গিয়াসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আমি স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়েছি। চাকরিও করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন আমি আছি, সে নেই। গিয়াসউদ্দীন বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাড়েনি, আমার অবস্থাও তথৈবচ।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আমি ভালোবাসতাম, সে বোধ করি ভালোবাসত আমার চেয়েও বেশি। নইলে একাত্তরে আমরা অনেকেই যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে প্রায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলাম, তখন গিয়াসউদ্দীন রয়ে গেল কেন? এই ভয়ংকর সময়টাতে ক্লাসটাস যা হতো, সে তো প্রহসন মাত্র। গিয়াসউদ্দীন ছিল মুহসীন হলের হাউস টিউটর। সেখানে তখন থাকত অসহায় কয়েকজন ছাত্র, যাদের ওপর হানাদাররা একাধিকবার চড়াও হয়েছে, আর ছিল আমাদের গিয়াসউদ্দীন, তার ছিল ভালোবাসা, আর ছিল দায়িত্বজ্ঞান।
১৪ ডিসেম্বর হানাদারদের পরাজয় ঘনিয়ে এসেছে, সেই সময়ে বিপন্ন ছাত্ররা খাওয়ার পানি পাচ্ছে না দেখে সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটি দূর করা যায় কি না সেটি দেখতে বের হয়েছিল গিয়াসউদ্দীন, সে অবস্থায়ই আলবদররা তাকে ধরে নিয়ে যায়। আর ফেরেনি। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা স্যারের নাম লেখা ছিল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তিদের খাতায়। এটি তিনি প্রথম টের পেলেন, যখন দরখাস্ত করলেন কলকাতা যাওয়ার পাসপোর্টের জন্য।
তাঁর বৃদ্ধা মা দিন দিন দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছিলেন; সেই মায়ের ইচ্ছা ছিল বড় ছেলেকে দেখবেন। এ জন্য ভেতরে ভেতরে ভারী চঞ্চল ছিলেন জ্যোতির্ময় স্যার, যদিও বাইরে প্রকাশ করতেন না। খুবই প্রকাশবিমুখ ছিলেন তিনি এসব বিষয়ে, সব সময়েই। অনেক চেষ্টা করেছেন তিনি নিজে, তাঁর হয়ে অন্যরাও চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ, কিন্তু কারোরই সাধ্য ছিল না মিলিটারির খাতায় যাঁর নাম লেখা রয়েছে ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে, তাঁকে পাসপোর্ট দেওয়া। প্রভোস্ট ছিলেন তিনি জগন্নাথ হলের।
সেই হলের ছেলেরা রাষ্ট্রবিরোধী সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন একটি বানানো সংবাদে সেনাবাহিনী নাকি খুব তপ্ত হয়েছিল এবং শোনা গেছে প্রভোস্টকে তারা হয়তো গ্রেপ্তার করত ২৫ মার্চের আগেই, যদি না তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভদ্রগোছের একজন লোক থাকতেন প্রাদেশিক গভর্নরের পদে। ২৫ মার্চের রাতেই তাঁকে গুলি করেছিল হানাদাররা, সময়মতো চিকিৎসা হলে হয়তো তিনি বাঁচতেও পারতেন। কিন্তু মার্চে বাঁচলেও ডিসেম্বরে বাঁচতেন কি না খুবই সন্দেহ, যেমন বাঁচেননি সন্তোষ ভট্টাচার্য, বাঁচেননি জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতারই ছাত্র রাশীদুল হাসান।
আমি যে বেঁচেছি শেষ পর্যন্ত, সেটি অবশ্য সতর্কতার কারণেই। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকতাম না। পলাতক ছিলাম ওই ৯ মাস। জানা ছিল যে খুঁজবে। অক্টোবরের ১ তারিখে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হক, মুনীর চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং ইংরেজি বিভাগের আমি-এই ছয়জন টিক্কা খানের স্বাক্ষরযুক্ত চিঠি পেলাম, তাতে মনিরুজ্জামানের ছয় মাসের জেল, অধ্যাপক হাবিবুল্লাহর চাকরিচ্যুতি এবং বাকি চারজনের রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতার উল্লেখ করে কঠিন সতর্কবাণী ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা আবারও নিশ্চিত হলাম যে আমাদের ওপর চোখ রাখা হয়েছে। শিক্ষক সমিতির সম্পাদক ছিলেন আমারই সহপাঠী ও সহকর্মী আহসানুল হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের তিনজন ক্রমান্বয়িক সাধারণ সম্পাদক, রফিকুল ইসলাম, কে এ এম সাদউদ্দীন, আবুল খায়ের ও এ এন এম শহীদুল্লাকে এরই মধ্যে আলবদররা বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে আটক করে রেখেছিল।
রাশীদুল হাসানেরও নাম ছিল মিলিটারির গুপ্ত খাতায়। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তাঁর খোঁজে আলবদরের সশস্ত্র লোকজন হানা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, হানা দিয়ে ধরে নিয়ে গেল তাঁকে কলাভবনের তাঁর কামরা থেকে। তাঁর খোঁজে সশস্ত্র সেনারা আসবে এমন গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে তিনি ভাবেননি কখনো বলেই প্রস্তুত ছিলেন না, সেনাবাহিনীর লোকজন এসে অনায়াসে তাঁর খোঁজ পেয়েছিল। পরে ডিসেম্বরে আবার যখন আলবদররা এলো, তখনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ই ছিলেন তিনি। যাওয়ার তেমন জায়গাও ছিল না তাঁর, এই শহরে। উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে আমি জানি তাঁর সরাসরি ছাত্র হওয়ার অনেক আগে থেকেই। সেই যখন আমি স্কুল ছেড়েছি কি ছাড়িনি, সেই বয়সেই তাঁর লেখা পড়েছিলাম আমি একটি গ্রন্থ সমালোচনা; মুকতি নামে তখনকার দিনের একটি মাসিক পত্রিকায়। সেই লেখায় তাঁর বক্তব্য কী কী ছিল আজ আর মনে নেই, কিন্তু এটি ঠিকই মনে আছে বক্তব্যের মধ্যে যুক্তি ছিল স্পষ্ট, পারম্পর্য ছিল দৃঢ়। সেই যে কৈশোরে ছায়া ফেলেছিলেন তিনি মনের ওপর, সেই ছায়া কালে কালে লোপ পায়নি, বরং আরো গভীর হয়েছে, বিশেষ করে সেই ১৮-১৯ বছরে যখন সুযোগ হয়েছিল থাকার তাঁর আশপাশে। এই ছায়া স্তব্ধ নয় এবং সব সত্তাজুড়ে আছে অনুচ্চ সেই গান। অনুচ্চই। কেননা যে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা নাটক পড়াতেন, নাটক পরিচালনা করতেন, তাঁর পছন্দ ছিল নাটকীয় দ্বন্দ্ব, যদিও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নাটুকেপনা তো নয়ই, নাটকীয়তাও পছন্দ করতেন না।
রাশীদুল হাসানকেও আমি শিক্ষকতা ভিন্ন অন্য কোনো পেশায় চিন্তা করতে পারি না। ছাত্রাবস্থায় আমরা আসার আগেই তিনি বের হয়ে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং শিক্ষক হয়ে ফিরে এসেছেন বেশ কিছুদিন পরে। মধ্যবর্তী সময়েও শিক্ষকতাই করেছেন তিনি, কিছু সময় পাবনায়, তার পরে জন্মভূমি বীরভূমে। তিনি লিখতেন। প্রবন্ধ লিখতেন, কবিতা লিখতেন সময় সময়। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাজীবনেই, সেই উনসত্তর সালে, যখন প্রবল গণ-আন্দোলনের আদিগন্ত ঝড় বইছে দেশব্যাপী। এর আগে পরিচয় হয়নি। কেননা তিনি যখন যোগ দেন ইংরেজি বিভাগে, তখন আমি শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে ছিলাম। রাশীদুল হাসান জীবনকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন, যে জন্য কবিতার কোনো স্বায়ত্তশাসিত সত্তা ছিল না, আজ্ঞাবহ ছিলেন তাঁরা নিজের মনের কথার। নিজের গরজ বলে কোনো বালাই ছিল না। ছিল ইচ্ছাবন্দি। তাঁকে নিরাসক্ত বলবে কে? তিনি জীবনকে সুন্দর করতে চাইতেন, জানতেন একার জীবন মহৎ হবে না অন্যের জীবনকে স্পর্শ না করলে এবং অন্যের সাহায্য না পেলে। তাইতো চলে গেলেন অত দ্রুত। মৃত্যুর সঙ্গে আপস করলে আধমরা হয়ে হয়তো আরো অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারতেন, যেমন অন্যরা আছে, যেমন আমরা আছি।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও রাশীদুল হাসান কখনো, কোনো অবস্থায়ই গোপন কোনো সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বোমাবারুদ তৈরি করেননি। কিন্তু তাঁদের ছিল হূদয়। জীবন্ত হূদয়, বোমাবারুদের চেয়েও যা বিপজ্জনক-শাসক শ্রেণির পক্ষে। বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন তাঁরা। এই ভালোবাসা দেশের সব বুদ্ধিজীবীর মধ্যে ছিল কি? ছিল না। অবশ্যই ছিল না। মুত্সুদ্দী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তাঁরা অনেকেই। যাঁরা দেশপ্রেমিক ছিলেন, তাঁদেরও অনেকেই ততটা অগ্রসর ছিলেন না, যতটা ছিলেন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও রাশীদুল হাসান। অথচ অদৃষ্টের সেই পুরনো ও প্রসিদ্ধ পরিহাস, তাঁরা উভয়েই ছিলেন বলতে গেলে নিরাশ্রয়। জ্যোতির্ময় স্যার আমাদের বলতেন, পাকিস্তানে তোমরা হলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, আমরা হিন্দুরা, হিন্দু বলেই তৃতীয় শ্রেণির। পরিহাস করে বলতেন বটে, কিন্তু ব্যাপারটি তো পরিহাসের ছিল না, ছিল
মর্মান্তিকরূপে বাস্তবিক। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের আত্মীয়-স্বজন বলতে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাদের প্রায় কেউ ছিল না। চমৎকার সুযোগ ছিল ইংল্যান্ড থেকে সরাসরি কলকাতায় চলে যাওয়ার; ১৯৬৫-এর যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান যে তাঁদের পক্ষে আগের তুলনায় অধিক অনাত্মীয় হয়ে উঠেছিল, সে খবর তো বিলেতে বসে না জানার কোনো কারণ ছিল না। ঘটনাটি অস্বাভাবিক। কিন্তু না, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকছিল; বাসন্তী গুহঠাকুরতাকে ডাকছিল গেণ্ডারিয়ার মনিজা রহমান গার্লস স্কুল। তাঁরা চলে এলেন। উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য জ্যোতির্ময় স্যারের পক্ষে যতটা সময় থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট কাটলেন, প্লেনের।
রাশীদুল হাসান পশ্চিমবঙ্গের লোক, ঢাকায় এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে; পরে এখান থেকে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবনে একবার চলে গিয়েছিলেন জন্মভূমিতে, কিন্তু আবার চলে আসতে হয়েছে তাঁকে, ১৯৬৫-এর যুদ্ধের পর। আত্মীয়-স্বজন বলতে প্রায় কেউ ছিল না তাঁর ঢাকায় অথবা পূর্ব পাকিস্তানে। সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন মনে হয় আনোয়ার পাশা, যাঁকে তাঁর সঙ্গেই নিয়ে গিয়েছিল ঘাতকরা- হত্যা করবে বলে। একই সময়ে, একই বাসা থেকে। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল প্রতিরোধের সব সম্ভাব্য ঘাঁটিকে দেবে নিশ্চিহ্ন করে। সে জন্য জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও রাশীদুল হাসান চলে গেলেন, আরো অনেকের সঙ্গে, পাকিস্তানি হানাদারদের বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযানে। সেটি ছিল বিজয়ের পূর্বক্ষণের অতি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