পিনপতন নীরবতায় কাটছিল প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীদের অলস সময়। স্টল আছে, বই আছে কিন্তু নেই আশানুরূপ দর্শনার্থী ও ক্রেতা। স্টলগুলোতে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বিক্রয়কর্মীরা অলস সময় পার করার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ করেছেন স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের নীরবতা। করুণ দৃষ্টিতে উদ্যানে মানুষ খুঁজে বেড়ানোর দৃশ্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীদের চেহারায় ফুটে উঠেছে হতাশার ছাপ? তবে, এত হতাশার মধ্যেও বিক্রি ভালো ছিল প্রকাশনা সংস্থা অবসর, ঐতিহ্য, অন্যপ্রকাশ, অন্যধারাসহ হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনীর স্টলে। বিকালে অবসর প্রকাশনীর সামনে কথা হয় রাজধানীর বাড্ডা থেকে আগত ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অভি সরকারের সঙ্গে। তিনি কিনলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও বিভূতিভূষণ রচনা সমগ্র। জানালেন রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় সব লেখকের রচনা সমগ্র তার সংগ্রহে আছে। এ প্রজন্মের মানুষ হয়েও ক্ল্যাসিক বইগুলো তাকে টানে বলে জানালেন অভি সরকার। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে ক্লাস এইটের ছাত্ররা ম্যাক্সিম গোর্কি পড়ে। তিনি জানান, তার সব বন্ধুই বইয়ের পোকা।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, রমজানের কারণে এবারের মেলায় আমাদের প্রত্যাশা কম। তবে, যতটা খারাপ হবে ভাবছিলাম ততটা খারাপ হচ্ছে না। অন্যদেরটা বলতে পারব না, আমাদের অবস্থা হচ্ছে মন্দের ভালো।
জোনাকী প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী সোহান ও সাইদুন্নবী জানান, মেলায় লোকজন কম এলেও যারা এসেছেন তারা প্রায় সবাই বই কিনেছেন। এই দুই বিক্রয়কর্মী জানান, ১৩ মার্চ শুক্রবার থেকে মেলা জমে উঠবে, আর ১৫ মার্চ সমাপনী দিন পর্যন্ত শেষ তিন দিন মেলায় আশানুরূপ দর্শনার্থীর আগমন ঘটবে ও আশাতীত বিক্রি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই প্রকাশক।
রুবিনা আলমগীরের ‘অপূর্ণতা’
পুথিপ্রকাশ থেকে এবারের মেলায় প্রকাশিত হয়েছে রুবিনা আলমগীরের উপন্যাস ‘অপূর্ণতা’। পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত পুথিপ্রকাশের ৩২৩-৩২৪ নম্বর স্টলে। এটি রুবিনা আলমগীরের তৃতীয় উপন্যাস। এর আগে ২০২৪-এর বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মকান্না’ ও ২০২৫-এর মেলায় প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দীর্ঘশ্বাস’। দুটি বই-ই প্রকাশ করে জোনাকী প্রকাশনী। তৃতীয় উপন্যাস ‘অপূর্ণতা’ নিয়ে রুবিনা আলমগীর জানান, এ সমাজে মেয়েদের অগ্রযাত্রাকে সুকৌশলে আটকে রাখা হয়। মেয়েদের থামিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে তাদের চরিত্রে আঘাত করা হয়। নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে ঘুনেধরা সমাজের প্রতিবন্ধকতা নিয়েই রচিত হয়েছে ‘অপূর্ণতা’ উপন্যাসটি। বইটি সব শ্রেণির পাঠকদের দ্বারা সমাদৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রকাশক সুজন বিশ্বাস।
মো. শাহজাহান সাজুর ‘নিউরাল ভাইরাস : চেতনার নীল দহন’
অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে এবারের মেলায় এসেছে মো. শাহজাহান সাজুর সায়েন্স ফিকশনধর্মী বই ‘নিউরাল ভাইরাস : চেতনার নীল দহন’। বইটিতে লেখক বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে অত্যন্ত সহজ অথচ কাব্যিক শব্দশৈলীতে উপস্থাপন করেছেন। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫০ টাকা। বইটির সফলতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন লেখক মো. শাহজাহান সাজু।
ভাড়া ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলা একাডেমিকে প্রকাশকদের চিঠি
বইমেলার স্টল ভাড়া শতভাগ মওকুফ করার পরেও কয়েকজন প্রকাশকের আংশিক স্টল ভাড়া ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে। ফলে বর্তমানে বইমেলায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একদল প্রকাশক সম্পূর্ণ বিনাভাড়ায় অংশ নিচ্ছেন, অথচ আরেক দল প্রকাশক আংশিক ভাড়া দিয়ে একই মেলায় অংশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি স্পষ্টতই একটি বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক অবস্থা। যেসব প্রকাশক আংশিক স্টল ভাড়া পরিশোধ করেছেন, তাদের সেই অর্থ অবিলম্বে এবং বইমেলা শেষ হওয়ার আগেই ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বাংলা একাডেমির প্রতি দাবি জানান প্রকাশক নেতারা। গতকাল বাংলা একাডেমিকে এক চিঠির মাধ্যমে এ দাবি জানান তারা। চিঠিতে প্রকাশক নেতারা বলেন, যেসব প্রকাশক আগ্রহ ও সদিচ্ছা থেকে বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেছিলেন এবং নিয়ম মেনে আংশিক স্টল ভাড়া পরিশোধ করেছিলেন, তারাই এখন অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিলম্বের শিকার হচ্ছেন।
এটি প্রকাশকদের প্রতি এক ধরনের দ্বৈতনীতির বহিঃপ্রকাশ বলেই প্রতীয়মান হয়। প্রকাশকদের মধ্যে সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা বইমেলা আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাই এ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হওয়া জরুরি।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল অমর একুশে বইমেলার ১৩তম দিনে নতুন বই এসেছে ১৪৬টি। আর গত ১৩ দিনে মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ১ হাজার ১৪২টি।
মূল মঞ্চ বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেন হরিশংকর জলদাস। সভাপতিত্ব করেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।
আলোচনা পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মজিদ মাহমুদ, মঈনুল হাসান, স্নিগ্ধা বাউল এবং ড. নাঈমা খানম। আবৃত্তি করেন সুষ্মিতা জাফর, তাসনোভা তুশিন। সংগীত পরিবেশন করেন বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, দেলোয়ার হোসেন বয়াতি, শার্লি মার্থা রোজারিও, আশীষ শীল, মানসিফ তাজরিয়ান, নোশিন তাবাসসুম এবং মো. আসাদুজ্জামান। আরও ছিল জিয়া সাংস্কৃতিক জোটের শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।