রহস্যজনক মামলায় দুই দফায় ১১ বছর জেলে রাজধানীর শান্তিবাগের বাসিন্দা আকরামুল আহসান কাঞ্চন। প্রথম দফায় আট বছর জেল খাটার পর ২০২১ সালে জামিনে মুক্তি পান। এরপর ২০২৩ সাল থেকে আবার তিন বছর ধরে আটক রয়েছেন। আকরামুল আহসানের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মানব পাচারসহ ৫২টি মামলা। কিন্তু এসব মামলার অধিকাংশ বাদীকে তিনি চেনেন না।
তার অভিযোগ, বাদীরা ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করায় তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এসব বাদীর খোঁজ পেতে সিআইডির প্রতি নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে রিট করেন তিনি।
মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, মামলার বাদী খুঁজে না পাওয়ায় আকরামুল আহসান কাঞ্চন ৩৮টি মামলাতে অব্যাহতি ও খালাস পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ মে থেকে তিনি দ্বিতীয় দফায় জেল হাজতে আটক রয়েছেন। হাই কোর্টে রিট করার পর এ নিয়ে ইতোমধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বর্তমানে একের পর এক মামলার বিষয়টি অধিকতর অনুসন্ধান করছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকরামুল আহসানকে জেলে আটকে রেখে মামলাবাজ সিন্ডিকেট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তার ফ্যাক্টরি দখল করে নেয়, এরপর তা মাসিক ৫ লাখ টাকায় ভাড়া দিয়েছে। গত বছরের ২৯ জুলাই সাতক্ষীরা জেলার সদর থানায় আকরামুল আহসান ও আবজাল হোসেন নামে দুজনের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করেন ছালেহা বেগম নামে এক নারী।
চলতি বছরের ১২ মার্চ মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা সাতক্ষীরা থানার এসআই সোহরাব হোসেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, আকরামুল আহসানরা তিন ভাই এবং এক বোন। ঢাকা রাজারবাগ দরবার শরিফের পেছনে তাদের ৩ শতক জমির ওপর তিন তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি আছে। ১৯৯৫ সালে তাদের বাবা মারা যান। এরপর তাদের মা কমরের নেহার, বড় ভাই আক্তার ই কামাল এবং একমাত্র বোন ফাতেমা আক্তার পীর দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। এরপর ভাইবোন তাদের পৈতৃক সম্পত্তির অধিকাংশই দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করেন। পীর দিল্লুর রহমান আকরামুল আহসান ও তার অপর ভাই কামরুল আহসান বাদলকেও তাদের পৈতৃক সম্পত্তি দরবার শরিফের নামে হস্তান্তরের জন্য চাপ দিতে থাকে। তারা রাজি না হওয়ায় পীর বিভিন্ন অনুসারীদের দ্বারা দেশের বিভিন্ন জেলায় মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। আর বাদী অবৈধভাবে প্রভাবিত হয়ে ওই দুই আসামির বিরুদ্ধে মানব পাচারের মিথ্যা মামলা করেছে।
সূত্র জানায়, আকরামুল আহসানের বিরুদ্ধে সিরিজ মামলা করে জেলে আটকে রাখা হয়। ২০২৩ সালের ৩০ মে নারায়ণগঞ্জের একটি সিআর মামলায় আত্মসমর্পণ করেন। ওই বছরের ২৪ জুলাই তার জামিনের আদেশ জেল গেটে পৌঁছায়। ২৬ জুলাই বান্দরবানের একটি মানব পাচারের মামলায় তাকে ফের আটক করা হয়। ওই বছরের ২৫ অক্টোবর বান্দরবান জেলে পাঠানো হয়। ৩ নভেম্বর বান্দরবান থেকে ঢাকায় আনা হয়। ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলে পাঠানো হয়। এ বছরের ১৯ জানুয়ারি চাঁদপুরের মানব পাচার মামলায় সেখানে হাজির করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে কক্সবাজার জেলে পাঠানো হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পরই জামিন হয়। ৬ মার্চ কক্সবাজার থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলে আনা হয়। ২৫ মার্চ নারায়ণগঞ্জে জামিন হয়। সেখান থেকে ২৮ মার্চ ঢাকা জেলে আনা হয়। ২ এপ্রিল তাকে ফের আটক দেখানো হয়। ২৮ জুন ঢাকা থেকে কক্সবাজার পাঠানো হয় হাজিরার জন্য। ৬ জুলাই কক্সবাজার থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলে নেওয়া হয়। ১৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা জেলে আনা হয়। ১৯ অক্টোবর ঢাকা থেকে বান্দরবান জেলে পাঠানো হয়। ৬ নভেম্বর আশুলিয়া থানার আরেক মামলায় তাকে আটক দেখানো হয়। গত বছরের ২৫ জানুয়ারি বান্দরবান থেকে কক্সবাজার পাঠানো হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি তাকে আবার ঢাকা জেলে আনা হয়। ৫ মার্চ ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলে পাঠানো হয়। এরপর তাকে বান্দরবান নেওয়া হয়। ২৪ জুলাই বান্দরবান থেকে ঢাকা জেলে আনা হয়। আশুলিয়া থানার মামলায় জামিন হওয়ার পর ২৮ জুলাই সাতক্ষীরা থানার মানব পাচার মামলায় তাকে ফের আটক দেখানো হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা জেলে পাঠানো হয়। ৬ নভেম্বর সাতক্ষীরায় তার জামিন হয়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর পল্টন থানার আরেকটি মানব পাচার মামলায় আটক দেখানো হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় জামিন হলে টেকনাফ থানার আরেকটি মামলায় আটক দেখানো হয়। এর আগে ২০২১ সালে আদালতে রাজারবাগ পীর দিল্লুর রহমান ওরফে অরুণ মিয়াসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন রাজধানীর বাসাবোর আবদুল কাদির নামে এক ব্যক্তি। ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি ওই মামলার অনুসন্ধান প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন সিআইডির ঢাকা মেট্রো-পশ্চিমের এসআই সিরাজ উদ্দিন।