বজ্রপাতে গতকাল সুনামগঞ্জে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, রংপুর ও ময়মনসিংহে প্রাণ গেছে আরও ছয়জনের। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জে বিভিন্ন উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুরে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, দিরাই ও তাহিরপুর উপজেলায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। ধর্মপাশা উপজেলায় বজ্রপাতে হবিবুর রহমান (২২) ও রহমত উল্লাহ (১৩) নামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। হবিবুর উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের ফজলু রহমানের ছেলে এবং বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। রহমত উল্লাহ জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামের জয়নাল হকের ছেলে।
জানা গেছে, হবিবুর রহমান তার চাচার সঙ্গে টগার হাওড়-সংলগ্ন চকিয়াচাপুর গ্রামে বোরো ধান কাটতে যান। সেখানে কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাত হলে হবিবুর রহমানসহ কয়েকজন আহত হন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হবিবুরকে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়। আহতরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।
অপরদিকে দুপুর ১টার দিকে জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর ইসলামপুর গ্রামে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে ওই গ্রামের জয়নাল হক, তার ছেলে রহমত উল্লাহ এবং লাল সাধুর স্ত্রী শিখা মণি গুরুতর আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে রহমত উল্লাহকে চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। আহত জয়নাল ও শিখা মণিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামে বজ্রপাতে নুরুজ্জামান নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাগনার হাওড়ে ধান কাটার সময় হঠাৎ বজ্রপাতে নুরুজ্জামান ও তার চাচাতো ভাই গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নুরুজ্জামানকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত অপর ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে প্রেরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দিরাই উপজেলায় বজ্রপাতে লিটন মিয়া (৩৮) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার পেরুয়া আশনাবাজ গ্রামের চান্দু মিয়ার ছেলে। দুপুর ১টায় কালিয়াগোটা হাওড়ের একটি বিলের পাশে ধান কাটার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া দুপুরে তাহিরপুরে আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া (২৮) নামের একজন বজ্রপাতে মারা যান। এ সময় আরেকজন আহত হন। নিহত কালা মিয়া উপজেলার জামলাবাজ গ্রামের আবু বকরের ছেলে। জামলাবাজ গ্রামের সামনে একটি হাঁসের খামারে এ ঘটনা ঘটে। দুজনেই একই খামারে কাজে ছিলেন। ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহের দুই উপজেলায় বজ্রপাতে যুবকসহ দুজন নিহত হয়েছেন। দুপুর ২টার দিকে জেলার গৌরীপুর ও গফরগাঁও উপজেলায় বজ্রপাতে দুজন নিহতের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন জেলার গৌরীপুর উপজেলার ২ নম্বর গৌরীপুর ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামর ওলি মিয়ার ছেলে রহমত আলী উজ্জ্বল (৩০)। তিনি পেশায় মুদি দোকানি ছিলেন। অপরজন জেলার গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের মৃত সেকান্দর আলী খানের ছেলে মমতাজ আলী খান (৫৮)। ২ নম্বর গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হযরত আলী বলেন, রহমত আলী উজ্জ্বল দুপুরে বজ্রপাতের সময় বোন জামাইয়ের ধান খেত দেখতে পুর্বোনাপাড়া গ্রামে যান। সেখানে বজ্রপাত ঘটলে ঘটনাস্থলেই মারা যান উজ্জ্বল। অপর নিহত মমতাজ আলী খান উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জোহরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তখনই হঠাৎ বজ্রপাত ঘটে। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় হাওড়ে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে সুনাম উদ্দিন (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের বিবিয়ানা নদীর তীরবর্তী মমিনা হাওড়ে এ ঘটনা ঘটে। সুনাম উদ্দিন ওই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের মৃত সুন্দর আলীর ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে জীবিকার তাগিদে সুনাম উদ্দিন মমিনা হাওড়ে ধান কাটতে যান। দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ মেঘে ঢেকে গিয়ে শুরু হয় বৃষ্টি ও বজ্রপাত। এ সময় হাওড়ে ধান কাটার কাজে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নেত্রকোনা : নেত্রকোনার হাওড়ে ধান কাটা অবস্থায় বজ্রপাতে আলতু মিয়া (৬০) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আটপাড়া উপজেলার সুখারি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাতিয়া গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে। দুপুরে উপজেলার ধলার হাওড়ে ধানকাটা অবস্থায় তিনি বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সকালে বাড়ির সামনে ধলার হাওড়ে চলতি বোরো মৌসুমের ধান কাটতে যান কৃষক আলতু মিয়া। হঠাৎ বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে স্থানীয় কৃষকরা যে যার যার মতো বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে বৃষ্টি থামলে আবারও সবাই ধান কাটতে যান। এসময় ধানের জমিতে কৃষকরা আলতু মিয়ার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঝলসানো চিহ্ন দেখে স্থানীয় কৃষকরা নিশ্চিত হন বজ্রপাতে আলতু মিয়ার মৃত্য হয়েছে। পরে পরিবারের লোকজনসহ তার লাশ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান। রংপুর : রংপুরের মিঠাপুকুরে বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে দুই জেলের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১০ জন। গতকাল দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। মৃতরা হলেন উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের ছোট হযরতপুর মাঝিপাড়া গ্রামের অলিন রায়ের ছেলে মিলন রায় (৩০) ও রামেশ্বরপাড়া গ্রামের আনছের আলীর ছেলে আবু তালেব (৫৫)। তাঁরা অন্য জেলেদের সঙ্গে ছোট শালমারা বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। দুপুরে হঠাৎ পরপর কয়েকটি বজ্রপাত হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। তাঁদের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মিলন ও আবু তালেব মারা যান। আহতদের মধ্যে গোল্ডেন মিয়া, তাঁর স্ত্রী লিমা বেগম, মর্জিনা বেগম, জগদীশ রায়, সুবল, নিখিল, শামছুলসহ ১০ জনকে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গোল্ডেন ও লিমা বেগম বিলের ধারে মাছ ধরা দেখছিলেন।