নতুন অঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সহানুভূতির সম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ‘ইমোশনাল ডোনার’ হিসেবে অঙ্গ দানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে গেজেট পাসের চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো ইমোশনাল ডোনারের কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়নি। তবে ইমোশনাল ডোনারের কিছু আবেদন যাচাইবাছাইয়ের অপেক্ষায় আছে। প্রচারের অভাবে ইমোশনাল ডোনারের বিষয়ে অনেকেই জানে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে।’ কিডনি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান র্যালি, আলোচনা সভাসহ সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে।
গত বছরের ১৯ নভেম্বর মানব অঙ্গপ্রতঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে আরও সহজ করতে অধ্যাদেশে তিনটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে নিকট আত্মীয়দের মধ্যে ভাগনে-ভাগনি, ভাতিজা-ভাতিজি ও সৎ ভাই-বোনও অঙ্গ দান করতে পারবেন। আত্মীয় না হলেও স্লাব প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এক দাতা-গ্রহীতা জুটি অন্য জুটির সঙ্গে অঙ্গ বিনিময় করতে পারবে, যদি কোনো একটি জুটির জীবিত দাতার অঙ্গ অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ইমোশনাল ডোনার ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নিকট আত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা বা সহানুভূতিগত সম্পর্ক থাকলে কোনো ব্যক্তি অঙ্গ দান করতে পারবেন।
ইমোশনাল ডোনার হতে হলে বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে, মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে এবং সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় সম্মতি দিতে হবে। কোনো আর্থিক প্রলোভন, চাপ বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকা যাবে না। গ্রহীতার নিকটাত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের পরিচিত হতে হবে এবং তাকে নিঃস্বার্থ দাতা হিসেবে নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সুপারিশ থাকতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি, বাণিজ্যিক বা আর্থিক প্রলোভনে অঙ্গ দানে আগ্রহী ব্যক্তি এবং যেকোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যা তাকে দাতা হিসেবে অনুপযুক্ত প্রমাণ করে তারা ইমোশনাল ডোনার হতে পারবেন না। ইমোশনাল ডোনার নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদানের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন আইন সংশোধনের পর ‘ইমোশনাল ডোনার’-এর মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অনেকেই আবেদন ফরম সংগ্রহ করছেন। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বেশ কয়েকটি আবেদন জমাও পড়েছে। যাচাইবাছাই শেষে সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এ সেবাকে অটোমেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে আবেদন করা যায়। তবে তার মতে, এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা এখনো কম। তাই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো জরুরি। তিনি আরও বলেন, দেশের ভিতরেই ইমোশনাল ডোনারের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের সংখ্যা বাড়িয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা কমানোই তাদের মূল লক্ষ্য। রোগীরা যেন কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য না হন, সে ব্যবস্থাই গড়ে তুলতে চায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকরা জানান, দেশে কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে। নতুন রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অথবা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছে। দেশে প্রতি বছর ৪০০-এর মতো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) এবং জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট এ চার প্রতিষ্ঠানে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হচ্ছে। ১৯৮২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৩ সালে বিএমএইউ এবং কিডনি ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ক্যাডভেরিক (ব্রেন ডেথ রোগীর কিডনি) ট্রান্সপ্ল্যান্ট শুরু করেছে। তবে গত বছর একটাও ক্যাডভেরিক ট্্রান্সপ্ল্যান্ট হয়নি। কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, সরকার নিকটাত্মীয়র গি বাড়ানোয় ট্রান্সপ্ল্যান্টের গতি বেড়েছে। কিন্তু ইমোশনাল ডোনার নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ইমোশনাল ডোনার থেকে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করব না। কারণ এতে অনৈতিক কিছু ঘটতে পারে। এতে পুরো প্রক্রিয়া বিতর্কিত হতে পারে। ফলে ভারত-পাকিস্তানের মতো বৈধ তুলনায় অবৈধ ট্রান্সপ্ল্যান্ট বেড়ে যেতে পারে। যা কিডনি রোগীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। সারা দেশে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের সেন্টার বাড়াতে হবে এবং সেবার পরিসর আরও বিস্তৃত করতে হবে। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নীরব ঘাতক কিডনি রোগের প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। কিডনি রোগ প্রতিরোধে ভেজাল খাবার খাওয়া যাবে না। ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।