খুব কাছে চলে এসেছে জাতীয় নির্বাচন। সঙ্গে গণভোট। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কতটা সুষ্ঠু হবে, তার ওপর। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পূর্বাপর বলে আসছেন যে এই সরকার অত্যন্ত ভালো একটি নির্বাচন উপহার দেবে। এতটাই ভালো হবে যে এমন নির্বাচন অতীতে আর কখনো হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও একাধিকবার অবাধ ও নিরপেক্ষ ইলেকশন অনুষ্ঠানের সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটবে তা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ-সংশয়। আদৌ নির্বাচন হবে কি না, এখনো সে প্রশ্ন আছে অনেকের মনে। এসব সন্দেহ যে খুব অমূলক-তাও কিন্তু বলা যায় না। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরে দেশে ইলেকশনবিরোধী একটি ধারার প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছিল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সরব ভূমিকা পালন করে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামনে চলে আসা ছাত্রনেতারা। শিগগিরই তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলায় জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা অনেক দল। দ্বিতীয় স্বাধীনতা, সেকেন্ড রিপাবলিক, পিআর, সংস্কার, জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ, নতুন বাংলাদেশ ইত্যাদি ইস্যু সামনে নিয়ে আসা হয়। তারা নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিল। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচন চাইছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে।
এগুলো কিছুদিন আগের কথা। এখন যখন ইলেকশন দুয়ারে কড়া নাড়ছে, তখন পেছনের কাসুন্দি না ঘাঁটাই সমীচীন। কিন্তু ইলেকশন বানচালের জন্য পেছনে হাঁটা ভূতটি কাঁধ থেকে পুরোপুরি নেমেছে বলে মনে হয় না। মাঠে-ময়দানে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে নির্বাচনবিরোধী স্লোগান এখনো শোনা যাচ্ছে। জুলাই ঐক্য নামের একটি সংগঠন বলছে জাতীয় পার্টি ও চৌদ্দ দলের প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করতে হবে। এ বিষয়ে তারা নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপিও দিয়েছে। সংগঠনটি বডিওর্ন ক্যামেরার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কোনো বৈধ পার্টির প্রার্থীদের ক্যান্ডিডেচার বাতিলের দাবি কী উদ্দেশ্যে; সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনেক সময় ছোট কাঁটা বড় সমস্যা তৈরি করে। বডিওর্ন ক্যামেরার কথা যেটা বলা হয়েছে, সেটা ভোট কেন্দ্রের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি ভালো সুপারিশ। নিরাপত্তাকৌশল হিসেবে বডিওর্ন ক্যামেরাসহ আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে যতদূর জানি ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রয়েছে। কাজেই বিষয়টিকে ইস্যু বানানোর সুযোগ নেই। আমরা চাইব, প্রতিটি কেন্দ্রে শতভাগ নিরাপত্তা। এবং তা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী কী কৌশল গ্রহণ করবে, সেটা তাদেরই করতে দিতে হবে। এদিকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময়ে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ইলেকশন স্থগিত চেয়ে রিট পিটিশন করা হয়েছে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি অনুপেক্ষণীয়। অবৈধ অস্ত্র সব সময়ই স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে সারা দেশ থেকে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা সুনিয়ন্ত্রিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাক্ষ্য দেয় না। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে পত্রিকায় একাধিক রিপোর্ট বেরিয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক হলেও এটাকে ইস্যু বানিয়ে জাতীয় নির্বাচন স্থগিত করার আইনসম্মত কোনো যুক্তি আছে কি না, তা দেখবেন আদালত। রিটের বিষয়ে আগেভাগে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে পারিপার্শ্বিক এসব বিষয়-আশয় দেখে ও শুনে যে কারও মনে সন্দেহের দোলাচল সৃষ্টি হতেই পারে। আশার কথা এই যে প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট যথারীতি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিই অনুষ্ঠিত হবে। এক দিন আগেও না, এক দিন পরেও নয়। নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তিনি তাঁর দৃঢ়সংকল্পের কথাও ব্যক্ত করেন। গত মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক সিনিয়র কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচন কতখানি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ইলেকশন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো কোনো মহল প্রশ্ন তুলছে। ভোটার তালিকায় গড়বড় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রবাসী ভোটারদের জন্য যে ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে, সেখানে একটি বিশেষ দলের মার্কা সবার ওপরে রাখা হয়েছে। ধানের শীষ মার্কাটি এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যেখান থেকে খুঁজে বের করা কঠিন। বিএনপি এই কাজটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছে। বিষয়টি তারা ইসিকে জানিয়েছেও। ইলেকশন কমিশনের কাছ থেকে এক রকম ব্যখ্যাও পাওয়া গেছে। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদ প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। গণভোটে অনিয়ম হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়বে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে, তাতে উদ্বিগ্নবোধ করার কারণ রয়েছে। জুলাই সনদ খুব ঘটা করে স্বাক্ষরিত হলেও, রেফান্ডামের মাধ্যমে যে ভোটার সাধারণ এটি গ্রহণ বা বর্জন করবেন, তারা এ বিষয়ে কতখানি ওয়াকিবহাল? সত্য হচ্ছে প্রান্তিক ভোটারদের বৃহাদাংশ জুলাই সনদের ভিতরে কী আছে, না আছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানেন না। ভোটারদের এক বিরাট অংশ পড়তেও জানে না। না পড়ে, না জেনে তারা হ্যাঁ বা না-যে পক্ষেই ভোট দিন না কেন, সেটা সহি হওয়ার কথা নয়। জুলাই সনদের টেক্সট জনগণকে জানানোর দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব যাদের ওপর বর্তায়, তারা কি সে দায়িত্ব পালন করেছেন? এ নিয়ে কথা ওঠা স্বাভাবিক। এখন গণভোটের প্রচারণার ধরন দেখে মনে হয় এটি প্রহসন হতে চলেছে। কোনো কোনো মহল থেকে এমন সব কথাও বলা হচ্ছে, যা ভয়ের উদ্রেক করে। একজন বড় ছাত্রনেতা বলেছেন, যারা না ভোটের ক্যাম্পেইন করবে বাংলদেশে তাদের ঠিকানা হবে না। আরেকজন নেতাকে বলতে শুনলাম, যারা না ভোট দেবেন তারা কেন্দ্রে যাইয়েন না! এগুলো কোন গণতন্ত্রের কথা? ভোটার যদি পছন্দমতো ভোটই দিতে না পারবেন, তাহলে জনগণের টাকা খরচ করে ভোট কেন করা হচ্ছে?
