দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, ডলার সংকট, ভর্তুকির চাপ ও দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে চাপে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছেন এ খাতের বিশ্লেষকরা।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী সরকারের জন্য টেকসই পথনির্দেশনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইংরেজি অনলাইন গণমাধ্যম ‘জাস্ট এনার্জি নিউজ’ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন জাস্ট এনার্জি নিউজের সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, জ্বালানি খাতে বরাদ্দ সীমিত থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। প্রাইমারি এনার্জিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যা গত এক বছরে আরও বেড়েছে।
এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রা চাপ সহজেই অনুমেয়।’
অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) বাতিল করে ওয়ান-টু-ওয়ান নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেওয়া হয়েছে, যা দুর্নীতি ও লুটপাটের পথ খুলে দিয়েছে।’
বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের অতিরিক্ত সচিব ও সদস্য (উদ্ভাবন) ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়লেও গ্যাসের ঘাটতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা খাতকে অস্থির করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম বলেন, সামনে দেশে বড় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করতে হবে। নতুন সরকারকে কঠিন সময় পার করতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এসওএএস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক হোসাইন খান বলেন, ‘গত বছর বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যার বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়েছে। এই লোকসান ঋণ বা টাকা ছাপিয়ে বহন করা সম্ভব নয়; এতে হাইপার ইনফ্লেশনের আশঙ্কা তৈরি হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ‘আসন্ন সরকারের জন্য শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও শক্তি খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ওভারক্যাপাসিটি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়াতে, বড় খরচের কেন্দ্রগুলো রিনিউয়েবল শক্তিতে ধীরে ধীরে রূপান্তর করা উচিত।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, ‘বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অনিয়ম চললে কোনো প্রতিষ্ঠান সুস্থভাবে কাজ করতে পারে না। রেগুলেটরি কমিশন, যা সেক্টরের একমাত্র নিয়ন্ত্রক, দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং অনিয়ম ও করাপশনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হাতিয়ার হয়ে গেছে।