যেকোনো দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বোঝার জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতির গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কোন অবস্থায় আছে এবং কোন দিকে যাবে, তা বুঝতে হলে ঘোষিত মুদ্রানীতি জানা প্রয়োজন। অবশ্য মুদ্রানীতি ভালো কাজ করে সেই সব অর্থনীতিতে, যেখানে অর্থনৈতিক উপাদানগুলো বেশ মজবুত এবং আর্থিক ব্যবস্থা যথেষ্ট পরিপক্ব অর্থাৎ ম্যাচিউরড। যে দেশের অর্থনীতিতে সবকিছু নিয়ম মেনে চলে, প্রত্যেক অংশীজন নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং একটি মানসম্পন্ন আর্থিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকে, সেখানেই মুদ্রানীতি ভালো কাজ করে।
আমাদের দেশের অর্থনীতিতে এসব ব্যবস্থা একেবারেই অনুপস্থিত, বরং বলা চলে এক ধরনের বিশৃঙ্খল আর্থিক খাত এবং একেবারেই এলোমেলো বাজারব্যবস্থা বিরাজ করছে। তাই এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিকে খুব একটা কাজ করতে দেখা যায় না।
প্রতিবারই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে অনেকের মধ্যে, বিশেষ করে অর্থনীতিবিদ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক, থিংকট্যাংক এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মাঝে মুদ্রানীতি নিয়ে একটা আগ্রহ থাকে এবং এ ব্যাপারে যথেষ্ট আলোচনাও হয়। কিন্তু এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণার বিষয় নিয়ে সে রকম আগ্রহ কোনো মহলেই লক্ষ করা যায়নি।
অবশ্য এর অনেক কারণও আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো এক অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে চলছে, যা এ বছরও অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি। দ্বিতীয়ত, জাতি এখন এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে উত্তরণের পথে বা ট্র্যানজিশন পর্যায়ে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিও এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলছে।
চতুর্থত, বর্তমান গভর্নরের আমলে গৃহীত আগের কয়েকটি মুদ্রানীতি সে রকম সুফল বয়ে আনতে পারেনি।
অর্থনীতির দুটি মৌলিক বিষয় তথা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য থাকে এই মুদ্রানীতিতে। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মুদ্রানীতিতে ব্যবহার করা হয় নীতি সুদ হার, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য অন্যতম এক হাতিয়ার। অর্থনীতিতে সুদহার ও বিনিয়োগের মধ্যে এক বিপরীত সম্পর্ক বিরাজ করে। যেমন—সুদহার বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগ হ্রাস পায় অথবা সুদহার হ্রাস পেলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়।
আবার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটা সহায়ক সম্পর্ক আছে। যেমন—বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, যা প্রকারান্তরে বেকারত্ব হ্রাস করে। পক্ষান্তরে সুদহার বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগ হ্রাস পায়, যার প্রভাবে কর্মসংস্থান কমে যায়, যা প্রকারান্তরে বেকারত্ব বাড়িয়ে দেয়। এককথায় অর্থনীতিতে সুদহার, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—এই চারটি উপাদান একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং এগুলোর মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।
মুদ্রানীতিতে নীতি সুদ হার বৃদ্ধি করা হয় মূল্যস্ফীতি হ্রাস করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সুদহার ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতি হ্রাস করার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে খুব কম। বাংলাদেশ ব্যাংক গত দেড় বছরে পর পর তিনবার নীতি সুদ হার বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গেছে, অথচ মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে সরকারি হিসাব অনুযায়ী। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী বা বাস্তবে মূল্যস্ফীতি কোন মাত্রায় আছে, তা যাঁরা বাজারে যান, তাঁরাই ভালো জানেন। এর সুনির্দিষ্ট কারণও আছে। মূল্যস্ফীতি হচ্ছে মুদ্রানীতি সংক্রান্ত এবং মুদ্রানীতি বহির্ভূত উপাদানের প্রভাব। মুদ্রানীতি সংক্রান্ত উপাদানের মধ্যে আছে নীতি সুদ হার এবং অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহের মতো বিষয়। মুদ্রানীতি বহির্ভূত উপাদানের মধ্যে আছে অনেকগুলো বিষয়; যেমন—(১) উৎপাদনব্যবস্থা, (২) আমদানি ব্যয়, (৩) বাজারব্যবস্থা, (৪) গুদামজাতের সুবিধা, (৫) সাপ্লাই চেইন, (৬) সরবরাহব্যবস্থা, (৭) অপ্রকাশিত ব্যয়, যেমন—চাঁদাবাজি, (৮) মানসম্পন্ন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি, (৯) ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং (১০) জনগণের সচেতনতা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের দেশে মুদ্রানীতি বহির্ভূত কোনো উপাদানই মোটেই সহায়ক নয়, বরং একেবারেই প্রতিকূল। ফলে আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতির পেছনে মুদ্রানীতি সংক্রান্ত উপাদান যত না ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তার চেয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে মুদ্রানীতি বহির্ভূত উপাদান। এ কারণেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতি, বিশেষ করে নীতি সুদ হার মোটেই কাজ করতে চায় না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ হার বাড়িয়ে রাখলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, কিন্তু দেশের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। উচ্চ নীতি সুদ হারের কারণে দেশের ব্যাংকঋণের ওপর সুদহার দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ। এত উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগ লাভজনক করা সম্ভব নয়। কেননা এত উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ নিলে, সেই ঋণ প্রতি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হবে, যা কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। ফলে গৃহীত ঋণ অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হতে বাধ্য। বাংলাদেশে যে পাহাড়সম খেলাপি ঋণ, তার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে ঋণের উচ্চ সুদ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, উচ্চ নীতি সুদ হার অনেক সময় মূল্যস্ফীতি হ্রাস করার পরিবর্তে বাড়িয়েও দেয়। যেমন—উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসায়ীদের যে বিশাল অঙ্কের আর্থিক খরচ হয়, তা উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যোগ করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেড় বছর ধরে নীতি সুদ হার বাড়িয়ে রেখেছে। অথচ বিশ্ব এখন নিম্নমুখী সুদহারের সময়ে প্রবেশ করেছে। বিগত এক বছরে উন্নত বিশ্বের সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নীতি সুদ হার হ্রাস করেছে একাধিকবার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদ হার যেখানে ১০ শতাংশ, সেখানে অনেক উন্নয়নশীল দেশের, এমনকি আমাদের প্রতিযোগী দেশ; যেমন—ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও নীতি সুদ হার ২.৭৫ থেকে ৫.২৫ শতাংশ। বিশ্ব যখন নিম্নমুখী সুদহারের সময়ে, বাংলাদেশ তখন উচ্চ সুদ হার অনুসরণ করছে, যা কোনোভাবেই সহায়ক হতে পারে না। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে, বৈশ্বিক লেনদেনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার স্বার্থে নীতি সুদ হার হ্রাস করা এখন সময়ের দাবি।
দেশের বর্তমান সরকার, রাজনীতি ও অর্থনীতি এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে খুব বেশি কিছু করারও নেই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে কাজটি করতে পারে, তা হচ্ছে মুদ্রানীতির উল্লেখযোগ্য উপাদান; যেমন—নীতি সুদ হার এবং অর্থ সরবরাহের বিষয়টি সহজ করতে পারে। এটি করা সম্ভব হলে দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে, যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিশেষ করে সুদহার হ্রাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে তাদের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। তাই এই মুহূর্তে মুদ্রানীতিতে বড় পরিবর্তন আনার সুযোগ হয়তো থাকবে না, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তাদের মুদ্রানীতি সহজ করা, বিশেষ করে বেঞ্চমার্ক সুদহার হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে গ্রহণ করে, তাহলে সেটি তারা মুদ্রানীতি ঘোষণার পরও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ রকম পদক্ষেপ ব্যবসায়ীদের জন্য হতে পারে একটি স্বস্তির খবর। আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক বিরাজমান সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাদের ঘোষিত মুদ্রানীতি সহজ করবে, যার অন্যতম একটি পদক্ষেপ হতে পারে নীতি সুদ হার হ্রাস করা।
লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা