ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভিসা-নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন সংক্রান্ত কঠোর নীতিমালা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যগুলো আবারও দেশে-বিদেশে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বাস্তবতা হলো-যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের কোনো বক্তব্য বা তাৎক্ষণিক ঘোষণাই সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়ে যায় না। কারণ এই দেশটি ব্যক্তি নয়, আইনের শাসনে পরিচালিত।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়-নীতির কঠোরতা কাদের জন্য, আর ছাড় কাদের জন্য?
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে কিছু অভিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মের অপব্যবহার একটি আলোচিত কিন্তু অস্বস্তিকর সত্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাঁচ বছরের ভিসা নিয়ে বারবার যাতায়াত, এখানে এসে সন্তানের জন্ম দিয়ে নাগরিকত্বের সুবিধা গ্রহণ, কিংবা নানা সামাজিক বেনিফিটের অপব্যবহার-এসব নতুন কিছু নয়। কিছু কিছু দেশের নাগরিকরা এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা নেয়, এমন অভিযোগও শোনা যায়।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একেবারে নেই-এমন দাবি করা বাস্তবসম্মত নয়। বহু বাংলাদেশি ইমিগ্রেন্ট অক্লান্ত পরিশ্রম করে, নিয়মিত ট্যাক্স দেয়, সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখে। আবার একই সঙ্গে এমন উদাহরণও আছে, যেখানে কেউ নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বা ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নানা সরকারি বেনিফিট গ্রহণ করে-বিশেষ করে হোম কেয়ার, বয়স্ক পরিবারের সদস্যদের নামে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার মতো বিষয়গুলো অনেক সময় আইনসিদ্ধের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে-নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত কি সত্যিকার অর্থে সমস্যার মূলে আঘাত করছে, নাকি সহজ লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করেই দায়িত্ব শেষ করছে?
নিউইয়র্কের রাজনীতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের প্রতি সহানুভূতিশীল কণ্ঠস্বর নতুন নয়। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি-জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নন; তিনি একজন প্রভাবশালী প্রগতিশীল রাজনীতিক ও নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য। বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতি তার আন্তরিকতা ও সক্রিয়তা প্রশংসিত হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা নীতিগত পরিবর্তনে রূপ নেবে-সে বিষয়ে অনেকেই সন্দিহান। ইতিহাস বলে, রাজনীতিতে ‘যত গর্জে, তত বর্ষে না।’
মিনেসোটাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আইস (ICE)-এর কার্যক্রম ঘিরে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে অবিচার ও প্রশাসনিক কঠোরতার অভিযোগে দেশজুড়ে বিক্ষোভ বাড়ছে। অভিবাসন আইন প্রয়োগের নামে যদি মানবিকতা ও ন্যায্য প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেটি শুধু অভিবাসীদের নয়-পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই অশনিসংকেত।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নাটকীয়তা সব আমেরিকানের কাছেই স্বস্তিকর-এমন নয়। পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংকট যখন একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সারা বিশ্বের কাছে একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে-আইনের শাসন, মানবাধিকার, ভদ্রতা ও সহনশীলতার দেশ হিসেবে। সত্যি বলতে, নেটিভ আমেরিকান বা রেড ইন্ডিয়ানদের বাদ দিলে এ দেশটি অভিবাসীদেরই দেশ। বিশ্বের সেরা মেধাবী মানুষদের মিলনস্থল এই যুক্তরাষ্ট্র।
সেই কারণেই আজকের এই অস্থির সময়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে-নিরাপত্তা ও আইনের নামে যদি মানবিকতা হারিয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কি তার নিজস্ব আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছে না?
এই দেশটি বহু মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও সম্ভাবনার ঠিকানা। প্রত্যাশা একটাই-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অভিবাসন নীতি কিংবা ক্ষমতার ভাষা যেন সেই স্বপ্নকে ভেঙে না দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বদলাবে, নীতিও বদলাবে-কিন্তু তার মূল আত্মা, তার মানবিক পরিচয় যেন অক্ষুণ্ন থাকে।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক
বিডি প্রতিদিন/এমআই