গণভোটে দুটো পক্ষ-একটা হ্যাঁ আরেকটা না। উভয় পক্ষের ক্যাম্পেইনের অধিকার রয়েছে। পক্ষ বেছে নেওয়ার অধিকার ও দায়িত্ব ভোটার সাধারণের। এ অধিকার মেনে নেওয়া হয়েছে বলেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। মেনে নিয়ে আবার বিরুদ্ধাচরণ করা-এটা কোন রীতি! যারা গণভোটে হুমকিধমকি দিচ্ছেন, তারা সংসদ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নীতি কতটা মানবেন-তা প্রশ্নাতীত নয়।
আসন্ন গণভোটে সরকার ও প্রশাসন কোনো পক্ষ নয়। সরকারের কোনো বিভাগ, অনুবিভাগ, প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই এই গণভোটে হ্যাঁ বা না ভোটের পক্ষভুক্ত নয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের আধিকারিকগণ কোনো একটি পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তবে ভোটে অংশগ্রহণ করতে তারা জনগণকে উৎসাহিত করতে পারেন। ভোট কেন্দ্রে আসা এবং পছন্দমতো ভোট দিতে উৎসাহিত করা, আর কোনো একটি ব্যালটে ভোট দিতে ক্যাম্পেইন করা-এক কথা নয়। অতীতে এ দেশে একাধিক রেফান্ডাম হয়েছে। কিন্তু হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সরকারি অফিসারদের নামানো হয়নি। কিন্তু এবার মনে হয় এই নীতি মানা হচ্ছে না। গত মঙ্গলবার রাজশাহী মহিলা কলেজ অডিটোরিয়াম ও রাজশাহী কলেজ শিক্ষক মিলনায়তনে তথ্য ও সম্প্রচার সচিব শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, পরিবর্তনের চাবিকঠি এখন আপনাদের হতে। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে হবে। পাশাপাশি আশপাশের লোকদের গণভোট সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। স্পষ্টতই এটা হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা। একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি একপক্ষীয় প্রচারণা বিধিসম্মত কি না, তা ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। অন্যদিকে স্কুল-কলেজগুলোর প্রধানদের দৃশ্যমান জায়গায় গণভোটের ড্রপডাউন ব্যানার ঝুলিয়ে দিতে বলা হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ড্রপডাউন ব্যানারের টেক্সট ও ডিজাইনের নমুনাও পাঠানো হয়েছে। এগুলো প্রতিষ্ঠান প্রধানদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় শিক্ষা অফিস থেকে। সঙ্গে যে আদেশপত্রটি দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারও রেফারেন্স নেই, স্বাক্ষরও নেই। বলা যায়, এক ধরনের উড়ো নির্দেশ। আমার হাতে এ ধরনের যে ডকুমেন্টটি এসেছে, তাতে দেখা যায়, ব্যানারটি চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার নামে করা। সেখানে এগারোটি পয়েন্ট দেওয়া হয়েছে। নিচে লেখা রয়েছে, হ্যাঁ ভোট দিলে ওপরের সবকিছু পাবেন। না ভোট দিলে কিছুই পাবেন না। এ তো হ্যাঁ ভোটেরই ক্যাম্পেইন হলো। হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে প্রোপাগান্ডায় অংশ নেওয়ার দায়িত্ব কী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না-তা হওয়া উচিত?
আমরা কিন্তু এখানে হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো কথা বলছি না। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ম্যান্ডেট দেবে সেটাই চূড়ান্ত। সেটাই মাথা পেতে নিতে হবে। এটা গণতন্ত্রের কথা। বিষয়টি যখন ভোটে দেওয়া হয়েছে, তখন ইন্টেরিম সরকারের সব অঙ্গপ্রতঙ্গ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে জনগণকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ দেবে-এটাই রীতিসিদ্ধ। যারা না ভোট দেবেন তাদেরও নিশ্চয়ই কিছু যুক্তি আছে। তাদের কথাও বলতে দিতে দিতে হবে-যদি আমরা গণতন্ত্র মানি। মানুষকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে না দিলে চিন্তার বন্ধ্যত্ব দেখা দেবে। চিন্তার পথ যেখানে রুদ্ধ, সেখানে গণতন্ত্র বাঁচে না। গণতন্ত্র ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক