বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অনন্য প্রতীক যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘I Have a Dream.’ তারেক রহমান বলেছেন, ‘I Have a Plan.’ এই দুটি বাক্যের মধ্যকার পার্থক্য শুধু অর্থগত নয়, বরং বাক্য দুটিও ভিন্ন দুটি সময়ের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘ড্রিম’ জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে আর ‘প্ল্যান’ জন্ম নেয় রাষ্ট্রভাঙনের ঝুঁকির মুহূর্তে।
আজকের বাংলাদেশ এমন একটি সময় অতিক্রম করছে, যেখানে আবেগ আর অনুপ্রেরণার রাজনীতি যথেষ্ট নয়। এখানে প্রয়োজন রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার যথাযথ কৌশল, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বলছি, তারেক রহমানের ‘I Have a Plan’ বক্তব্য কোনো আবেগী রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়। এটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে রক্ষার একটি কৌশলগত ঘোষণা।
বর্তমান বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতার ঝুঁকিকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। দেশ এখন একটি ‘High-Risk Political and Security Environment’-এর মধ্যে অবস্থান করছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক পক্ষপাত, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং সামাজিক ক্ষোভ—সব মিলিয়ে একটি বিস্ফোরণপ্রবণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থা নড়বড়ে। বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক বাড়ছে।
মিডিয়া বিভক্ত। একাংশ ক্ষমতার ভাষ্য, অন্য অংশ প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর।
বিগত ১৭ বছরে নির্বাচনব্যবস্থা কার্যত ভেঙে ফেলা হয়েছিল। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দানবীয় ফ্যাসিস্ট শক্তি বিদায় নিলেও সময়ের ব্যস্তবতায় এখনো নির্বাচনব্যবস্থাও বেশ খানিকটা নড়বড়ে অবস্থায় আছে।
আর এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ফুঁসে উঠছে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।
জন্ম নিচ্ছে মব সন্ত্রাস এবং সক্রিয় হয়ে উঠছে জঙ্গিবাদের নগ্ন থাবা। এই পরিস্থিতিতে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু। কারণ আজ তারেক রহমান শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতীক, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি যৌক্তিক ও অনিবার্য কেন্দ্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যক্তি যখন চূড়ান্ত ‘বিকল্প’ হয়ে ওঠেন, তখন তিনি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখোমুখি অবস্থান করতে থাকেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই নিরাপত্তাঝুঁকি কেবল শারীরিক নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত ঝুঁকির সমান্তরাল।‘I Have a Plan’ ঘোষণাটি তাই অনিবার্য ছিল। কারণ বাংলাদেশ এখন আর নিছক স্বপ্ননির্ভর কোনো চারণক্ষেত্র নয়। এখানে প্রয়োজন একটি ‘Operational Blueprint’, যা বলে দেবে রাষ্ট্র কিভাবে চলবে, কে কোথায় দায়িত্ব পালন করবে, কে কার কাছে জবাবদিহি করবে, নিশ্চিত করবে রাজনীতি ও প্রশাসনের ভেতর কার্যকর সমন্বয়। এই পরিকল্পনা মূলত একটি ‘State Reset Plan’, যার উদ্দেশ্য ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃস্থাপন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রকে আবার নিয়মের কাঠামোর ভেতরে প্রবিষ্ট করা।
গণতন্ত্রকে অনেক সময় কেবল রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গণতন্ত্রের আরেকটি মূল উপাদান হলো ‘Stability Mechanism’। গণতন্ত্র না থাকলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়। অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে সহিংসতা বাড়ে, চরম পন্থা মাথাচাড়া দেয়, বিদেশি প্রভাব সহজ হয় এবং সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। তারেক রহমানের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য তাই রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, বরং ‘Institutional Stability’। কারণ শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানই একটি রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখে।
বর্তমান বাংলাদেশে নির্বাচন আর কেবল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি ‘National Security Flashpoint’। অবাধ নির্বাচন না হলে জন-অসন্তোষ জমে, জন-অসন্তোষ থেকে গণবিক্ষোভ হয়, গণবিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়, আর সহিংসতা রাষ্ট্রকে অচল করে দেয়। অচল রাষ্ট্র মানেই বিদেশি চাপ ও তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের সুযোগ। এ কারণেই তারেক রহমানের অবস্থান পরিষ্কার—সুষ্ঠু ভোটাধিকার প্রয়োগ ও অবাধ নির্বাচনের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হোক। বুলেট নয়, ভোট রাষ্ট্রকে দিক স্থিতি।
একইভাবে প্রশাসনের দলীয়করণ রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকরা দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হলে রাষ্ট্র আর নিরপেক্ষ থাকে না, সেটি বরং একটি দলের রাজনৈতিক দুর্গে পরিণত হয়। তারেক রহমানের পরিকল্পনা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বাহিনীর পেশাদারি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলে। কারণ রাষ্ট্র ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের ওপর। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কেবল একজন নেতার সুরক্ষা নয়। এটি ‘Political Balance Protection’। যৌক্তিক ও যথাযথ নেতৃত্ব নিরাপদ না থাকলে গণতন্ত্র নিরাপদ থাকে না। ক্ষমতার একচেটিয়াপ্রবণতা তখন রাষ্ট্রকে আরো ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও আবেগের জায়গা নেই। এখানে প্রয়োজন ‘Geopolitical Risk Assessment’। কারোর প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, কারো সঙ্গে অকারণ শত্রুতা নয়, জাতীয় স্বার্থই এখানে একমাত্র মানদণ্ড। দুর্বল রাষ্ট্রে বিদেশি প্রভাব বাড়ে, শক্ত রাষ্ট্রে কূটনীতি কাজ করে।
অর্থনীতিও নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বেকারত্ব বাড়লে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে, অপরাধ বাড়ে, রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে। তাই কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কৃষি পুনর্গঠন কেবল উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, এগুলোও নিরাপত্তাকৌশল।
বিরোধী দল দমন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী। বিরোধী দল না থাকলে ক্ষোভ জমে, বিস্ফোরণ ঘটে, রক্ত ঝরে। বিরোধী দলই রাষ্ট্রের ‘Safety Valve’, এই উপলব্ধি তারেক রহমানের পরিকল্পনায় স্পষ্ট।
আজকের রাজনীতি আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘Information Warfare’। ভুয়া খবর, চরিত্র হনন ও প্রোপাগান্ডা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে অন্ধ করে দেয়। তাই তথ্যের স্বচ্ছতা, অবাধ প্রবাহ ও মিডিয়ার স্বাধীনতাও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ।
সমরাস্ত্র রাষ্ট্রকে রক্ষা করার একটি উপাদান মাত্র, বরং রাষ্ট্র টিকে থাকে জনগণের আস্থায়। বল প্রয়োগের রাষ্ট্রে মানুষ ভীত থাকে বিধায় রাষ্ট্রের স্থিতি ও উন্নয়ন উভয়ই বিঘ্নিত হয়। ‘I Have a Plan’ কোনো হুমকি নয়, বরং এটি একটি কৌশল ও পরিকল্পনাগত অবস্থান। এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হলো বাংলাদেশকে আর ক্রীড়নক বানানোর সুযোগ নেই, বরং ‘I Have a Plan’-এর ভেতর দিয়ে নির্মিত হবে আগামীর বাংলাদেশ।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলে বাংলাদেশ কেবল রাজনৈতিক সংকটে নয়, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও ঝুঁকিতে পড়বে। মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বপ্নপূরণের সারথি হলো রাষ্ট্র, আর যথাযথ নেতৃত্ব ও তার পরিকল্পনা রক্ষা করে রাষ্ট্রসত্তা।
লেখক : বিএনপি চেয়ারম্যানের ‘প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা’