গত বছরের ৩৬ জুলাইয়ের পর প্রায় দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে আওয়ামী লীগকে এই উপলব্ধির মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি যে এর আগের ১৫ বছরে তারা হত্যা, গুম, দখল, চাঁদাবাজি, সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের আওয়ামীকরণ, বিচারিক ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিরোধী দলকে প্রায় অস্তিত্বহীন করে দেশকে নারকীয় সন্ত্রাসের সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে নিম্ন নেতৃত্ব পর্যন্ত কেউই জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান দমানোর উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার নির্দেশে পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো জুলাই-আগস্টের শহীদদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানে সোচ্চার হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকেই সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক দল। যারা অতীতে সব সময় ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে তাদের পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছে। এমনকি মুখে গণতন্ত্রের মন্ত্র পাঠ করে মেয়াদের পর মেয়াদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামে বিরোধী দলের প্রার্থীদের হুমকি, ভোট কেন্দ্রে ভোটারের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে বা ভোট কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে, যেভাবে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না। এটাই চিরাচরিত আওয়ামী চরিত্র।
যদি বলা হয় যে, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়ন এবং আওয়ামী লীগের অধিকসংখ্যক শীর্ষনেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং অন্যান্য কুশীলবকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্যেই ভূতের কারসাজি ছিল, তাহলে কি খুব বাড়িয়ে বলা হবে? এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কখনো মুখ খোলেনি। সম্ভবত তারা ভেবেছে, বিপদ যখন কেটেই গেছে, ওদের নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করে কী লাভ! বিপদ যে কাটেনি, তা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে অতি কাছ থেকে তাঁর মাথা লক্ষ্য করে গুলি করার ঘটনা। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। সার্জনের মতে, গুলি বিদ্ধ হয়ে খুলির বিপরীত দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। হাদি এখন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। প্রশ্ন হচ্ছে, হাদিই কী একমাত্র টার্গেট ছিল এবং ঘাতকদের টার্গেটের তালিকায় কী আর কেউ নেই?
নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরদিনই রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ, অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার, উদীয়মান এক রাজনীতিককে হত্যাচেষ্টার মধ্যেই স্পষ্ট যে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও তাদের সহায়তায় মাঠে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন।
কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এর বড় দুটি কারণের একটি হতে পারে সাবেক সরকারের আদেশে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ এবং নিহত ব্যক্তিদের লাশ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া, অর্ধমৃত যুবককে গাড়ি থেকে রাস্তায় নিক্ষেপ করার ঘটনাসহ লাশ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পরিবর্তে বহুসংখ্যক লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে গোপনে কবরস্থ করার মতো ঘটনার জেরে জনরোষের কবলে পড়ে কিছুসংখ্যক পুলিশের নিহত হওয়া, থানায় অগ্নিসংযোগ ও পলায়নপর পুলিশ সদস্যদের নিগৃহীত হওয়া ইত্যাদি কারণে পুলিশের নৈতিক মনোবল এখনো ফিরে না আসা। তাদের মনোবল সহসা ফিরে আসার কারণও নেই। ২০২৪-এর আগস্ট-পূর্ব পুলিশের সিংহভাগই তো রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত। তারা যতই সংবিধান রক্ষা ও জনণের সেবায় জান কোরবান করার শপথ নিক না কেন, তাদেরও নিজস্ব রাজনৈতিক মতামত ছিল ও রয়েছে এবং কোনো জাদুর কাঠির স্পর্শে সহসাই তাদের চিত্তের পরিবর্তন ঘটেছে তা আশা না করাই উচিত। তারা দোদুল্যমানচিত্তে কর্তব্য পালন করছে মাত্র।
গত ১৬ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে গোছাতে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন জনবল যোগ করতে পারেনি পর্যন্ত। এ ব্যর্থতার বড় আকারের খেসারত দেওয়ার ঘটনা শুরু হলো সম্ভবত শরিফ ওসমান হাদিকে দিয়ে।
দ্বিতীয় কারণ, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিদ্যমান ছোটবড় প্রতিটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দলের ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের যে সুযোগ এসেছে, তা কোনোমতে হাতছাড়া না করার প্রতিযোগিতা। যেসব দলের নেতাদের পক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের চারদিকের পথগুলো দিয়ে অতিক্রম করার সময় সেদিকে তাকিয়ে থাকা অথবা বড়জোর জাতীয় সংসদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও মাধ্যমে একটি পাস জোগাড় করে দর্শক গ্যালারিতে বসে সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করা ছাড়া আর কোনো স্বপ্নও দেখা সম্ভব ছিল না, তারাও সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ এবং ‘পিআর’ ‘পিআর’ বলে শোরগোল শুরু করেছিল। তাদের মধ্যে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার আশা জ্বলজ্বল করতে শুরু করেছিল। তাদের দিকে এই আশাগুলো ছুড়ে দিয়েছিল ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’।
জুলাই অভ্যুত্থান ও শহীদদের আত্মদানের চেতনা বাস্তবায়নের নামে ৩৩টি দলের সঙ্গে ১৬৬টি বিষয়ের ওপর ৭২ দিন আলোচনা করে ৬৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এবং এর ভিত্তিতে ঘোষণা করা হয়েছে ‘জুলাই সনদ-২০২৫’। ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে প্রায় ৯ মাস। সব বাধাবিঘ্ন এড়িয়ে যদি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী দল যথাশিগগির সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে, এ কথা সত্য। কিন্তু শেখ মুজিবের কায়দায় মাত্র ১৩ মিনিটে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা থেকে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারে উত্তরণের মতো কোনো ঘটনা না ঘটলে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হতে আরও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা বহাল থাকাকালে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে ৯০ দিনের মধ্যে। এবং এক সপ্তাহ থেকে পনেরো দিনের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশ সামরিক সরকারের অধীনে শাসিত হওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, সেসব দেশে সামরিক সরকার নানা টালবাহানা করে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ প্রলম্বিত করেছে। সামরিক সরকার চেষ্টা করে সময়ক্ষেপণ করে নিজের দল গড়ে তুলে, নির্বাচনে সেই দলের বিজয় নিশ্চিত করা। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য থাকে যথাশিগগির নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়া।
কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে ঢিমেতালে চলছে দেখে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছিল, এ সরকার কী সহসা ক্ষমতা ছেড়ে যাবে? এ প্রশ্ন সরকারকে আরও জটিল অবস্থার মধ্যে ফেলত, যদি না বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে ২০২৬ সালের জুনের সিদ্ধান্ত পাল্টে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলতেন। প্রধান উপদেষ্টার পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনের তফসিল ইতোমধ্যে ঘোষিত হওয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠান বিলম্বিত করে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ প্রলম্বিত করার যে আশঙ্কা আগে ব্যক্ত করা হয়েছিল তা কেটে গেলেও, শরিফ আবদুল হাদিকে হত্যাচেষ্টায় পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, তা কার্যত নির্বাচন অনুষ্ঠান ভন্ডুল করার চক্রান্তের অংশ বলেই মনে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক অপশক্তিকে তাদের পাহাড়সম অপরাধের জন্য ফৌজদারি আইনে প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করার সঙ্গে যখন তাদের হাঁটু গেড়ে বসিয়ে গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনীতি চর্চার দীক্ষা দান এবং ব্যক্তিকে কর্তৃত্ববাদী করে তোলার কুফল সম্পর্কে শেখানো উচিত ছিল, তখন বিএনপি তাদের প্রতি আপসমূলক ও নমনীয় মনোভাব পোষণ করেছে। সেটিকে প্রশ্রয় হিসেবে নিয়েছে সুযোগ হাতছাড়া না করা, কুটচালে সিদ্ধ আওয়ামী লীগ।
রাজনৈতিক মাঠে এখন দুই বড় পক্ষ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির সরকার পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতা থাকলেও জামায়াতের সে অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপি কার্যত নেতৃত্বশূন্য। বড় দল হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার দুঃশাসনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও, তাঁরা হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আন্দোলনই গড়ে তুলতে পারেননি। দলটি পরিচালিত হয়েছে অনেকটা বায়বীয়ভাবে। জামায়াতের অবস্থা ছিল এর বিপরীত। পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার তৈরি বিশেষ আদালতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সত্ত্বেও দলটি মনোবল হারায়নি। ত্যাগের বিনিময়ে তারা বরং দেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র ও পেশাজীবী এবং বহু মুসলিম দেশের সহানুভূতি লাভ করে ভিতরে ও বাইরে শক্তিশালী হয়েছে।
তবে তারা সংসদে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। দল সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত হলেই যে জনসমর্থন উপচে পড়ে না এবং সরকারে যাওয়া যায় না, তা প্রমাণিত সত্য। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বহু ভোটার এক কাপ চা, একটি সিগারেটের বিনিময়ে সমর্থন পাল্টে ফেলে। হাতে নোট গুঁজে দিলে কী হতে পারে?
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বলতে গেলে ওত পেতে আছে। সেজন্য তারা অনেকটা গায়ে পড়েই তাদের বিগত দিনের রাজনৈতিক মিত্র ও জোটের প্রধান অংশীদার জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো এমন ভাষায় কথা বলছে, জামায়াতের ক্ষেত্রে যে ভাষা এত দিন আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা প্রয়োগ করত।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, জামায়াতের বিরুদ্ধে বিএনপি তত মুখর হবে। দুই দলের মধ্যে সৃষ্ট টানাপোড়েনের সুযোগ নেবে অন্ধকার বা মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা আওয়ামী লীগের সুযোগসন্ধানীরা। তারা চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুরো ফায়দা নিতে কোনো সুযোগ হাতছাড়া করবে না। তাদের ওপর আশীর্বাদ হিসেবে আছেন দিল্লির নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক