দক্ষিণ ইউরোপের বৃহত্তম দেশ স্পেন। বাংলাদেশের অভিবাসন প্রত্যাশীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে বর্তমানে স্পেনে প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন। সম্প্রতি দেশটির সরকার ৫ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধকরণের ঘোষণা দিয়েছে। সেই সুবাধে দেশটিতে বসবাসরত বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেরও প্রায় ২৫ হাজার প্রবাসী বৈধ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তবে বৈধতার জন্য আবেদনের প্রধান দুটি শর্ত পাসপোর্ট ও বাংলাদেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই দুটি ডকুমেন্ট জমা দিতে পারলে ভাগ্য খুলে যাবে তাঁদের। আগামী এপ্রিল মাসের শুরু থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হতে পারে। সরকারের ঘোষণার পর থেকেই স্পেনে বসবাসরত অনিয়মিত অভিবাসীরা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা শুরু করেছেন। বিশেষ করে পাসপোর্ট ও আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে দেশে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকার সনদ বা ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ নিজ দেশ থেকে সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করছেন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব ডকুমেন্ট হাতে না পাওয়ার আশঙ্কা ভুগছেন হাজারো প্রবাসী। এতে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশির সহজ শর্তে বৈধ হওয়ার স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হতে পারে।
অভিযোগ উঠেছে, পাসপোর্ট তৈরি ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট আবেদনের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হচ্ছে। কিছু অসাধু চক্র ২০ ইউরো থেকে ৫০ ইউরোর বিনিময়ে দূতাবাসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি বাংলাদেশ দুতাবাসে জানানোর পরও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তবে তারা বলছে, যারা আসছেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট না থাকলেও তাঁদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, স্পেন সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর দূতাবাসের কর্মকর্তারা বহুবিধ কনস্যুলার সেবা প্রদানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একই কথা জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও। বৈধকরণের সংবাদ প্রকাশের পর থেকে নতুন পাসপোর্ট তৈরির আবেদনপ্রক্রিয়া ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট আবেদনের জন্য স্পেনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসেও কাজের চাপ বেড়েছে।
স্পেনে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশি সংগঠন ‘ভালিয়ান্তে বাংলা’-এর সভাপতি মো. ফজলে এলাহী বলেন, অনিয়মিত অভিবাসন প্রত্যাশী এসব বাংলাদেশি কর্মহীন, অর্থহীন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁদের দূতাবাসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে, এটা অমানবিক। সহজ শর্তে বৈধ হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে এখানকার অনিয়মিত অভিবাসীরা খুবই উপকৃত হবেন এবং বাংলাদেশেও তাঁরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। বাংলাদেশের নতুন সরকার যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তত স্পেনে অভিবাসীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পাসপোর্ট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রদান করলে অবৈধ অভিবাসীরা স্পেন সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই বৈধ হতে পারবেন।
বাংলাদেশ দূতাবাসে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদের জন্য আবেদন করেছেন আবজাল আহমেদ। তিনি জানান, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন বাংলাদেশে পাঠিয়ে যাচাই শেষে সার্টিফিকেটটি স্পেনে ফেরত আনাতে হবে। জেলা, থানা ঘুরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় হয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট তৈরি হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। স্পেন সরকারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি বাংলাদেশ থেকে সার্টিফিকেটটি আনাতে না পারি, তবে সহজ শর্তে বৈধ হওয়ার সুযোগ আমাকে হারাতে হবে।
‘স্পেন বাংলা’ প্রেস ক্লাবের সভাপতি আফাজ জনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যখন অভিবাসীদের বিষয়ে কঠিন হচ্ছে, সেখানে স্পেন সহজ শর্তে অভিবাসীদের বৈধ হওয়ার একটি সুযোগ দিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর পর স্পেন সরকার এ সুযোগ দিল। তাই এ সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, ‘স্পেনের জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ও পাসপোর্ট যাতে বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রদান করা হয়, সেজন্য আমরা প্রবাসীকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছি। আশা করছি, বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।’ প্রবাসীদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ও পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিড়ম্বনায় বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘স্পেন প্রবাসীরা যেন তাঁদের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস দ্রুত পেতে পারেন, এই বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’
স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, স্পেনের ঘোষণায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ২০ থেকে ২৫ হাজার অনিয়মিত প্রবাসী বাংলাদেশি বৈধ হওয়ার আওতায় সুযোগ নিতে পারবেন। দূতাবাস প্রবাসীদের ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট, ডেলিভারি ও জটিলতা নিরসন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদের আবেদন সত্যায়ন এবং অন্যান্য বহুবিধ কনস্যুলার সেবা প্রদানে অক্লান্ত ও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
গত ২৭ জানুয়ারি স্পেন সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ৫ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি ডিক্রি অনুমোদন দেওয়া হয়। ২৮ জানুয়ারি অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যাঁরা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে অন্তত পাঁচ মাস স্পেনে বসবাস করেছেন অথবা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন, তাঁরা বৈধতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এপ্রিল মাসের শুরু থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হতে পারে।