জনগণকে দেশের মালিকানা ফেরত দিতে হলে দরকার নির্বাচনের। সেই প্রশ্নে আসন্ন নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের নয়, বন্দোবস্ত বদলেরও। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, দেশে যেন আর ফ্যাসিবাদ-একত্ববাদ তথা স্বৈরাচার জন্ম না নেয়। কারো দ্বিমত করার কারণ নেই যে, বিতাড়িতদের আমলে টানা তিনটি নির্বাচনী তামাশা শুধু একজন আয়রন লেডি জন্ম দেয়নি, ভোটাধিকারও কবর দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থাকে ছারখার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন ও বিশাল দলটিকেও ফেরারি করে দিয়েছে। বিশ্বদরবারে দেশকে কলঙ্কিত তো করেছেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে চারটি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মনে করা হয়।
পরাজয়ের ভয় থেকে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আদালতকে ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেশবাসীকে ভোটাধিকারহীন করেছে। নিজেদেরও নিয়ে গেছে ঘৃণা ও পরিত্যক্তের খাতায়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মানলে জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সেটাও বলতে গেলে এক দিন।
পাঁচ বছরে মাত্র এক দিন, অর্থাৎ নির্বাচনের দিন তারা ক্ষমতায়িত হয়। তারা ভোট দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসায়। তাদের মতকে পাঁচ বছর গুরুত্ব দেবে সরকারটি। সেটাই প্রকারান্তরে জনগণের ক্ষমতায়ন। এবারের নির্বাচনটি তাই শুধু উৎসবের নয়, গভীর চিন্তা-ভাবনার বিষয়ও।
ভোটাররা সচেতনভাবে যোগ্য প্রার্থীকে শুধু ভোট দেওয়াই নয়, ভোটের পর নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলে তাদের পছন্দের দল বা সরকার এদিক-ওদিক করতে পারবে না। জনমতকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য থাকবে। তাই নির্বাচনে ভোটারদের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। ব্যক্তির গুণাবলি, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য দেখে ভোট দেওয়াও দায়িত্ব। নির্বাচনী ব্যবস্থা সুন্দর হলে ভোটারদের সমর্থন না পেলে একজন ব্যক্তির পক্ষে সংসদ সদস্য হওয়া অসম্ভব। তখন দুষ্ট লোকদের পক্ষে সম্ভব হবে না পবিত্র সংসদে যাওয়া। তাই নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করা, ভোটারদের অসচেতনতা বা দুষ্ট লোকদের ‘না’ বলার বন্দাবস্ত রচনাই এবার উপযুক্ত সময়। ভোটারদের রুচি-বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমালোচনা কাটানোরও একটা মোক্ষম সময়।
লক্ষ করার বিষয়, এবারের নির্বাচনের দিকে বিদেশিদেরও কড়া দৃষ্টিপাত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো নির্বাচন সামনে রেখে এতগুলো দেশ একসঙ্গে এত বেশি সক্রিয় হয়নি। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বরাবর বিদেশি কূটনীতিকদের চোখ-চাহনি থাকলেও এবারের পরিপ্রেক্ষিত বেশ ভিন্ন। এবার সরকার আর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের যোগাযোগ, বৈঠক, নানা বিষয়ে তাগিদ ও পর্যবেক্ষণ শুধু রেওয়াজ নয়, বাড়তি আরো অনেক কিছু। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানিয়ে দিয়েছেন নির্বাচন ও নির্বাচনের জন্য তাঁদের উতল অপেক্ষার কথা। জানিয়েছেন মানুষের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও অপেক্ষার কথাও।
আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচন আয়োজনের বড় শরিক নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতি জানতে সেদিন কমিশনে সশরীরে চলে যান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। উল্টেপাল্টে ব্যালট পেপারের আকার-আকৃতিও দেখেছেন। তাঁর আগ্রহদৃষ্টে সিইসি বিস্তারিত জানান কমিশনের প্রস্তুতির বিষয়াদি। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। এর বাইরে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। নির্বাচনে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকদল পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র। পর্যবেক্ষণে বের হবেন তাদের ঢাকাস্থ দূতাবাস কর্মকর্তারাও। এই তথ্যের সোর্স ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি এও পরিষ্কার করে জানান, ইসির তালিকাভুক্ত ‘প্রথাগত (ফরমাল) অবজারভার’ নয়, নিজস্ব উদ্যোগে ভোটের অবস্থা দেখবে মার্কিনরা।
বাংলাদেশে নির্বাচন সামনে রেখে খুব ক্রুশিয়াল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় আসেন গত ১২ জানুয়ারি। বাংলাদেশ বিষয়ে অনেক হোমওয়ার্ক তাঁর। ভোটের কাউন্টডাউনের এই সময়ে তাঁর এমন বক্তব্য ও দূতাবাসের প্রস্তুতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একার নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশী আরো অনেক দেশ ও সংস্থার বার্তা অভিন্ন। ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তৎপর। বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। সরকারের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে দেনদরবারও বেশ। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কূটনীতিকদের তৎপরতার কিছু কিছু গণমাধ্যমে আসছে। প্রেসকে এড়িয়ে বা না জানিয়ে অনানুষ্ঠানিক ওঠাবসাও চলছে।
চীনসহ এশিয়া অঞ্চলের কূটনীতিকরা দলীয় প্রধানদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। বৈঠকের বাইরে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বড় দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হয়ে কূটনীতিকদের মূল চাওয়া সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে স্বস্তিতে কাজ করার আগ্রহের কথা তাঁরা বেশ পরিষ্কার করেই বলছেন। এ নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক কোনো পক্ষেরই অনাগ্রহ নেই। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে এর জের ও পরিণতি সম্পর্কে কোনো কোনো দেশের কূটনীতিকরা সতর্কবার্তাও দিয়ে চলছেন। তাই সবারই প্রত্যাশার পারদে সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচিত-সাংবিধানিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং স্থিতিশীল দেশ। এই তাগিদ ও আকাঙ্ক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর তিন দিন আগেই জেলাভিত্তিক পর্যবেক্ষকদল পাঠিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। ৫৬ জনের প্রতিনিধিদল দুজনের গ্রুপে ভাগ হয়ে দেশের সব জেলা পরিদর্শনে রয়েছে। বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়েও চোখ-চশমা ফেলছে। নোট নিচ্ছে। সরকার ও কয়েকটি দলের কনসার্ন জায়গায় অবহিত করছে। কিছু নমুনায় অনেকটা স্পষ্ট, এবার দলগুলো বেশ গোছানো ইশতেহার দিয়েছে।
আর ইশতেহার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দায়ও। প্রার্থীদের অনেকের মধ্যেও এবার দল ঘোষিত ইশতেহারের বাইরে নিজ নিজ এলাকায় বিশেষ ওয়াদা দেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া যায়। কারণ গেল তিনটি নির্বাচনে তো পারতপক্ষে ওয়াদা দেওয়ার দরকার হয়নি। কেউ ভোট দিলে বা না দিলে কিছু যায়-আসে না—এই মনোভাবের কারণেই এমনটি হয়েছে। এবার ব্যতিক্রমের নেপথ্যে কাজ করছে জনগণ ছাড়া রাজনীতি টেকসই হবে না—কিছুটা হলেও এই বোধ জাগা। ভোটের আগে তাঁরা যেভাবে ভোটারদের শরণাপন্ন হচ্ছেন, জড়িয়ে ধরছেন, ভোটের পরও তা মনে রাখলে রাজনীতিতে কিছুটা হলেও নতুন বন্দোবস্তের সূচনা হবে। সেই মনোযোগ, শ্রবণযোগ্যতা অব্যাহত থাকলে রাজনীতির চরিত্র বদলাতে থাকবে বলে আশা করতে দোষ নেই। সমান্তরালে এ কথাও সত্য, ভোটাধিকার আর নির্বাচনই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়।
মানুষের জীবিকা, আয়-রোজগার, কর্মসংস্থান, সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক অধিকারকে আলাদা করা যায় না। দেশের অর্থনীতিসহ কিছু বিষয়কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতেই হবে। কে ব্যবসা করবে, কে ঋণ পাবে, কে চাকরি পাবে—এসব যেন রাজনৈতিক পরিচয়ে না হয়। যা চলেছে গেল সরকারটির আমলে। অর্থনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ না হলে তার বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর—কর বাড়ে, এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে আর কিছু লাগে না। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পদ ও সুযোগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ব্যাংক খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়—এসবের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব মূল ভূমিকা রেখেছে। দেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বিপুলভাবে বেড়েছে এ কারণেই। নতুন বন্দোবস্তে এর সুরাহায় সচেতন থাকতে হবে ভোটারদের। তাদের এই সচেতনতার পাশাপাশি ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ধরে রাখার দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। ক্ষমতাচ্যুত দল ও তাদের সমর্থকরা নির্বাচন বানচাল করতে চাইবে, তা মাথায় রাখতে হবে।
সরকার ও মাঠে থাকা দলগুলোর সঙ্গে ভোটাররাও সচেতন থাকলে বিতাড়িতরা ভোট বানচালের অপচেষ্টা করলেও সুবিধা করতে পারবে না। নির্বাচন কেমন হবে, সেটা বহুলাংশে নির্ভর করে সরকার ও মাঠে থাকা দলগুলোর ওপর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণ বিষয়ে আগ্রহী পশ্চিমাদের সমর্থনও বড় বিষয়। ইতিবাচক দিক হলো, সেনাবাহিনী শুরু থেকেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে। এই কাজে সহায়তা করে দ্রুত ব্যারাকে ফেরার বিষয়ে আগ্রহের কথা তারা জানিয়েছে বারবার। ফ্যাসিবাদের পতনের পর থেকেই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের ব্যবস্থা করার স্পষ্ট বার্তা ছিল সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের। দেশকে গণতন্ত্রায়ণে আনতে তাঁর ও বাহিনীর আন্তরিকতার কথা বলে আসছেন অবিরাম। শুধু কথায় নয়, কাজেও তার প্রমাণ দিয়ে চলছেন তিনি, যা অতীত-বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ইতিহাসেরও পাঠ-পঠন হয়ে থাকবে। চৌকস সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের চব্বিশের সময়োপযোগী ম্যাজিক দেশকে রক্তপাত থেকে বাঁচিয়ে সামনে এগোনোর একটি পথরেখা দিয়েছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, সমরনীতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্বকে আলাদা করা যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সব সময়ই প্রাসঙ্গিক। কখনো কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও। ২০২৪ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সেনাবাহিনী যেভাবে অংশীজন হয়েছে, তা সংগত কারণেই বাহিনীটির ওপর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। সামগ্রিক অনিবার্য পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেসি সক্ষমতা নিয়ে এখনো মাঠে আছে সেনাবাহিনী। আর আছে বলেই সম্ভাব্য অনেক বিপদ থেকে রক্ষা। একটি সুন্দর নির্বাচন তুলে এনে শুধু একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, গণতন্ত্রায়ণে নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ বিনির্মাণেও তা ভূমিকা রাখবে—এই অপেক্ষা সচেতন সবার।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন