৪০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ও সাবেক সচিব খায়রুল ইসলাম (মান্নান), তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান মিম ও ছেলে মোরসালিন ইসলাম সৌরদ্বীপের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়াও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার মাস্টারমাইন্ড যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পিসহ অজ্ঞাতনামা ছয়-সাতজনের বিরুদ্ধে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা দুটি দায়ের করেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান।
৪০ কোটি টাকা পাচারের বিষয়ে জসীম উদ্দিন খান জানান, অভিযুক্তরা মেঘমালা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও মেঘমালা স্টেট লিমিটেড নামে দুটি নামসর্বস্ব কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ২০১২ সালে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নামে ২০ কোটি টাকা করে ৪০ কোটি টাকা ঋণ নেন। সিআইডির অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঋণের অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করতে তা বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণের ওই অর্থ মোরসালিন ইসলাম সৌরদ্বীপের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার হিসাবে জমা করা হয়। পরে সেখান থেকে ৪০ কোটি টাকা ডেবিট করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক বনশ্রী শাখায় ‘ইউনিয়ন ব্যাংক (প্রস্তাবিত)’ নামে একটি হিসাবে জমা দেওয়া হয়।
প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া ওই ঋণের অর্থ দিয়ে মোরসালিন ইসলাম সৌরদ্বীপ ইউনিয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠালগ্নে স্পন্সর শেয়ার কেনেন। এভাবে আসামিরা ঋণের ৪০ কোটি টাকা পরিশোধ না করে প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাৎ করেন এবং অপরাধলব্ধ অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করেন। এ ঘটনায় খায়রুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে গুলশান থানায় মামলা করা হয়েছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সাবেক নির্বাহী সদস্য খায়রুল ইসলাম ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএসের দায়িত্বে ছিলেন।
এদিকে কাউন্সিলর বাপ্পির মামলার বিষয়ে জসীম উদ্দিন খান জানান, মিরপুর এলাকার প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাজুল ইসলাম চৌধুরীর আয়-ব্যয় ও সম্পদ অর্জনের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি পরিবহন খাত, ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার, গার্মেন্টসের ঝুট কাপড় এবং ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে ‘স্মার্ট ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত ‘মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটার স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বাপ্পি মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৫ টাকা আয় করেছেন বলে দাবি করেন। আয়ের উৎস হিসেবে পোশাক ব্যবসা, মাছ ব্যবসা এবং ইটভাটা পরিচালনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। একই সময়ে পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৮৩ হাজার ২৭০ টাকা। সে হিসেবে তাঁর সম্ভাব্য সঞ্চয় দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫ টাকা। কিন্তু সিআইডির অনুসন্ধানে তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য পাওয়া গেছে প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৪৭১ টাকা। ফলে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩৮৬ টাকার উৎস দেখাতে পারেননি তিনি।
এ ছাড়া বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিকস নামের ইটভাটাটি নিষিদ্ধ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে সিআইডির অনুসন্ধানে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫১ টাকা অবৈধভাবে অর্জন, স্থানান্তর ও রূপান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।