বাংলাদেশের নেতৃত্বের আকাশে যে কয়জন নক্ষত্র ছিলেন বা আছেন, তাঁদের মধ্যে খালেদা জিয়া স্বমহিমায় একটি পৃথক স্থান করে নিয়েছেন। দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির বন্ধুর পথ হেঁটেছেন এবং তিল তিল করে নিজ মেধা, শ্রম, ত্যাগ এবং ভালোবাসা দিয়ে নিজের এমন একটি পোর্ট্রেট এঁকেছেন, যেটিকে বলা যায় তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি হয়েছেন গণতন্ত্রের কাণ্ডারি, তিনি হয়েছেন বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনা অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে নিহত হলেন।
শোকগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত বাংলাদেশের আকাশে শকুন ডানা মেলেছে। দেশকে রক্ষার জন্য ও দলের ভাঙন ঠেকাতে এগিয়ে এলেন একজন গৃহবধূ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পত্নী খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দিলেন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই শকুন সামরিক শাসনের রূপ ধরে তার করাল থাবায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র।
খালেদা জিয়া শুরু করলেন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সূর্য তখনো চোখ মেলেনি। আধো অন্ধকারে ত্রস্ত কিন্তু দৃপ্ত পায়ে রেললাইন ধরে কালুর ঘাট ব্রিজের দিকে এগিয়ে চলেছে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি সেনাদল। দলনেতা ইউনিটের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান।
তাঁর বাসার পাশ দিয়েই এগিয়ে চলেছে সেনাদল। সহযোগী লে. শমসের মবিন মেজর জিয়াকে বললেন, ‘আপনি তো চলে যাচ্ছেন, ভাবি আর বাচ্চারা তো বাসায়।’ মেজর জিয়া উত্তর দিলেন, ‘অন দ্য স্পট, উই আর অল সোলজার্স। আই এম দ্য লিডার। সো অ্যাবাউট দ্য ফ্যামিলিজ অব থ্রি হান্ড্রেড ম্যান কামিং উইথ আস, ইফ আই ক্যান নট প্রোটেক্ট দেয়ার ফ্যামিলিজ, আই শুড নট প্রোটেক্ট মাইন।
একজন মহান নেতার মহীয়সী স্ত্রীর প্রথম সংগ্রাম শুরু হলো অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ককে নিত্য সঙ্গী করে। খালেদা জিয়া দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রাত কাটালেন। পরের দিন তিনি চট্টগ্রামে তাঁর ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়র বাসায় উঠলেন। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামেই অবস্থান করেন। এর পরে তিনি ১৬ মে ১৯৭১ ঢাকায় আসেন। নিরাপত্তার স্বার্থে ক্রমাগত বিভিন্ন স্বজনের বাসায় অবস্থান নেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না, ২ জুলাই ১৯৭১ তাঁকে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার আত্মীয়র বাসা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রেপ্তার করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি তাঁর সন্তানদ্বয়সহ ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরিন ছিলেন। একদিকে তাঁর স্বামী মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত, অন্যদিকে তিনি জীবনাতঙ্কে দুই অবোধ শিশু নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনটি পর্যন্ত এই আতঙ্ক তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ৯টি মাসের পালিয়ে বেড়ানো এবং অন্তরিন অবস্থা তাঁকে ধীশক্তি, প্রজ্ঞা আর জীবনবোধে ঋদ্ধ করেছে। অর্জন করেন তিনি আপসহীনতার এক দুর্জ্ঞেয় শক্তি, যার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৮১ সালের পরবর্তী সময়ে।
তাঁর দ্বিতীয় সংগ্রাম এক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। তাঁর দ্বিতীয় সংগ্রাম জনগণের অনুভূতির সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। তাঁর দ্বিতীয় সংগ্রাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দলের ভাঙন ঠেকানো এবং দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জোটবদ্ধ রাজনীতির মাধ্যমে ‘বিশ্ববেহায়া’র বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন দুর্বার প্রতিরোধ এবং যুগপৎ আন্দোলন। রাজনীতির পঙ্কিল পথযাত্রায় তিনি বারবার গৃহে অন্তরিন হন, কারাবরণ করেন, বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি হন, অশ্লীল রাজনৈতিক অসৌজন্যতার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। কিন্তু তিনি কখনোই নিজের সৌম্য ভাবমূর্তি হারাননি এবং আপস করেননি। খালেদা জিয়া জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় এমন ব্যবস্থার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে গেছেন। ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনের অবসান ও গণতন্ত্রে ফেরার যুগপৎ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন আওয়ামী লীগ বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বৈরাচারের সঙ্গে সমঝোতার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জন তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি হয়ে উঠলেন একজন সর্বজনীন নেতা, যাঁর কাছে ক্ষমতা নয়, দেশ ও দেশের মানুষ সবচেয়ে আগে। দেশ ও মানুষের জন্য তাঁর এই ভালোবাসা এবং আপসহীন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব তাঁকে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রে পরিণত করে। ক্লান্তিহীন পরিশ্রম, গণসংযোগের লক্ষ্যে অবিরাম ছুটে চলা, আর অদম্য কৌশলের সুফল এলো ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০। ওই দিন রাতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০ মার্চ ১৯৯১ শপথ গ্রহণ করেন।
