নাপাইচণ্ডী। ২৪৩ বছর আগে ব্রিটিশবিরোধী যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এক স্থান। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার মন্থনার জমিদার জয়দুর্গা দেবী (দেবী চৌধুরাণী) এখানেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন। এ যুদ্ধে তাঁর ছোট ভাই কেষ্টকিশোর চৌধুরী, ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায়সহ অসংখ্য ফকির-সন্ন্যাসী শহীদ হন। ইতিহাসে এটি ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ হিসেবেও খ্যাত। ১৭৮৩ সালের বৈশাখ মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একই বছর রংপুরের অন্য অংশে নূরুলদীনের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যা ইতিহাসে রংপুর ধিং বা কৃষক বিদ্রোহ হিসেবে বিখ্যাত। সেই স্মৃতির স্মরণে প্রতি বছর বৈশাখের বৃহস্পতিবার নাপাইচণ্ডীতে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলার আয়োজকরা জানান, মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরাণীকে স্মরণে রাখতে প্রতি বছর এ মেলা বসানো হয়। বৈশাখের প্রতি বৃহস্পতিবারই মেলা জমজমাটভাবে চলে। এবার মেলায় শিশুদেও জন্য নাগরদোলাসহ আকর্ষণীয় আরও অনেক রাইড রাখা হয়েছে। মেলায় প্রায় ২০০ দোকানপাট বসেছে। সেই সঙ্গে মেলায় যেন মানুষ নির্বিঘ্নে এসে আনন্দ উপভোগ করতে পারে সে লক্ষ্যে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিপীড়ন থেকে কৃষক-প্রজাকুলকে রক্ষার পাশাপাশি বর্ধিত করের বোঝা থেকে রক্ষা পেতে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। ওই সময় দেবী চৌধুরাণী ইংরেজদের কাছে ছিলেন ত্রাস। তিনি নৌপথে ওদের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করে গায়েব হয়ে যেতেন। বজরা বা বিশেষ নৌকায় বসবাস করতেন। তবে প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন দেবীমাতা বা চণ্ডীমাতা। পরে চণ্ডীগ্রামের স্থলযুদ্ধে বীরের মতো লড়াই করে তিনি শহীদ হন। পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে পাকা রাস্তার পাশেই নাপাইচণ্ডী। এ গোপন আস্তানার সন্ধান পেয়ে চণ্ডীপুর গ্রামে ইংরেজ বাহিনী আচমকা আক্রমণ শুরু করে। তিনি ফকির-সন্ন্যাসীদের নিয়ে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে এখানে নিহত হন। তাঁর সঙ্গে নিহত হন অসংখ্য ফকির-সন্ন্যাসী। এরপর তাঁদের স্মরণে এ স্থানের নাম পরিবর্তন হয়ে দাঁড়ায় ‘নাপাইচণ্ডী’। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় জয় না পাওয়া বা কোনো কিছু না পারাকে ‘না পাইম’ বা ‘না পাই’ বলা হয়। দেবী চৌধুরাণী ইংরেজবিরোধী যুদ্ধে পারলেন না, হেরে গেলেন-এ কারণে চণ্ডীপুর গ্রামের এ স্থানটির নাম হয়ে যায় নাপাইচণ্ডী। তাঁরই স্মৃতির স্মরণে প্রতি বছর বৈশাখের বৃহস্পতিবার ওই স্থানে মেলা হয়।
জানা যায়, চণ্ডীপুর গ্রামটি ছিল ইংরেজবিরোধী বিদ্রোহী পীর-ফকির-সন্ন্যাসীদের শক্তিশালী গোপন ঘাঁটি। আলাইকুড়ি নদী থেকে দুটি সংযোগ খাল কেটে গোপন দুর্গভবনে সংযোগ দেওয়া হয়। এ সংযোগ খালে দেবী চৌধুরাণীর নৌকার বহর রাখা হতো। চণ্ডীপুরের গোপন দুর্গভবনে নবাব নুরউদ্দিন বাকের জং, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরাণী এবং শিবচন্দ্র রায় মাঝে মাঝে গোপন সভায় মিলিত হয়ে ইংরেজবিরোধী সংগ্রামের রণকৌশল নির্ধারণ করতেন। ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত দেবী চৌধুরাণীসহ ফকির-সন্ন্যাসীদের যেখানে সমাহিত করা হয়েছিল, ওই স্থানটির নামকরণ হয় ‘পবিত্রঝাড়’। এ ছাড়া ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাঠের মাঝখানে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর উত্তরে লাগোয়া আর একটি দালানের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। দালান দুটির সামনে রয়েছে একটি বিরাট পুকুর। জরাজীর্ণ দালানটিকে মসজিদ ও ধ্বংসাবশেষ দালানের অংশটিকে মন্দির বলে অনেকে মনে করেন। মসজিদের ভিতর প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি দরজা। উত্তর ও দক্ষিণে আরও দুটি সরু জানালা রয়েছে। মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১৫ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪ ফুট। ভূমি থেকে কার্নিশ পর্যন্ত উচ্চতা ১৫ ফুট। মসজিদের দেয়ালে কোনো ফলক বা নামলিপি না থাকায় এটি ঠিক কত সালে নির্মিত হয়েছে জানা যায়নি। তবে স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে দেবী চৌধুরাণী ওই স্থানে নিহত হলেও এটি নির্মিত হয়েছে মোগল আমলে। তবে ঐতিহাসিক এ স্থানটি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।