদ্ধার, রাজধানীতে সবুজায়ন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। এমনকি প্রতিটি জেলায় একটি করে নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে একটি নদীকেও মুক্ত করা যায়নি বলে দাবি তাঁর। তিনি অভিযোগ করেন, উল্টো নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বেড়েছে, ফলে অনেক স্থানে ভাঙন তীব্র হয়েছে এবং নদীর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর সময়েই সিলেটে সাদাপাথর লুটের ঘটনা ঘটল। পরিবেশ উপদেষ্টা তো ওই দিকেরই মানুষ। উনি কিছু করেননি, বরং উনি হাসাহাসি করেছেন। ওনার হাসাহাসির কারণে এই কাজে ওনার সম্পৃক্ততা ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
নদীর তালিকা প্রণয়ন নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁর বক্তব্য, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন পূর্বে ১০০৮টি নদনদীর একটি পদ্ধতিগত তালিকা করেছিল এবং সেখানে নদীর একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন নদী পাওয়া গেলে সেই তালিকায় যুক্ত করার সুযোগ রাখা ছিল। কিন্তু উপদেষ্টা তালিকাটি বাতিল করে নতুন তালিকা প্রণয়ন করেন, যেখানে নদীর সংখ্যা চার শতাধিক বৃদ্ধি পায়। তাঁর অভিযোগ, নতুন তালিকায় একই নদী একাধিকবার যুক্ত হয়েছে এবং অনেক নদী বাদ পড়েছে। তালিকাটি গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়ায় বর্তমানে অফিসিয়ালভাবে নদীর নির্ভরযোগ্য তালিকা নেই-যা নদী দখলের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, সাধারণত নদীকে খাল বলা হলে প্রথমে সেটা চিকন হয়ে যায়, পরে তা ড্রেনে রূপান্তরিত হয়। পটুয়াখালীতে সুতিয়াখালী খালকে সংকুচিত করতে করতে ওটা ড্রেন হয়ে গেছে। পরে সেই ড্রেনের ওপর দিয়ে রাস্তা করে ফেলেছে।
তিনি বলেন, নদীর ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সংজ্ঞা নির্ধারণ ছাড়া তালিকা করা উচিত নয়। জেলা প্রশাসন ও ভূমি প্রশাসনের তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা হওয়া উচিত। নিজের উপজেলার কুতুবপুর নামে একটি নদী নতুন তালিকা থেকে বাদ পড়ার উদাহরণ টেনে তিনি বিষয়টিকে ‘অস্বচ্ছ ও অপরিকল্পিত’ বলে অভিহিত করেন। পরিবেশ উপদেষ্টার পলিথিন নীতিকেও তিনি ভুল সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পলিথিন বন্ধের ঘোষণা কার্যকর হয়নি। পলিথিন তো কমেইনি, উল্টো কিছু মানুষের সঙ্গে গন্ডগোল হয়েছে। পলিথিন বন্ধের নামে অভিযানের ভয় দেখিয়েও চালু রয়েছে পলিথিন কারখানা। এর পেছনে আর্থিক লেনদেন আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। ‘নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং পলিথিনের পুরুত্ব ও মূল্য বৃদ্ধি করে পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা যেত,’ বলেন তিনি। উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, সেখানে টেকসই ও দামি ব্যাগ ব্যবহারের মাধ্যমে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে রাস্তাঘাটে পলিথিন পাওয়া যাবে না। কারণ ব্যাগগুলো পুরু, দামি ও পুরোনো হয়ে গেলে বিক্রি করা যায়। বাংলাদেশেও ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ পরিবেশ কর আরোপ করে পলিথিনের ব্যবহার কমানো যেত। রিজওয়ানা হাসানের মামলা করার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, রিজওয়ানা হাসান প্রচুর মামলা করেন। বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানি, শিপ বিল্ডার্স, ডায়িং কারখানার বিরুদ্ধে সপ্তাহে দুই-তিনটি মামলা করতেও আমি দেখেছি। সেখানে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানকেও বিবাদী করা হয়, সচিবদেরও করা হয়। সমস্যা হচ্ছে অনেক সময় মামলা করার পর আর খোঁজ রাখেন না। এতে মামলাগুলো তামাদি হয়ে যায়। রায়ে খারিজ হয়ে যায়। এতে উল্টো অপরাধীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য তাঁর কাছে মামলার তালিকা চেয়েছিলাম। তিনি দেননি। কয়েকবার তাঁর প্রতিষ্ঠান বেলাকে চিঠি দিয়েছি। একটা খণ্ডিত লিস্ট দিয়েছিলেন, যেখানে বিস্তারিত ছিল না। তিনি বলেন, ওনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে বিভিন্ন ডেভেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করে সেখান থেকে টাকা নিয়ে থেমে যান। এটা ওনার আয়ের অন্যতম পথ। এমন বহু অভিযোগ শুনেছি। সহস্রাধিক ডাইং ফ্যাক্টরি আছে। সেখানে গেলে ওনার কাহিনি জানবেন। শিপ বিল্ডার্সদের কাছে যান, সেখানেও তাঁর বিষয়ে জানতে পারবেন। শিপ বিল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের লোকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা ওনাকে ভয় পায়, কারণ উনি কথায় কথায় মামলা করে দেন। আমার দৃষ্টিতে পরিবেশ হচ্ছে ওনার জন্য রুটি রুজির পথ। তিনি পরিবেশের নামে চাঁদাবাজি করে মূলত অপরাধীদের পক্ষ নেন। তাঁকে আমার দেখার সুযোগ হয়েছে, জানার সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন লোক আমার কাছে এসে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে। তবে সব অপরাধের প্রমাণ থাকে না। যারা দুর্নীতি করে, যারা পরকীয়া করে, তারা কোনো প্রমাণ রাখে না। রিজওয়ানা হাসান বিভিন্ন গার্মেন্টে, ডায়িং কারখানায় গিয়ে মামলার হুমকি দিয়ে চাঁদা নেন-এমন অভিযোগ আছে, কিন্তু প্রমাণ নেই। এজন্য বাংলাদেশের মতো দুর্নীতির শীর্ষে থাকা ১৮ কোটি মানুষের দেশে বছরে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়ে শাস্তি পায় সর্বোচ্চ ২০০-৩০০ জন। সিঙ্গাপুরে এর চেয়ে বেশি হয়।
এ ছাড়া উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া বড় প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত, যাতে আর্থিক লেনদেন ও কমিশন-সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যায়। তিনি উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণীর স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানান। সাক্ষাৎকারের শেষাংশে মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পরিবেশের নামে লোকদেখানো কিছু উদ্যোগ ছাড়া দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। দূষণ, নদী দখল ও অব্যবস্থাপনা আগের মতোই রয়ে গেছে।’ এই দেড় বছর পরিবেশের ইতিহাসে কুখ্যাত ও নিকৃষ্ট একটা শাসনকাল হিসেবে গণ্য হবে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।