১৯৭১ সালের ৩০ ও ৩১ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাকসেনারা কুষ্টিয়া দখল করে নেয়। খবরটি পৌঁছে যায় মেহেরপুর মহকুমায়। তখনকার মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। ট্রেজারিতে থাকা অস্ত্র আনসার ও মুজাহিদদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের কুষ্টিয়ার যুদ্ধে পাঠানো হয়। তখনো মেহেরপুর ছিল শত্রুমুক্ত। একই সময় এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও আনসার অ্যাডজুট্যান্ট আকবর আলীর উদ্যোগে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করে মেহেরপুর হাইস্কুল মাঠে শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। সে সময় মেহেরপুর সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আবদুল মালেক। তৌফিক ইলাহীর অনুপ্রেরণায় তিনিও থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল হাতে প্রশিক্ষণে যোগ দেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই পাকহানাদার বাহিনী মেহেরপুরে আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠলে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। হৃদয়পুর ইয়ুথ ক্যাম্পে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের বিহারের চাকুলিয়ায় উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তারা। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মেহেরপুরের যুদ্ধ ছিল মূলত গেরিলা কৗশলনির্ভর-‘হিট অ্যান্ড রান’। আঘাত হেনে দ্রুত সরে পড়া। টানা ৯ মাস চরম কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যান। ক্যাপ্টেন আবদুল মালেক বলেন, তৎকালীন এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ‘ক্যাপ্টেন’ পদবি ধারণ করে মেহেরপুর সাব-সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অস্ত্র সরবরাহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ট্রেজারি লুট হওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ বস্তাবন্দি করে ভারতে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেন। মেহেরপুরের যুদ্ধের সাফল্যের পেছনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তার অনুপ্রেরণায় শিকারপুরে সম্মুখযুদ্ধের পাশাপাশি দারিয়াপুর, বাগোয়ান ও মুজিবনগরসহ বিভিন্ন স্থানে লড়াইয়ে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধারা। মোনাখালী ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে গেলে পাকবাহিনী টের পেয়ে গুলি চালায়। পাল্টা গুলিতে তুমুল সংঘর্ষ হয়, যদিও সেদিন কেউ হতাহত হয়নি। অন্যদিকে বাগোয়ান গ্রামে অ্যামবুশের সময় শত্রুপক্ষ মুজিবনগর থেকে নাটুদাহ ক্যাম্পে যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁদে পড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই যুদ্ধে কিয়ামুদ্দীন নামে এক অল্পবয়সি যোদ্ধা শহীদ হন। সব শেষে ক্যাপ্টেন আবদুল মালেক বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বিনীত দাবি-বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জীবিত আছেন। এ এক-তৃতীয়াংশ মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য মুক্তিযোদ্ধাদের দ্রুত যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা যেন সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকতে পারি।’