বিশ্বের নিরাপত্তা পরিসর ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; সামরিক ক্ষেত্রেও তা তীব্র রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত—দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। প্রতিটি দেশই প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিজেদের কৌশলগত জোটে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে, কখনও অর্থনৈতিক চাপ, কখনও সামরিক বা কূটনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে।
চীন তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়ছে। ভারত তার সেভেন সিস্টার প্রদেশ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোও প্রায়ই প্রতিবেশীদের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করে। সামরিক প্রতিযোগিতা, অস্ত্র আধুনিকায়ন ও রফতানি আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় “ব্যবসা”তে পরিণত হয়েছে। ফলে অস্ত্র বিক্রেতারা যেন যুদ্ধ চাই যুদ্ধ চাই করছে।
২০২৫ সালের SIPRI-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং আধুনিক অস্ত্রের বাজার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের সিমান্ত ঘেঁষে রাখাইন সীমান্তে মিয়ানমার–চীন–আমেরিকা–রোহিঙ্গা–সেনা সংঘাত দিনে জটিল আকার ধারণ করছে। এই জটিলতা প্রমাণ করছে যে আঞ্চলিক অস্থিরতা শুধু সীমান্তের বিষয় নয়; এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জনগণের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এককভাবে অস্তিত্ব রক্ষা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সীমিত সামরিক শক্তি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত চাপ একত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রশ্ন তুলছে।
এই প্রবন্ধে বাংলাদেশ কি এককভাবে নিরাপদ থাকতে পারবে, নাকি কৌশলগত সামরিক জোটের মাধ্যমে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোটের উদাহরণ, তাদের সফলতা ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করা হবে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন কৌশলটি বেশি কার্যকর হতে পারে তা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র ক্রমেই এক ধরনের ‘নতুন শীতল যুদ্ধের’ দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা স্পষ্ট। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত অঞ্চল—তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, সেভেন সিস্টার প্রদেশ ও রাখাইন—আজ আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
চীন ‘এক চীনের নীতি’র আওতায় তাইওয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে আঞ্চলিক আধিপত্য জোরদার করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে এবং দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এই দ্বন্দ্ব কেবল দুই পরাশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও কৌশলগত চাপ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় তথাকথিত ‘সেভেন সিস্টার’ প্রদেশগুলো আজ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলকে ঘিরে ভারতের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কৌশল শুধু বাংলাদেশের সীমান্তেই নয়, বরং চীন, পাকিস্তান, নেপাল ও মিয়ানমারের সঙ্গেও জটিল আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), মিয়ানমারে চীন–সমর্থিত অবকাঠামো ও করিডর, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব এবং নেপালের সঙ্গে সীমান্ত ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে সেভেন সিস্টার অঞ্চল আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক স্পর্শকাতর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন এবং কৌশলগত করিডর রক্ষার নামে সীমান্তে সামরিকীকরণ বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও আস্থার সংকটে।
এই জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একদিকে যেমন ভৌগোলিকভাবে সংকীর্ণ, অন্যদিকে তেমনি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সেভেন সিস্টারকে মূল ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে বাংলাদেশের ওপর ভারতের নির্ভরতা, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের অস্থিরতা, চীন–মিয়ানমার ঘনিষ্ঠতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং পাকিস্তান–ভারত উত্তেজনা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতাও এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও ঘনীভূত করছে। ফলে সীমিত সামরিক সক্ষমতা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষায় বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হচ্ছে—যা এই অঞ্চলের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যে বাংলাদেশের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
বাংলাদেশের সামরিক বাজেট ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। সক্রিয় সেনাসদস্য সংখ্যা আনুমানিক ১ দশমিক ৬ লাখ, যার প্রায় ৩০ শতাংশ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। নৌ ও বিমান বাহিনীর সক্ষমতা সীমিত, ফলে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন আন্তর্জাতিক সাহায্য বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সীমিত সামরিক ব্যয় ও সেনাশক্তির কারণে আধুনিক অস্ত্র ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যাপ্ত নয়। দেশের কৌশলগত অবস্থান এটিকে সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ভরশীল করে তোলে। এককভাবে প্রতিরক্ষা যথেষ্ট কার্যকর নাও হতে পারে। তাই, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক জোটে অংশগ্রহণের বিকল্প গ্রহণ করা জরুরি।
বিশ্বের সামরিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার ইতিহাস মূলত জোটভিত্তিক উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। ছোট রাষ্ট্রগুলোকে আক্রমণাত্মক শক্তির চাপ থেকে রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী সামরিক জোট গঠন করা হয়েছে। ন্যাটো বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক জোট। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন প্রতিরোধ করা। ন্যাটোর প্রধান নীতি, বিশেষত আর্টিকেল -৫, অনুযায়ী কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করলে তা সমগ্র জোটকে প্রভাবিত করবে। শীতল যুদ্ধের সময় ন্যাটো মূলত ইউরোপে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তবে আফগানিস্তান অভিযান দেখিয়েছে যে, ন্যাটো সবক্ষেত্রেই সমন্বিত সফলতা আনতে পারে না। ২০০১ সালে ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন অভিযানে শুরুতে কিছু সামরিক লক্ষ্য পূরণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও পুনর্গঠন সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের হিসাবে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামরিক বাজেট প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার, যা জোটকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী রাখলেও রাজনৈতিক ও মানবিক সীমাবদ্ধতা এখনও বিদ্যমান।
মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট, যা ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করেছে, কিছু সামরিক লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হলেও এতে মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, একক বা আংশিক জোটও সবসময় আক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর নয়, বিশেষত যখন সদস্যদের স্বার্থ ও নীতি ভিন্ন। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কোয়াড চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া এই জোটের মাধ্যমে দক্ষিণ-প্যাসিফিকে কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাচ্ছে। যদিও কোয়াড সরাসরি আক্রমণ প্রতিরোধমূলক নয়, এটি রাজনৈতিক সমন্বয় এবং কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে সক্ষম। তবে আক্রমণ প্রতিরোধে সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
এই জোটগুলোর সফলতা মূলত তিনটি কারণে নির্ভরশীল—সদস্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঐক্য, সামরিক সক্ষমতা, এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সামরিক জোট একক রাষ্ট্রের জন্য সমন্বিত প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারে। ন্যাটো, কোয়াড কিংবা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক ঐক্য, সুস্পষ্ট কৌশল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলে জোট শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে পারে। তবে সব জোটই সফল হয়েছে এমন নয়; অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিও দেখা গেছে। বিপরীতে ব্যর্থতার কারণ হলো—নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের অভাব, সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত, এবং আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া। আফগানিস্তান–ন্যাটো সংঘাত ও সৌদি–ইয়েমেন অভিযান স্পষ্ট করে যে, জোট থাকলেও সব ঝুঁকি দূর হয় না; রাজনৈতিক, মানবিক ও কৌশলগত প্রভাব বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। তবে স্বার্থের সংঘাত, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক চাপ জোটের সীমাবদ্ধতা হিসেবেও বিবেচ্য।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পরাশক্তির প্রতিযোগিতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত চাপ, আঞ্চলিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমিত সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক চাপের প্রেক্ষাপটে কেবল নিজস্ব প্রতিরক্ষার ওপর নির্ভর করলে সীমান্ত, সাইবার ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়। তাই একদিকে সীমিত সামরিক শক্তির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনে কৌশলগত সামরিক জোট ও প্রতিরোধমূলক অংশীদারিত্বের কথা বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা জরুরি।
সম্প্রতি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিসরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো—এক দেশের ওপর সামরিক আক্রমণ হলে তা উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়াও, তুরস্কের মতো একটি আঞ্চলিক-পরাশক্তি এই চুক্তিতে যোগদানের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত একটি মুসলিম প্রতিরক্ষা জোটের ভিত্তি, যা ভবিষ্যতে ন্যাটোর বিকল্প বা পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র, যার রয়েছে যুদ্ধঅভিজ্ঞ সেনাবাহিনী। তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০ সামরিক শক্তির একটি, ড্রোন প্রযুক্তি, নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় অত্যন্ত উন্নত। সৌদি আরবের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাজেট—২০২৫ সালে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই তিন দেশের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিরক্ষা কাঠামো কার্যত একটি শক্তিশালী ডিটারেন্স হিসেবে কাজ করতে পারে।
এটি বাংলাদেশের জন্য শুধু সামরিক সুরক্ষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী করবে। ফলে প্রতিবেশি কোন দেশ বা অন্য কোনো পক্ষের জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ছাতা তৈরি করবে। সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আর একা থাকবে না; বরং একটি বৃহৎ জোটের অংশ হিসেবে কথা বলার শক্তি পাবে।
তবে এই কৌশলগত সামরিক জোটে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে যেমন পারে তেমন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হতে পারে। যেমন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সংঘাত, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা, প্রতিবেশী শক্তি যেমন ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া, সীমিত বাজেট ও আধুনিকায়নের জন্য আর্থিক চাপ এবং জোটের অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য নীতি ও কৌশল নির্ধারণে সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে জোটভুক্তি যেমন নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা অপরিহার্য। তবে এ কথা সত্যি যে মুসলিম জোটে জোগ না দিলেও বাংলাদেশ এই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নিয়েই মুসলিম প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেয়া এখন সময়ের দাবী।
বাংলাদেশ মুসলিম সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি আরও বহুমুখী কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করতে পারে। জাতিসংঘ, আসিয়ান, সার্ক বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা সম্ভব, যা দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখে এবং প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে। একই সঙ্গে সীমিত বাজেটের মধ্যেও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়ন, যেমন ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়ক। এই সমন্বিত কৌশল দেশকে জোটনির্ভরতার ঝুঁকি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা থেকে কিছুটা মুক্ত রাখা সম্ভব। পরিশেষে বলা যায়, কেবল একক শক্তি বা শুধু জোটনির্ভরতা নয়—বরং সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশলই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ। এই বহুমাত্রিক নীতি দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]
বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