রাজধানীর ব্যস্ত এলাকার মধ্যে অন্যতম তেজগাঁও রেলগেট সড়ক। রেলগেটের পাশের সড়কে হলুদ সাইনবোর্ডে লেখা ‘রাস্তার উন্নয়ন কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ রাস্তার এক পাশ লাল রশি দিয়ে ঘিরে রেখে মাটি খোঁড়া চলছে। দাঁড়িয়ে থেকে শ্রমিকদের কাজ দেখছিলেন আশপাশের বাড়ির কয়েকজন বাসিন্দা। পাশের হাশেম মঞ্জিলের মালিক মাহতাব আহমেদ বলেন, এই রাস্তা ভাঙা, এবড়োখেবড়ো ছিল। এলাকাবাসী বারবার কাউন্সিলরকে বলে বিভিন্ন জায়গায় জানিয়ে রাস্তার সংস্কার করানো হয়েছিল। সিটি করপোরেশন সুন্দর পিচঢালা রাস্তা করে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পার হতে না হতেই পিচ কেটে মাটি খুঁড়ে ওয়াসা পাইপ বসানোর কাজ করেছে। এর ছয় মাস পার না হতেই এখন আবার রাস্তা খুঁড়ে তিতাস গ্যাসের লাইন বসানোর কাজ করছে। এভাবে বারবার রাস্তা খোঁড়ার কারণে এলাকাবাসী এবং এ পথ ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। শুধু ভোগান্তি নয়, সরকারের অর্থের অপচয়ও হয়।
সরকার সাতটি মন্ত্রণালয় এবং সেবা সংস্থার সমন্বয়ে জনকল্যাণে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিটি সংস্থা আলাদাভাবে তাদের পরিকল্পনা করায় এবং অর্থ ছাড় বিভিন্ন সময়ে হওয়ার কারণে এক সংস্থার কাজ শেষ হওয়ার পর ওই একই জায়গাতে আরেক সংস্থা কাজ শুরু করে। এতে প্রকল্পের সুবিধার চেয়ে অসুবিধা পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের বিষফোড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা। এর ফলে জলে যাচ্ছে জনগণের ট্যাক্সের শত শত কোটি টাকা। কিন্তু কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না মানুষ। তাই এ ভোগান্তি এবং অপচয় কমিয়ে এনে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে টাস্কফোর্স গঠন করছে সরকার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামকে সভাপতি করে সব সেবা সংস্থার প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে এ টাস্কফোর্স।
এ ব্যাপারে আবদুস সালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাজধানীতে এত দিন আমরা দেখে এসেছি এক সংস্থা রাস্তা কাটে, আরেক সংস্থা আবার সেটি ভরাট করে। এ বিশৃঙ্খলা ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ডেসকোসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সরকারি জায়গা, ফুটপাত দখল, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও সমন্বয়হীন প্রশাসনের কারণে ঢাকা মহানগর চরম সংকটে পড়েছে। এই সমন্বয়হীতা দূর করে ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাস্কফোর্স গঠন করে দিয়েছেন। আমাকে টাস্কফোর্স প্রধানের দায়িত্ব দিয়েছেন। এখানে প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন সব সেবা সংস্থার প্রধান ব্যক্তিরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই টাস্কফোর্স মূলত সব সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে কাজ করবে। কোন প্রতিষ্ঠান কখন কী প্রকল্প নিচ্ছে সেটা দেখবে। এর ফলে এক জায়গাতে একাধিক সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্প থাকলে তা এক সময়েই সম্পন্ন করা হবে। যাতে করে এক রাস্তা বারবার খোঁড়ার প্রয়োজন না হয়। একজন কাজ শেষ করার ছয় মাস পর আরেকজন কাজ করলে জনগণের ভোগান্তি হয়, রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়। এ সমস্যার সমাধানে টাস্কফোর্স সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করবে। আসলে সেবার সমন্বয়হীনতা দূর করতে নগর সরকার প্রয়োজন। যেখানে এক ছাতার নিচে জনগণ সব সেবা পাবে। নগরের মেয়র এই সেবা বাস্তবায়ন করবেন। তাহলে জনভোগান্তি কমে আসবে।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সব সেবা সংস্থা সমন্বয় করে প্রকল্প নেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের আইন রয়েছে। কোনো সংস্থা না মানলে তারা চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। সমন্বয় ফেরাতে টাস্কফোর্স গঠন ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে কাজ না করলে টাস্কফোর্সের হাতে শুধু চিহ্নিত করা নয়, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে হবে।’ ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। রাজধানীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, রাস্তা, খাল পরিষ্কার, মশক নিধনসহ বেশ কিছু নাগরিক সেবা দেয় সিটি করপোরেশন। পানি সরবরাহ করে ওয়াসা। বিদ্যুৎ আসে ডিপিডিসি ও ডেসকোর মাধ্যমে। গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। সড়ক ও আবাসনের তদারকি করে রাজউক, পরিবহন বিষয় দেখে করে বিআরটিএ, আইন প্রয়োগ করে পুলিশ। এমনভাবে নাগরিক সেবায় যুক্ত আছে প্রায় ২৫টি সংস্থা। প্রতিটি সংস্থা আলাদা মন্ত্রণালয়ের অধীন। ফলে এক কাজ বারবার করা হয়। রাস্তায় বারবার খোঁড়াখুঁড়ি তারই উদাহরণ। সড়ক, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। যানজট, জলাবদ্ধতা ও দূষণ বাড়ে। নাগরিক সেবা হয় জটিল ও অকার্যকর।