অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী কোনো বিচ্যুতি ছিল না। বরং এ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রণীত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি অপরিহার্য রক্ষাকবচ। বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করে গত ২০ নভেম্বর এ রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। ওই রায়ের ৭৪ পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন।
বেঞ্চে অন্য ছয় বিচারপতি হলেন- বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী (বর্তমান প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান (অবসর) ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। ওই রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল ও পুনরুজ্জীবিত করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে তৎকালীন আপিল বিভাগের রায় সম্পর্কে এ রায়ে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী রায়টি ছিল অনুমাননির্ভর এবং ত্রুটিপূর্ণ। তৎকালীন আপিল বিভাগ বলেছিলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনির্বাচিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করে। শুধু তাই না, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। একজন প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টার হওয়া জন্য প্রভাবিত হতে পারেন এ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো আইন বাতিল করা মানে হচ্ছে তা অনুমাননির্ভর রায়। এ ধরনের অনুমাননির্ভর রায় বিচার বিভাগের আইন প্রণয়নমূলক জ্ঞান এবং সংশোধনমূলক ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করে। শুধু তাই না, ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘অগণতান্ত্রিক’ এবং ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনের পরিপন্থিী’ হিসেবে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এ রায়ে বলা হয়েছে, জনগণের সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয় না, বরং জনগণের প্রকৃত সম্মতির প্রতিফলন ঘটে এমন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই তা কার্যকর হয়। আদালত রায়ে বলেছেন, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অনাস্থা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার একটি জাতীয় ঐকমত্যের ফসল। ত্রয়োদশ সংশোধনী কেবল একটি সাধারণ আইন ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল জনগণের সর্বোচ্চ আকাক্সক্ষার প্রতিফলন এবং একটি রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
রায়ে বলা হয়েছে, একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি শুধু শুধু তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে, এ ব্যবস্থাটির উদ্ভব হয়েছে একটি একটি অনন্য রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে। এ ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত আস্থার সংকট কাটানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিরপেক্ষ করে সবার জন্য সমান ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা করেছে। ফলে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আদালত রায়ে অভিমত দিয়েছেন যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এ অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছিল, তাই এটি নিজেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে। ২০১১ সালের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৯ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনকে সর্বোচ্চ আদালত ‘গণতন্ত্রের করুণ পরিণতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন রায়ে। আদালত বলেছেন, তাত্ত্বিক গণতন্ত্রের চেয়ে কার্যকর ও বাস্তবমুখী গণতন্ত্রের জন্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অপরিহার্য।
পূর্ববর্তী রায়ের (বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের রায়) সংক্ষিপ্ত আদেশ এবং পূর্ণাঙ্গ রায় বের হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে সংসদে সংবিধানের ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’ পাসের প্রক্রিয়া নিয়েও পর্যালোচনা উঠে এসেছে এ রায়ে। আদালত বলেছেন-২০১১ সালের সংক্ষিপ্ত আদেশে পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার কথা থাকলেও তৎকালীন সংসদ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। আদালতের মতে, এটি ছিল বিচার বিভাগের ওপর আইন বিভাগের এক ধরনের হস্তক্ষেপ এবং আদালতের নির্দেশনার লঙ্ঘন।
প্রকাশিত রায়ে পৃথক পর্যবেক্ষণে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেছেন, ‘জনগণই সংসদ ও আদালতের প্রকৃত মালিক। সংবিধান ধ্বংসের জন্য নয়, বরং যারা সংবিধানকে কলুষিত করে তাদের উৎখাতের জন্যই জনগণ সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখে। আপিল বিভাগের এ বিচারপতি আরও বলেছেন, সংবিধানকে কেবল একটি অক্ষরের দলিল হিসেবে দেখলে হবে না, এর ভিতরের মূল স্পৃহা দিয়ে বুঝতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের ফলে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, এ রায়ের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত হলো। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে দেশে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। আর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন। সেই সরকারের প্রধান ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তখন তিনি প্রধান বিচারপতির পদ ছেড়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ অন্যরা ১৯৯৯ সালে একটি রিট করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাই কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ রায় দেন। সেই রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকে। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল করে রিট আবেদনকারীপক্ষ। এ আপিল মঞ্জুর করে ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে (৪:৩) ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণঙ্গ রায় প্রকাশ হলে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে।