বাংলাদেশের মানুষের জাগরণের মাস ফেব্রুয়ারি; এবার এসেছে খুব নীরবে। এত নীরবে আর কখনো আসেনি কোনো ফেব্রুয়ারি। রাজনীতিমুখর যারা, তারা বলবেন, নীরবে কোথায়! এবার তো মাসটি এসেছে ভোটের মাদল বাজিয়ে। শহর ও গ্রাম জেগে উঠেছে ভোটের উত্তাপে। বহুদিন ভোট সামনে রেখে মানুষকে এতটা মুখর হতে দেখা যায়নি। তবে এই মুখরতা কতটা প্রাণবন্ত, কতটা নির্মল ও সুন্দর তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বলা হয়েছিল, এবার একটি সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়া হবে। ইলেকশন হবে উৎসবমুখর। কিন্তু সেই উৎসবের আমেজটা ঠিক পাওয়া যাচ্ছে না। হিংসার রাজনীতি ভোটের বাতাস বিষাক্ত করে তুলেছে অনেক ক্ষেত্রে। ইলেকশন হচ্ছে বলে এবার ভাষার মাস বলে সমাদৃত ফেব্রুয়ারি গুরুত্ব হারিয়েছে, ব্যাপারটি কিন্তু মোটেও তেমন নয়।
অতীতে আরও বেশ কয়েকটি সাধারণ নির্বাচন ফেব্রুয়ারি মাসে হয়েছে। ১৯৭৯ সালে দেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদের নির্বাচন হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি। বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ভোট চলাকালে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা সামগ্রিক পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। প্রার্থীরাও সন্তুষ্ট ছিলেন, যদিও ফলাফল প্রকাশের পর শেখ হাসিনা সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন। সেই অভিযোগ ধোপে টেকেনি।
১৯৯১ সালের নির্বাচনটি তাৎপর্যের বিচারেও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, সেটা ছিল একটা টার্নিং পয়েন্ট। এরশাদের পদত্যাগের পর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার। সেটি কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না। অন্তর্বর্তীও না।
জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য স্রেফ ফাইজুস সালেহীনএকটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তিনি শর্ত দেন যে এই পদ তিনি নিতে পারেন, তবে দায়িত্বপালন শেষে তাঁকে তাঁর প্রধান বিচারপতির পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। তাতে সব দল ও জোট সম্মতি দিলে তিনি অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিন জোটের রূপরেখায় সংবিধান সংশোধন করে পার্লামেন্টারি ডেমোক্র্যাসি চালুর কথাও বলা হয়েছিল। তিন জোটের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল খুব কম সময়ের মধ্যে। এজন্য কোনো কমিশন গঠনের প্রয়োজন হয়নি। কোনোরূপ গণভোটও হয়নি। কোনো বিশেষজ্ঞের অমূল্য পরামর্শ ছাড়াই আমাদের তৎকালীন বিদগ্ধ রাজনৈতিক সমাজ রূপরেখা দিতে পেরেছিলেন। এবং সেই রূপরেখা বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পেরেছিল গভীর থেকে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিএনপি জয়লাভ করলেও সরকার গঠনের মতো মেজরিটি পায়নি। পেয়েছিল ১৪০টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫১টি আসন। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮৮টি। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল ১৮টি আসন। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে থাকে, তাহলে এই ১৮টি আসনই জামায়াতে ইসলামীর ইলেকশন ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। উল্লেখ্য তখন জামায়াতের আমির ছিলেন আব্বাস আলী খান। অনেকেই আব্বাস আলী খানকে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই মডারেট মনে করে থাকেন। তিনি উগ্র কথাবার্তা কম বলতেন। তখন সরকারে জামায়াতে ইসলামী যোগ না দিয়ে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল। ফলে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির পক্ষে সরকার গঠন সহজ হয়েছিল। ’৯১ সালের পার্লামেন্টই শাসনতন্ত্রে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধমে দেশে চালু করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা। এ ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন, যার মূলে ছিল তিন জোটের রূপরেখা।
ইতিহাসটুকু বলার উদ্দেশ্য এই যে ফেব্রুয়ারি মাসে ইলেকশন হলেও একুশের উদ্দীপনা তাতে একটুও ম্লান হয়নি। নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানও একুশকে ছাপিয়ে যায়নি। এর আগেও ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন একুশের আমেজ ম্লান করেনি। কিন্তু ’২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও এবারের নির্বাচন একুশের ওপর যেন কালো পর্দা টেনে দিয়েছে। এ বছর কোথাও একুশের কোনো গানও বাজতে শোনা যায় না। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, কিংবা মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা, ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়-এই অজেয় গানগুলোও যেন বা হারিয়ে গেছে। অথচ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং তার মধ্য দিয়ে অঙ্কুরিত বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাই স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনায় সঞ্চারিত করেছিল সুতীব্র প্রাণাবেগ। একুশে হয়ে উঠেছিল বাঙালির নবজাগরণের মূলমন্ত্র। ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, গানে ও কবিতায় যে বিপুল প্রাণ সঞ্চারিত করেছিল তা অব্যাহত ছিল ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পূর্বপর্যন্ত। এরশাদের একনায়কতান্ত্রিক শাসন কিংবা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসন একুশের চেতনা খর্ব করেনি। বরং এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময়ে একুশের প্রাণাবেগ দেশের রাজনীতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ডাকসুর নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৮৭ সাল থেকে ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ জাতীয় কবিতা উৎসবের আয়োজনের সূত্রপাত হয়। সেটা অব্যাহত ছিল এই সেদিন পর্যন্ত। সে সময়ে রাজধানী ঢাকায় এবং দেশের প্রায় সব জেলা শহরে গড়ে উঠেছিল সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রবল আন্দোলন। গড়ে উঠেছিল শত শত সাংস্কৃতিক সংগঠন। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, যশোর, খুলনা, বগুড়া, সিলেট ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হতো সাহিত্য-সংস্কৃতির বিবিধ আয়োজন। এসবের বেশির ভাগই হতো ফেব্রুয়ারি মাসে। এসব আয়োজনের অন্তরমূলে ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেরণা। লিটল ম্যাগ ও প্রথাবিরোধী সাহিত্যের ধারাটিও তখন বেগবান হয়ে উঠেছিল। থিয়েটার আন্দোলনের জন্যও সেই সময়টা ছিল গতিষ্মান। ঢাকার বেইলি রোডকে তখন অনেকে বলতেন নাটক সরণি। মোটকথা একুশের প্রেরণা বাঙালির মনের জগৎকে এতটাই আন্দোলিত করেছিল, সে হয়ে উঠেছিল সতত বিকাশোন্মুখ। তখনই বিকাশ ঘটতে শুরু করেছিল একটি সৃজন ও মননশীল প্রজন্মের। বিকাশ ঘটতে শুরু করেছিল নানা মত ও পথের। সেই প্রজন্মের মধ্যে চিন্তার বৈপরীত্য ছিল, বিভিন্নতা ছিল। কিন্তু প্রত্যেকেই ছিলেন অশুভর বিরুদ্ধে। তারা সোচ্চার ছিলেন অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে। বোম্বের নগ্নতা, হিন্দি গান ও সিনেমার প্রাবল্য, খেমটা নাচ, খিস্তিখেউড়ের যে সংস্কৃতি-সেই সংস্কৃতির বিপক্ষে ছিল বিকাশমান প্রজন্মের অবস্থান। অপরাজনীতির পক্ষেও ছিলেন না তারা কখনোই। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তারা অংশগ্রহণ করেন সৃজনশীলতার শক্তিসহযোগে। জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে বসে আঁকা হয়েছিল বিশ্ব বেহায়া নামের সেই বিখ্যাত কার্টুনচিত্রটি।
দেশ ও বিশ্বের ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি মাসে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। কিন্তু বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি মাসটি বিশেষভাবে চিহ্নিত ’৫২-এর একুশ তারিখের জন্য। বাঙালির হৃদয়ে এই মাসের নামটি যেন চিরকালের জন্য লেখা হয়ে গেছে রফিক, সালাম, জব্বারের রক্তের অক্ষরে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারা দেশে ছোটবড় হাজার মিনার, বাংলা একাডেমি, অমর একুশে গ্রন্থমেলা, শতসহস্র বই, বইয়ের হাজার পাঠক, অগণিত শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, বাঙালির গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম সাক্ষ্য দেয় ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্দীপন ও উজ্জীবনের নাম। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে এসেছি বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারি এলেই দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামটি ছেড়ে দেওয়া হয় একুশের জন্য। একুশ ফেব্রুয়ারির জন্য নিবেদিত বিশেষ কলাম ছাপা হতো প্রতিদিন। ভাষা সাহিত্য নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা প্রকাশিত হতো পত্রিকায়। এবার জাতীয় নির্বাচনের অজুহাতে অমর একুশে বইমেলাটাও হলো না। অথচ ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইলেকশন হলেও বইমেলা বাধাগ্রস্ত হয়নি। এবার হয়েছে। জাতীয় কবিতা উৎসবও হয়নি। কবিরা শুনেছি বিভক্ত। তাদের বিভাজন কবিতার উৎসবকে অনুৎসবে পরিণত করেছে। অতীতে রোজার মাসেও বইমেলা হয়েছে। রোজা বইয়ের প্রকাশ, বিপণন ও পাঠ আটকায়নি। এবার আটকে দিয়েছে। অতীতে বাংলা একাডেমি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের মতো কাজ করতে পেরেছে। এবার পারেনি। অবশ্য গত বছর বইমেলা যথাসময়ে হয়েছিল। কিন্তু সেই মেলার বাতাস ছিল কৃত্রিমতায় ভরা। একটি ডাস্টবিনের জন্য মেলাটি বেশ আলোচিত হয়েছিল। গতবারের মেলায় বহু পাঠক যায়নি।
নানান ছলছুতায় অথবা বেখেয়ালে আমরা যে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিকে অনেকটাই অপাঙ্ক্তেয় করে দিলাম-এর ফল খুব ভালো কি হবে আমাদের? যারা নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষশক্তি বলে দাবি করেন এবং আমরা যাদের বিশ্বাসও করি তাদের কি এ বিষয়ে কিছু বলবার নেই? তারা কি ভুলে গেছেন জিয়াউর রহমানের (শহীদ প্রেসিডেন্ট) লেখা একটি জাতির জন্ম নামের বিখ্যাত প্রবন্ধের মর্মকথা? সেই প্রবন্ধের শুরুতেই কি বলা হয়নি, পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মি. জিন্নাহ যেদিন ঘোষণা করলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, সেদিনই বাঙালি জাতির অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল!
জাতীয় নির্বাচন অত্যাসন্ন। এই সময়ে বেয়াড়া প্রশ্নগুলো না হয় চেপেই গেলাম। তবে আশা করি, একটি ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি ভালো সরকার পাব। যারা আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেবেন। খিস্তিখেউড়ের যে একটি রাজনৈতিক ভাষার ধারা তৈরি হয়েছে, সুশাসন দিয়ে, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার শুভবোধ দিয়ে তারা এই ভাষা মুছে দেবেন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক