সরকারের নানামুখী চেষ্টা, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স দিয়ে অর্থনীতি হৃষ্টপুষ্ট রাখা যাচ্ছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং বিনিয়োগ মন্দা মিলে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি কোনো ম্যাজিকে পাল্টে যাবে, এমনটি আশা করার কারণ নেই। সামগ্রিক অর্থনীতির সামনে আরো চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতি না বোঝা মানুষের কাছেও লুকানোর জো নেই।
স্বয়ং পরিকল্পনা উপদেষ্টাও এক অনুষ্ঠানে তা স্বীকার করেছেন। মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো যাচ্ছে না, সেই ইঙ্গিতও দিয়েছেন। এসেছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কথাও। ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের দুরবস্থা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
তথ্য স্বীকার করা হলেও অর্থনীতির দুর্গতি আজকের এ পর্যায়ে আসার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখা হয়নি।
ব্যবসা-বিনিয়োগসহ অর্থনীতিতে ধস নামা, ব্যবসায়ীদের চাপে-তাপে চ্যাপ্টা হওয়ার প্রবণতা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময় থেকেই। গণ-আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকারের অভিষেকে অর্থনীতিসহ নানা সেক্টরে জন-আকাঙ্ক্ষার পারদ চড়তে থাকলেও বাস্তবটা বড় নিষ্ঠুর। এ মাস যেমন-তেমন সামনের মাসে কী হবে, এমন দিনাতিপাত এখন শুধু ব্যবসায়ী বা অর্থনীতির ঘানি টানায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নন, সরকারেরও।
প্রকারান্তরে গোটা দেশেরও। বিনিয়োগ মন্দা, বড় রাজস্ব ঘাটতি, বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, অদক্ষ এডিপি বাস্তবায়ন ও হতাশাজনক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সরকারকে কাবু করে দিয়েছে। আর সরকার ‘মুমূর্ষু’ করেছে জনগণসহ গোটা দেশকে। অর্থনীতির স্লথগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ২০ লাখ।
বর্তমানে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৭ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের ঘরে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী ছয় মাসে আরো ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শুরু থেকেই সরকার অর্থনীতির বাঁক ঘোরানোর চেষ্টা করেছে। নিয়েছে নানা উদ্যোগ। কাজটি করেছে ব্যবসা-বিনিয়োগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অংশীজন না করে। কেবল অগ্রাহ্য নয়, তাঁদের কখনো কখনো একতরফা খলনায়কও করে ফেলা হয়েছে। মানি লন্ডারিং, রাজস্ব ফাঁকি, ভূমি দখল, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ইত্যাদি ঢালাও অভিযোগে বিচারের আগেই বিচার। সাজাও দিয়ে ফেলা। পারলে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে নাতিপুতিদেরও চরিত্র হননের কাজটি করে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়, আরো অনেক কিছুই জব্দ করা যেত। কিন্তু সেই পথ না মাড়িয়ে মব সন্ত্রাসের মতো একতরফা ট্রায়ালে একদিকে বিনিয়োগকে মাঠে মারা হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিকভাবে সম্মানহানি করা হয়েছে। এর অনিবার্য জেরে প্রায়ই ছোট-বড় কোনো না কোনো মিল-কারখানা, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে হতে এখন এক চরম সন্ধিক্ষণ। তাতে ফল হয়েছে বেকারত্ব। শুধু ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর ও সাভার শিল্পাঞ্চলে ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এখানে বেকার হয়েছে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। বেকারত্বের এ হটস্পটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। নানা মহলের দাবি-দাওয়াও রোখা যায়নি। যে যেখান দিয়ে পেরেছে রাস্তায় নেমে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। ঘেরাও, বন্ধ, ভাঙচুর চালিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার উঠানেও চলে গেছে বিক্ষোভ। প্রফেসর ড. ইউনূস কম-বেশি সবার কথাই শুনেছেন। অনেক দাবি-দাওয়া পূরণও করেছেন। কিন্তু ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা কেবল যন্ত্রণা সয়ে চলেছেন। রাস্তায় নামেননি, কর্মবিরতির সুযোগও তাঁদের নেই। অনবরত লোকসানে হয়রান হয়েছেন। সরকারের দিক থেকে কখনো ব্যবসায়ীদের কাছে ডাকা হয়নি। পরামর্শ নেওয়া দূরে থাক, তাঁদের কষ্টের কথা শোনার গরজও বোধ করা হয়নি। তা সমাজে তাঁদের মানসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো। ব্যবসায়ীদের কাছে বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে হয়রানিমূলক, সামাজিকভাবে চরম নিপীড়নমূলক। হিংসাত্মকও। লাজশরমে ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী না পারতে প্রকাশ্যে বেরও হন না। নতুন বিনিয়োগ দূরে থাক, এত দিনে করা বিনিয়োগ রক্ষা নিয়েও পেরেশানিতে অনেকে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর একদিকে যেমন বেশ কিছু শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে, আবার সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানাও অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
অর্থায়ন সংকট, ঋণ সহায়তা, সুদহার বৃদ্ধিও ব্যবসায়ীদের অনেকের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। বিশ্বের কোনো বিনিয়োগকারীই এমন অনিশ্চয়তায় থাকতে চান না। তার ওপর অসম্মানিত হতে থাকা দুর্ভাবনার। যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে একটা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হয়, বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় সেটা নেই—এ কথা স্পষ্ট করে বলার অবস্থা অনেক ব্যবসায়ীরই নেই। ব্যাপক বিনিয়োগ, গতিময় ব্যবসা, চাঙ্গা পুঁজিবাজার, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধিসহ সম্ভাবনার দরজা-জানালা খোলা রাখা সরকারকে মোটাদাগে অনেক সহায়তাও দিতে পারত। প্রায় একই স্কেলে নেপাল-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশে দুঃশাসকের পতনসহ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। ঘটনাপ্রবাহও কাছাকাছি। কিন্তু শাসনতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় নেপাল-শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ব্যাপক তফাত বাংলাদেশের। বাংলাদেশের মতো সংস্কার, ঐকমত্য, মব-গুজব, আন্দোলনকারী ফ্রন্টফিগারদের নানা ক্রিয়াকর্মের ক্যারিকেচার না থাকায় শঙ্কিত হতে হয়নি সেখানকার ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের। তা দেশ দুটির অর্থনীতির ধমনি জোরালোভাবে চালু রেখেছে। সরকারও সাফল্য দেখাতে পেরেছে। ব্যবসায়ীদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা এনেছে শ্রীলঙ্কা-নেপাল। ভিয়েতনাম কর সুবিধা, রপ্তানি সহজীকরণ ও বিনিয়োগ সহায়তা নির্বাচন করে বিনিয়োগকে স্থিতিশীল করেছে। বাংলাদেশ ও দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্ষেত্রে একেবারেই বিপরীতে।
এখানে অর্থনীতিসহ সব দিকে গতিশীলতা আনতে বেসরকারি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রাধিকারের বদলে আরো দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যার জেরে সরকার, দেশ, জনগণ মিলিয়ে আজকের এ অবস্থা। টেনে আনতে ছিঁড়ে যাওয়ার অবস্থায় পড়ছে সরকার। কোনো চেষ্টাই শেষতক কাজে আসছে না। অনিবার্যভাবে চেপে বসেছে বিনিয়োগহীন মূল্যস্ফীতি। বিনিয়োগে খরার টান পড়লে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। অনেক চেষ্টা হলেও বিদেশি বিনিয়োগও আনা যায়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারি হিসাবও বলছে, বিদেশি বিনিয়োগ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কমেছে। বেসরকারি খাতে এমন অবস্থা চলছে, অথচ সরকারি খাত ঠিকই ব্যাংকের টাকা নিয়ে খরচ মেটাচ্ছে। বেসরকারি খাত বা জনগণের সেই সুযোগ নেই। বরং ক্রমেই বাড়ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট, ঋণের উচ্চ সুদের হার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে হজম করে কোনো রকমে দম-নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচে থাকাকে নিয়তির মতো মেনে নিতে হচ্ছে। নীতি সহায়তার বদলে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এখনো চলছে মিডিয়া ট্রায়াল। নানা ধরনের হয়রানি ও মিথ্যা মামলার বিড়ম্বনায় যেন প্রতিবাদ জানাতেও মানা। তাঁদের ‘ব্যবসা করাই অপরাধ’-এর জায়গায় এনে দাঁড় করানো হয়েছে। তাঁদের সমস্যা দূর করা পরের কথা, সমস্যা কী বা সমস্যার গতি-প্রকৃতি নিয়ে কথা বলার উদ্যোগও আজ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি, যা দেশকে একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তিকর অবস্থায় এনে ঠেকিয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন