বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত কোনো সাধারণ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নয়। এটি গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের সামাজিক আন্দোলন, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন এবং এমন এক উন্নয়ন দর্শনের মাধ্যমে, যেখানে ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং নারীর ক্ষমতায়ন। এই সামাজিকভাবে প্রোথিত মডেলই দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগ যে খসড়া ‘মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অধ্যাদেশ’ প্রকাশ করেছে, তা গভীর সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। ‘সামাজিক উদ্ভাবন’ হিসেবে উপস্থাপিত এই প্রস্তাব বাস্তবে বাংলাদেশের পরীক্ষিত ক্ষুদ্রঋণ কাঠামো থেকে মৌলিক বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়। নতুন ব্যাংক খাত সৃষ্টি করা এখানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করার বদলে সামাজিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রক্রিয়াটিও প্রশ্নের জন্ম দেয়। মাত্র এক মাসের মতামত দেওয়ার সময়—যার শেষ তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০২৬—যেমন বড় খাত সংস্কারের জন্য অপ্রতুল। প্রায় ৭০০ লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, চার কোটি ঋণগ্রহীতা পরিবার এবং পাঁচ লাখ কর্মীর সঙ্গে যুক্ত খাতের জন্য বিস্তৃত ও অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়ার অভাবেই দেখা দেয় আশঙ্কা—নীতিনির্ধারণে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত পরিচালনা করছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ, যেখানে সদস্যদের সঞ্চয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। এই কাঠামো প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বনির্ভর রাখতে সাহায্য করেছে এবং তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ সামাজিক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকসদৃশ কাঠামোয় রূপান্তর এই ভারসাম্যকে ধ্বংস করবে।
ক্ষুদ্রঋণ মূলত একটি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ। ব্যাংককেন্দ্রিক নিয়মনীতি—যেখানে মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা ও আর্থিক সূচক মুখ্য—সামাজিক লক্ষ্যকে পিছনে ফেলে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, ব্যাংকভিত্তিক রূপান্তরের ফলে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়, কমিউনিটি-ভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচি সংকুচিত হয় এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার কমে।
সময়ও অনুকূল নয়। ২০২৬–পরবর্তী মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বিদেশি দাতা সহায়তা কমছে। বর্তমানে MFIs প্রাথমিকভাবে নিজেদের উদ্বৃত্ত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই সময় ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক চালু করলে সামাজিক বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত হবে এবং প্রান্তিকদের আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
প্রস্তাবিত ব্যাংকগুলো পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট অনুযায়ী আদায় ক্ষমতা, জামানত গ্রহণ এবং সাধারণ ব্যাংকিং সুবিধা পাবে। অন্যদিকে এনজিও MFIs—বিশেষত প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে—প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পিছিয়ে পড়বে। এটি খাতকেন্দ্রীকরণ ও প্রান্তিকদের প্রবেশাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং পরিপ্রেক্ষিতেও এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ৬২টি ব্যাংক রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংক পুনরুদ্ধারে সরকারি ব্যয় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। উচ্চ খেলাপি ঋণের বাস্তবতায় নতুন ব্যাংক শ্রেণি যুক্ত করা আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে মানানসই নয়।
এছাড়া, খসড়া অধ্যাদেশ মূল সমস্যাগুলো—ঋণগ্রহীতার পুনরাবৃত্তি, কর্মী অনিয়ম, ঋণের defaults, ছোট MFIs-এর জন্য স্বল্পসুদে তহবিলের সীমিত সুযোগ—সমাধান করছে না। এমআরএ প্রবর্তিত তথ্য ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হলে কোনো সংস্কার কার্যকর হবে না।
সতর্ক অবস্থান নিয়েছে COAST Foundation, BDCSO Process এবং EquityBD। বিশ্বব্যাংক ও CGAP-এর গবেষণাও দেখায়, ব্যাংকভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দিতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। প্রস্তাবিত ব্যাংকে দরিদ্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার অধিকার থাকলেও বাস্তব নিয়ন্ত্রণ পেশাদার বোর্ড ও নিয়ন্ত্রকের হাতে থাকবে।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল ও বিস্তৃত। হঠাৎ ব্যাংক কাঠামোয় রূপান্তর করলে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশকে প্রয়োজন আরও ব্যাংক নয়, বুদ্ধিদীপ্ত সংস্কার—বিদ্যমান MFIs শক্তিশালী করা, স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন বাড়ানো, সুশাসন জোরদার করা এবং ক্ষুদ্রঋণের সামাজিক লক্ষ্য রক্ষা করা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উন্নয়নের সহায়ক হতে হবে, নয়তো বিপদ ডেকে আনবে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উন্নয়নকে সহায়ক করতে হবে, কোনো প্রকার বাণিজ্যিক চাপ বা তাড়াহুড়ো আমাদের সামাজিক অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। এই অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন না করা, সতর্ক ও অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ নিয়ে পুনঃপ্রণয়ন করাই বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডশন।
বিডি প্রতিদিন/নাজিম