রাজনীতিতে উঠে আসা মানেই ছিল তাঁর জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি জীবন, যা তিনি পরিণতিবিহীনতা, আতঙ্ক, কারান্তরিন এবং বাধার মধ্য দিয়ে পার হয়েছেন। সেই সব পরীক্ষায় তিনি ধৈর্য, স্থিরতা, আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন।
রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতনের পর তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সমাপনান্তে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর জীবনের তৃতীয়বারের সংগ্রামে ব্যাপৃত হন। এক-এগারোর সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে বন্দি করেই কেবল ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে শারীরিক নির্যাতন করে প্রায় পঙ্গু করে ফেলে। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোসহ তিনজনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলা করে। সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনীতির মাঠে ব্রাত্য করা, অপাঙক্তেয় করে তোলা। কিন্তু তিনি এবারও দমে যাননি, হতাশ হননি এবং দেশত্যাগের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তাঁকে একটি চরম মূল্য দিতে হয়। তাঁর দুই ছেলেকে সুচিকিৎসার জন্য দেশান্তরি হতে হয়।
এক-এগারোর সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সুগভীর আঁতাত এবং ষড়যন্ত্র করে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর পর থেকেই খালেদা জিয়াকে শুধু দলগত নয়, ব্যক্তিগতভাবে অপদস্থ করার লক্ষ্য নিয়ে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অঙ্গকে লেলিয়ে দেন। তাঁর নিজ গৃহ থেকে উচ্ছেদ করা, গাড়িবহরে হামলা করা, অস্ত্র মামলা করা, তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া, গৃহে অন্তরিন রাখাসহ সব ধরনের হেনস্তার শিকার হন এই মহীয়সী নারী। এসব হীন পদক্ষেপের পরও তাঁর জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার খালেদা জিয়াকে রাজনীতির মাঠ থেকে চিরতরে নির্বাসন দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে দুটি সাজানো দুর্নীতি মামলায় ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে। অটল থাকেন দেশনেত্রী, কোনো সমঝোতায়, কোনো আপসনামায় দাসখত দিতে অস্বীকৃতি জানান।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় নেন। ৬ আগস্ট কারামুক্ত হন খালেদা জিয়া। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো তিনি সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জনগণের সামনে এলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি পাঁচ সদস্যের প্যানেল তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের দুর্নীতির অভিযোগে দেওয়া সাজা বাতিল করে। তিনি মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলেন, কিন্তু দীর্ঘ কারাবরণের সময় চিকিৎসায় অবহেলার কারণে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়ে আসার পরও অনেকটাই নিভৃতচারী হয়ে পড়েন।
খালেদা জিয়া শুধু এক রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সমাজে একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে দেশের গণতন্ত্রায়ন শক্তিশালী করতে কাজ করেছেন। তাঁর তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান, নারী নেত্রী হিসেবে তাঁর ভূমিকায় বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় নারীর অভ্যুদয়—এই বিষয়গুলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বাইরেও জাতীয় ইতিহাসে বড় গুরুত্ব রাখে। সংগঠনের নেতা, বিরোধী দলনেতা, প্রধানমন্ত্রী—সব ভূমিকাই নিয়েছেন তিনি। সেই কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টেকসই প্রভাব রেখেছেন।
খালেদা জিয়া গৃহবধূ হিসেবে শুরু করে, রাজনৈতিক দুর্যোগে এবং ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের শক্তিশালী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। স্বামীর অবর্তমানে যাঁরা তাঁকে রাজনীতিতে এনে নেপথ্যে থেকে দল পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন, অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন খালেদা জিয়া তাঁদের সবার ওপরে নিজ যোগ্যতায় স্থান করে নিয়েছেন। অটল মানসিক দৃঢ়তা, সাহস, আপসহীনতা এবং স্বামীর মতোই দেশপ্রেমের সমন্বয় বেগম জিয়াকে রাজনীতিতে অনন্য করেছে।
তিনি একজন নারী, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, যিনি রাজনৈতিক দল পরিচালনা করেছেন, যিনি মানুষের জীবনে বদল আনতে চেষ্টা করেছেন—কখনো সফল, কখনো বিতর্কে। তাঁর জীবন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক অধ্যায়। তাঁর উত্থান, যাত্রা, ত্যাগ ও সংগ্রাম সবই শেখায় যে ক্ষমতা, লড়াই, বলিদান ও সিদ্ধান্ত কখনো সহজ নয়। তবে ইতিহাসের মানদণ্ডে খালেদা জিয়ার নাম অবিচ্ছেদ্য। তিনি ছিলেন এবং আছেন ‘গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় ঐক্যের’ প্রতীক হিসেবে।
দুই সপ্তাহ ধরে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এটি তাঁর জীবনের চতুর্থ সংগ্রাম। দেশের আপামর জনসাধারণ অসামান্য এই নেত্রীর জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপা প্রার্থনা করছেন। ফিরে আসুন নেত্রী আমাদের মাঝে। বাংলাদেশের এই সময়ে আপনাকে ভীষণ প্রয়োজন।
লেখক : ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো