দখিন দুয়ার খুলে বসন্ত এসে গেছে। ঋতুরাজকে স্বাগত জানিয়ে রঙিন ফুল-পাতায় সেজেছে প্রকৃতিও। শীতের ধূসরতা ঝরিয়ে মাটির বুকে নেমেছে রঙের উৎসব। কচি পাতার সবুজে, কৃষ্ণচূড়ার আভায় আর ফাগুনের আগুনরঙা শিমুল-পলাশের দাহনে জেগে উঠেছে বাংলা। বাতাসে লেগে আছে অচেনা মাদকতা, কোথাও অদৃশ্য বাঁশির সুর যেন ডেকে বলে- এসো, নবীন হও।
কিন্তু শহরে তার দেখা পাওয়ার জো আছে! উঁচু অট্টালিকার ভিড়ে নীল আকাশ ছাড়া আর কোনো রঙের দেখা খুব একটা মেলে না। শুধু কংক্রিটের দেয়ালে দেয়ালে আটকে থাকে ঋতুর গন্ধ। এমনকি ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যায় কোকিলের কুহুতানও। তবে ফাগুনের আগুন রঙা শিমুল-পলাশ ফুল দেখার জন্য হাপিত্যেশ করা মনের বসন্ত বিলাসের জন্য যেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এখন ঋতুরাজকে স্বগত জানিয়ে এক বন্ধন তৈরি করেছে। বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরে, পুরোনো গাছের ছায়াঘেরা পথের ধারে, লাল-কমলা ফুলের উচ্ছ্বাসে এ ক্যাম্পাসে বসন্ত নেমে আসে একেবারে হাতের মুঠোয়। যেখানে হালকা বাতাসে দুলে উঠছে কচি পাতা, রোদ ঝরে পড়ে সোনালি মায়ায় আর পাখিদের ডানায় ভেসে বেড়ায় অনন্ত উল্লাস। প্রকৃতিকন্যা খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্তের আগমনি বার্তা যেন লাল খামে ভরে সবার আগে পৌঁছে দিয়েছিল পলাশ। পাতাহীন ডালে ডালে তার রক্তিম পাপড়ি জ্বলে উঠেছে এমনভাবে, যেন অরণ্যের বুকের ভিতর কেউ একমুঠো সূর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, নিঃশব্দে আগুন জ্বলছে। কিন্তু সে আগুন দহন নয়, উল্লাসের, সে আগুন ক্ষয় নয়, নবজাগরণের। কিংশুক, ‘অরণ্যের অগ্নিশিখা’ এই পলাশই প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য ক্ষণিক হলেও তার আলো দীর্ঘস্থায়ী। যেন তারুণ্যের হাসি, হঠাৎ উজ্জ্বল, হঠাৎই অন্তর্ধান। তবু সে মিলিয়ে গেলেও রয়ে যায় উষ্ণ ছাপ। প্রকৃতিপ্রেমীদের ভাষ্য, পলাশের নেশা ধীরে নয়, হঠাৎ করেই চেপে বসে। তার রং চোখে লাগে, তার পর মনে-স্মৃতিতে। ফাল্গুন-চৈত্রের হাওয়ায় যখন সে ফোটে, গাছ থাকে সম্পূর্ণ নিরাবরণ- ঠিক যেন সব আড়াল সরিয়ে দিয়ে হৃদয়ের গোপন আবেগ প্রকাশ করছে। কুঁড়িগুলো বাঘের নখের মতো বাঁকানো, আর ফোটার পর প্রতিটি পাপড়ি আগুনরাঙা পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শারমীন শহীদ লাবণী বলেন, ময়মনসিংহের বুকে এ ক্যাম্পাস যেন বসন্তের নিজস্ব ঠিকানা। বছরের এই একটা সময় যেখানে ক্লান্ত মন একটু থেমে দাঁড়ায়, গভীর করে শ্বাস নেয়। মনে হয় জীবন এখনো রঙিন, এখনো নতুন করে শুরু করার সময় আছে। কারণ বসন্ত কেবল ঋতু নয়, এক অনুভব, শুধু দৃশ্য নয়, আছে জাগরণের প্রতিশ্রুতিও।