সম্প্রতি কালের কণ্ঠে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে প্রদত্ত বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহার এবং সরকারের বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নিয়ে। প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে প্রতিবছর দেশের বাজারে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের কাপড় ঢুকছে এই বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহার করে। এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) এ ব্যাপারে ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
কেননা বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে একদিকে সরকারের বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হয়; অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
দেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রদত্ত বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ অনেক পুরনো। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি আমি একটি ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের সময় মাঝেমধ্যেই কিছু গার্মেন্টস কারখানা পরিদর্শন করেছি কেবল বন্ডেড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাপড়ের স্টক রিপোর্ট তৈরি করার জন্য, যা ছিল আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ। এ রকম একটি ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের সময় এক দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) কর্মকর্তা আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন।
তিনি এই অব্যবস্থা দেখে চরম হতাশ হন এবং ভীষণ রেগে যান। সেই গার্মেন্টস কারখানার গুদামে আমদানি করা সব কাঁচামাল এমনভাবে সংরক্ষণ করা ছিল, তাতে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি যে কোন কাঁচামাল বন্ডেড সুবিধার আওতায় আমদানি করা, আর কোন কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ বা সাধারণ ব্যবস্থায় আমদানি করা হয়েছে।
বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহারের জন্য দেশের ব্যবসায়ীদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করা হয় ঠিকই, কিন্তু এই পদ্ধতিটি যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ এবং অনেক ফাঁকফোকরপূর্ণ। ১৯৮০-এর দশকে এই পদ্ধতি চালুর সময় পৃথক বন্ডেড গুদাম বা ওয়্যারহাউসের ব্যবস্থা ছিল, যেখানে পণ্য আমদানি করে সংরক্ষণ করা হতো এবং প্রমাণ সাপেক্ষে কারখানায় নিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথক বন্ডেড গুদামের ব্যবস্থা বাতিল করে পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয় রপ্তানিকারকদের, যাঁরা বন্ডেড সুবিধার আওতায় আমদানি করে নিজ দায়িত্বে আমদানি করা কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ এবং শতভাগ রপ্তানি নিশ্চিত করবেন। এই স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যেই আছে নানা ফাঁকফোকর, যার অপব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং গার্মেন্টস কম্পানির কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বন্ডেড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাপড় স্থানীয় বাজারে বিক্রির মতো অনিয়ম করেন। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই অন্যায়ের পুরো দায়ভার নিতে হয় দেশের সমগ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে।
প্রাথমিকভাবে এই বন্ডেড সুবিধার প্রয়োজন থাকলেও বর্তমান বিশ্বের আধুনিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা এবং অগ্রসরমাণ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটি মোটেই সহায়ক নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিশাল অঙ্কের রপ্তানির ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা মোটেই কার্যকর নয়।
যে দেশে বছরে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং অদূর ভবিষ্যতে ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার বাৎসরিক রপ্তানির চিন্তা করা হয়, সেখানে বন্ডেড সুবিধার মতো সেকেলে ব্যবস্থা দিয়ে সহায়তা করা মোটেই সম্ভব নয়। আধুনিক আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হলে এই বন্ডেড সুবিধা সহজ করা প্রয়োজন। দেশে রপ্তানির পরিমাণ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে বিশেষ কোনো সুবিধার প্রয়োজন থাকার কথা নয়।
বিশ্বের অন্য দেশের রপ্তানিকারকদের যে পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, আমাদের দেশের রপ্তানিকারকরাও তা-ই করবেন, এটাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ রপ্তানিকারকরা যেসব কাঁচামাল রপ্তানিপণ্য তৈরির জন্য আমদানি করবেন, তার ওপর সাধারণ নিয়মে ডিউটি প্রদান করবেন। রপ্তানিপ্রক্রিয়া শেষে যখন রপ্তানিমূল্য দেশে চলে আসবে, তখন রপ্তানিকারকরা প্রদত্ত শুল্ক সরকারের কাছ থেকে ফেরত পাবেন। কিন্তু অনেক কারণে আমাদের দেশের বাস্তবতায় এই মানসম্পন্ন ব্যবস্থা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। প্রথমত, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে না যে আমদানির শুরুতেই সরকারকে ডিউটি প্রদান করে টাকাটা আটকে রাখবেন। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে সরকারি অফিস থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়।
এতৎসত্ত্বেও এই বন্ডেড সুবিধার পরিবর্তন করা প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে এমন আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা উচিত, যার মাধ্যমে দেশের রপ্তানিকারকরাও সুবিধা পাবেন এবং সেই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ থাকবে না। এ রকম একটি ব্যবস্থা হতে পারে বন্ডেড সুবিধার পরিবর্তে স্ট্যান্ডবাই এলসি বা ব্যাংক গ্যারান্টি চালু করা। এই ব্যবস্থার অধীনে প্রত্যেক তৈরি পোশাক রপ্তানিকারককে এনবিআরের পক্ষে ব্যাংক থেকে একটি স্ট্যান্ডবাই এলসি প্রদান করা হবে। যদি কোনো রপ্তানিকারক আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করতে ব্যর্থ হন, কেবল তখনই এনবিআর প্রদত্ত স্ট্যান্ডবাই এলসির মাধ্যমে প্রযোজ্য শুল্ক সেই ব্যাংক থেকে আদায় করে নেবেন। বিষয়টি অনেকের কাছে জটিল মনে হতে পারে। তাই একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
ধরা যাক, একজন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক বছরে ১০০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেন, যার জন্য তাঁকে বছরে ৭০ কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসব আমদানি পণ্যের ওপর যদি গড় শুল্কের হার হয় ২০ শতাংশ, তাহলে তাঁকে বছরে ১৪ কোটি টাকার শুল্ক প্রদানের কথা। এ ক্ষেত্রে সেই রপ্তানিকারক তাঁর ব্যাংক থেকে এনবিআরের পক্ষে ১৪ কোটি টাকার একটি স্ট্যান্ডবাই এলসি প্রদান করবে, যার অধীনে এনবিআর তখনই অর্থ আদায় করবে, যখন সেই রপ্তানিকারকের বছরে রপ্তানির পরিমাণ ৭০ কোটি টাকার কম হবে। অর্থাৎ আলোচ্য ক্ষেত্রে যদি বছরে রপ্তানির পরিমাণ ৭০ কোটি টাকা বা তার বেশি হয়, তাহলে এনবিআরের কিছু করার প্রয়োজন হবে না। যদি কোনো রকম রপ্তানি না হয়, তখন এনবিআর স্ট্যান্ডবাই এলসির পুরো ১৪ কোটি টাকাই ব্যাংক থেকে আদায় করে নেবে। আর যদি বছরে রপ্তানির পরিমাণ ৭০ কোটি টাকার কম, ধরা যাক ৫০ কোটি টাকা হয়, তখন এই রপ্তানি ঘাটতির ওপর প্রযোজ্য হারে যে শুল্ক হয়, সেই পরিমাণ অর্থ এনবিআরকে আদায় করতে হবে। বলে রাখা ভালো যে প্রকৃত শুল্কের পরিমাণ নির্ধারিত হবে ঘাটতি রপ্তানি ২০ কোটি টাকার ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ১৪ কোটি টাকার আমদানির ওপর। এই হিসাব অনুযায়ী আলোচ্য ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক ধার্য করলে আদায়যোগ্য শুল্কের পরিমাণ হবে দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা। এনবিআর প্রথমে রপ্তানিকারককে এই শুল্কের টাকা পরিশোধ করতে বলবে। আমদানিকারক যদি সেই অর্থ প্রদান করেন, তাহলে এনবিআরের কিছুই করার প্রয়োজন হবে না এবং বছর শেষের হিসাব ও রিকনসিলিয়েশন সম্পন্ন করে ফেলবে। আর যদি রপ্তানিকারক এই শুল্কের অর্থ প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানান, তখনই এনবিআর স্ট্যান্ডবাই এলসির অধীনে ব্যাংক থেকে শুল্কের দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা আদায় করে নিতে পারবে।
এই ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে ন্যূনতম মানুষের শ্রমের প্রয়োজন হয় এবং ইচ্ছাকৃত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ না থাকে। এই পদ্ধতির সঙ্গে অবশ্য কিছু বিষয় জড়িত আছে; যেমন—স্ট্যান্ডবাই এলসির ফি, মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকি, যা স্ট্যান্ডবাই এলসিতেই সমাধানের ব্যবস্থা আছে। বিষয়টি ভিন্ন প্রসঙ্গ বিধায় বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই। এই পদ্ধতিটি খুবই সহজ এবং উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় উপযোগী হওয়ায় ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের শুল্কমুক্ত অঞ্চলে, যেখানে পণ্য আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করার পর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। যেহেতু এই বন্ডেড সুবিধা সেকেলে, জটিল, ত্রুটিপূর্ণ এবং যথেষ্ট ফাঁকফোকরে ভর্তি, তাই এই ব্যবস্থা সহজ করা প্রয়োজন এবং সে ক্ষেত্রে বন্ডেড সুবিধা বাতিল করে স্ট্যান্ডবাই এলসির প্রবর্তন হতে পারে সবচেয়ে ভালো একটি বিকল্প। অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিরা বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা