আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই বিপ্লব-পূর্ব প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে এক যুগে প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া ও ভোটারবিহীন তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সরব অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে বাধাহীনভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ লাভ করতে যাচ্ছে। সারা দেশে নির্বাচনের উৎসবমুখর আমেজ বিরাজ করছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখন ক্ষণ গণনা চলছে, সবার দৃষ্টি ১২ ফেব্রুয়ারির দিকে। প্রতিপক্ষের বাধার আশঙ্কামুক্ত প্রার্থীরা জনগণের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন ভোট প্রার্থনা করতে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা তাঁদের প্রার্থী ও সমর্থকদের মনোবল চাঙা করার জন্য এবং তাঁদের নির্বাচনি রূপকল্প ও প্রতিশ্রুতি জনগণের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত বিবেচনায় নেওয়ার মতো কোনো অঘটনের খবর পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষেই নির্বাচন ঘিরে উৎসবের আবহ লক্ষ করা যাচ্ছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, যা কোনো কারণে ব্যাহত হলে দেশ পুনরায় আওয়ামী যুগের তমসায় আচ্ছন্ন হবে।
তবে বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাস অতটা সুখের নয়। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও নির্বাচনি সহিংসতায় বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৮ জন নিহত, বহুসংখ্যক আহত এবং বিরোধী দলের ৩০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনও একইভাবে বিরোধী দলের বর্জন ও ভোটারদের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এএফপি ও এপির রিপোর্ট অনুযায়ী নির্বাচনকালে সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিল ১৬ জন। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত শেষ নির্বাচনের আগে ও পরে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে মোট ৪১ জন নিহত হয়েছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে জুলাই বিপ্লবের আগে।
তবে দুঃখজনক সত্য হলো, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অর্থাৎ শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর দলবিশেষের অন্তঃকোন্দলে, বিশেষ করে চাঁদাবাজির উৎস স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করে তাদের বহুসংখ্যক কর্মী- সমর্থক নিহত হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) গত অক্টোবরের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকাশিত খবরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৬০ জনের মধ্যে ৮৫ জনই নিহত হয়েছে একটি বড় অন্তঃকোন্দলে। আহত বিএনপির কর্মী-সমর্থক সংখ্যা ৫ হাজার ১৭ জন। দৃশ্যত আওয়ামী বিহনে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ দলটির অন্তঃকোন্দলই হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য যথেষ্ট।
বিবিসির ২১ জানুয়ারির খবর অনুযায়ী সংসদের ৫০টি আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত ৯১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের ওপর দলের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে নিরুত্তাপ সম্পর্ক বিরাজ করবে, এমন আশা করা কঠিন।
বিএনপি তাদের অন্তঃকোন্দল দূর করতে না পারলেও ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারাভিযান শুরু হওয়ার পর তারা কোন্দলের আরেকটি ফ্রন্ট খুলেছে। এর টার্গেট বিএনপির একসময়ের পরম মিত্র জামায়াতে ইসলামী। যে জামায়াতে ইসলামীর ১৮ সংসদ সদস্যের সমর্থন ছাড়া ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির পক্ষে সরকার গঠন করা সম্ভব হতো না।
যে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে বেগম জিয়া এবং বিএনপির অন্য নেতারা সারা দেশে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছেন, এক মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিজয় লাভ করে জামায়াতকে নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। সেই দলের নাম উল্লেখ না করে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বাগ্যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি নেতারা এত দিন যে ভাষায় জামায়াতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে শুরু করেছিলেন, তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে তাদের আক্রমণ করতে আওয়ামী লীগের ভাষায়, বরং তার চেয়েও কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছেন। খুব স্বাভাবিক যে, জামায়াত তারেক রহমানের ইঙ্গিতের জবাব দেবে এবং দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানও বিএনপি বা তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না করে তাঁকে ও তাঁর দলকে আক্রমণ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর লোকজনের রাজনৈতিক বিজ্ঞতা নিয়ে আমার প্রশ্ন অনেক পুরোনো। ১৯৯১ সালে কোনো লিখিত দলিল সম্পাদনের পরিবর্তে জামায়াত নেতারা কিছু হাসি ও মৌখিক আশ্বাসের বিনিময়ে বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার সুযোগ দেন। কিন্তু জামায়াতের এ অবদান বিএনপি মনে রাখেনি। এ সময়ের সরকারি দল বিএনপির অবস্থা হয়েছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রবাদ ‘কার অছিলায় শিন্নি খাইলা মোল্লা চিনলা না’-এর মতো। জামায়াতের সমর্থনে সরকারে গিয়ে বিএনপি জামায়াতকে শুধু ভুলেই যায়নি, বরং ১৯৯২ সাল থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও লেলিয়ে দিয়েছিল জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ডান্ডা দিয়ে পিটিয়ে ঠান্ডা করার জন্য।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দ্বিতীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা ১৯৯১ সালে সরকার গঠনে জামায়াতের সামনে বিএনপির লুটিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ২০০১ সালে জোট সরকার গঠনেও জামায়াতের একাত্তরের কথিত কর্মকাণ্ড বিএনপির জন্য কোনো সমস্যার কারণ হয়নি। জামায়াত তারেক রহমানের বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি, পরবর্তী নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার আশায় তাঁবেদার কেয়ারটেকার সরকার গঠনের উদ্দেশে বিচারপতিদের চাকরির বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছরে উন্নীত করার মতো অনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জামায়াত আপত্তি জানায়নি, এসব দৃষ্টান্ত সামনে থাকতে হঠাৎ বিএনপির নতুন চেয়ারম্যানের কাছে জামায়াত এতটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেন?
সতেরো বছর পর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন দিবসে পূর্বাচলের সমাবেশে তারেক রহমান তাঁর স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী ভাষণগুলোও সবার জন্য অনুপ্রেরণামূলক ও আশা জাগানিয়া ছিল। এমনকি কয়েক দিন আগেও তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘দোষারোপের রাজনীতি নয়, মানুষকে ভালো রাখার রাজনীতি করতে হবে। দোষারোপের রাজনীতি করলে মানুষের পেট ভরবে না।’
এখন মনে হচ্ছে, তিনি তাঁর আগের কথাগুলো থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে এসে দোষারোপ ও কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে পা দিয়ে ফেলেছেন। তিনি কি আসলে ভয় করছেন, জামায়াত তাদের একাত্তরের ভূমিকা সত্ত্বেও জনগণের অনেক কাছে চলে এসেছে এবং নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য বিজয়ের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিচ্ছে? ব্রিটিশ শাসকরা যেমন উপমহাদেশে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি গ্রহণ করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি রেখা টেনে নিরাপদে ভারত শাসন করেছিল, সেই একই ধারায় আওয়ামী লীগ ‘একাত্তরের চেতনা’কে পুঁজি করে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে আওয়ামী দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে চেষ্টা করেছিল। শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছর টিকে থাকার মূলমন্ত্রই ছিল তাঁর ও তাঁর দলের ‘একাত্তরের চেতনা’। একাত্তরের চেতনা দিয়ে আওয়ামী লীগ শুধু জামায়াতকে নয়, বিএনপিকেও আঘাত করেছিল।
শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারম্যানের পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকার করতে চাননি। তাঁর মাজার অপসারণ করতে চেষ্টা করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর নির্মম নিপীড়ন চালিয়ে তাঁকে তিলে তিলে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু জনগণ শেখ হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। শেখ হাসিনার ভুল রাজনীতির পরিণতি তারেক রহমান এত দ্রুত বিস্মৃত হয়েছেন দেখে অনেকে বিস্মিত ও হতভম্ব।
তারেক রহমান ও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা কি জনগণের বড় একটি অংশের মধ্যে জামায়াত সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব, ইতোমধ্যে যে কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোতে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয়কে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে ভয় পাচ্ছেন? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও জামায়াতের ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়ার সম্ভাবনার কথা কি বিএনপি ও তারেক রহমানের মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট এবং কাতারভিত্তিক টেলিভিশন আলজাজিরার অতি সাম্প্রতিক রিপোর্ট বিএনপির জন্য শুভ বার্তা দেয়নি।
ওয়াশিংটন পোস্ট ‘ইউএস সিকস টু বি ‘ফ্রেন্ডস’ উইথ বাংলাদেশ’স ওয়ান্স-ব্যান্ড ইসলামিস্ট পার্টি’ (যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একসময়ের নিষিদ্ধ ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চায়) শিরোনামে এক দীর্ঘ রিপোর্টে বলেছে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল তাদের দলের ইতিহাসে সেরা ফলাফল অর্জনের পথে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পরিকল্পনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা।’
আলজাজিরা বলেছে, ‘জামায়াতে ইসলামী তাদের নানা উত্থান-পতনের জটিলতা পেরিয়ে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার প্রকৃত সুযোগ লাভের পর্যায়ে রয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের গত মাসের (ডিসেম্বর ২০২৫) এক জরিপে বিএনপির প্রতি ভোটারদের সমর্থন দেখানো হয়েছে ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ। জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘ন্যারেটিভ’, ‘প্রজেকশন বিডি,’ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি’ এবং জাগরণ ফাউন্ডেশনসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সংস্থার পরিচালিত জরিপে বিএনপির প্রতি সমর্থন ৩৭.৭ শতাংশ এবং জামায়াতের প্রতি ৩৩.৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির চেয়ে জামায়াতের প্রতি জনসমর্থনের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া জামায়াতের নির্বাচনি জোটে ছোটবড় আরও ৯টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। সন্দেহ নেই, বিএনপি যত সহজে নির্বাচনে জয়ী হবে বলে আশাবাদী ছিল, জামায়াত তাদের আশার গুড়ে কিছুটা হলেও বালি ছিটিয়ে দিয়েছে। হয়তো সে কারণে বিএনপির আশা-ভরসার ‘উৎস’ তারেক রহমান আওয়ামী লীগের কায়দায় জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘একাত্তরের চেতনা’কে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক
বিডি প্রতিদিন/মুসা