সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে রূঢ় সত্যটি উচ্চারণ করেছেন, তা প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। তিনি ক্ষোভ আর আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘পাসপোর্ট-ভিসা জালিয়াতিতে বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এটি একটি জালিয়াতির কারখানা বানাইছি আমরা।’ একজন বিশ্ববরেণ্য নোবেল লরিয়েট যখন নিজ দেশের পাসপোর্ট-ভিসার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এমন প্রশ্ন তোলেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকার সময়টুকুও ফুরিয়ে এসেছে।
বছরের পর বছর ধরে এক নোংরা সিন্ডিকেট বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে ‘জালিয়াতির হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ড. ইউনূসের এই বক্তব্য কোনো রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং এটি একটি জাতির জন্য চরম আত্মশুদ্ধির ডাক। জালিয়াতির এই ক্যান্সার আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড প্রবাস আয়কে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের তরুণরা মেধাবী, সৃজনশীল, কিন্তু সেই সৃজনশীলতাকে অপকর্মে ব্যবহারের যে চোরাগলি গত দেড় দশকে তৈরি হয়েছে, তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে যে নতুন বাংলাদেশের দুয়ার খুলে দিয়েছে, সেখানে জালিয়াতির কোনো স্থান থাকতে পারে না।
ড. ইউনূসের এই ঐতিহাসিক সতর্কবার্তাকে সামনে রেখে আমাদের যুবসমাজকে উদ্ধার করতে এবং দেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে যা যা করা প্রয়োজন—
১. জালিয়াতির সংস্কৃতির মূল উৎপাটন ও দায়বদ্ধতা : আমাদের সমাজে জালিয়াতি আজ একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে চারিত্রিক সনদ—সবই যেন টাকার বিনিময়ে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। ড. ইউনূস ঠিকই বলেছেন, এই গোড়া কেটে দিতে হবে।
পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে প্রতিটি সেবা খাতে যে সিন্ডিকেট জালিয়াতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, তাদের শুধু বদলি নয়, বরং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জালিয়াতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। যখন একজন জালিয়াতিচক্রের হোতা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে, তখন অন্যদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে এবং স্বচ্ছতার পথ প্রশস্ত হবে।
২. প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার ও সৃজনশীলতার সঠিক পথ : প্রধান উপদেষ্টা আক্ষেপ করে বলেছেন, জালিয়াতি করতেও বুদ্ধি লাগে, কিন্তু আমরা সেই বুদ্ধিকে খারাপ কাজে লাগিয়েছি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতার শিক্ষা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি।
তরুণদের শেখাতে হবে যে ডিজিটাল দক্ষতা মানে হ্যাকিং বা ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি নয়, বরং এই সমস্যার সমাধান করা। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ‘ডিজিটাল এথিকস’ বা প্রযুক্তিগত নৈতিকতা বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। মেধার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে এই দক্ষ প্রজন্মই একদিন রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে জালিয়াতির কারখানা থেকে সরিয়ে বিশ্বমানের উদ্ভাবনী ল্যাবে নিয়ে যেতে হবে।
৩. গ্লোবাল সার্টিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড : বিদেশের বাজারে আমাদের সার্টিফিকেট কেন গৃহীত হয় না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষার মান ও যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু ডিগ্রি নয়, কাজের দক্ষতা ও বিশ্বস্বীকৃত সনদের প্রয়োজন। প্রতিটি জেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করতে হবে, যেখানকার সনদ সরাসরি কিউআর কোড বা ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যাচাই করা সম্ভব হবে। তরুণরা যখন দেখবে নিজ দক্ষতায় তারা বিদেশে সম্মানজনক কাজ পাচ্ছে, তখন আর জালিয়াতি বা ভুয়া সনদের আশ্রয় নেবে না।
৪. উদ্যোক্তা সৃষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ ও বিনিয়োগ : চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে অনেক তরুণ জালিয়াতি বা দালালদের খপ্পরে পড়ে। ড. ইউনূসের ‘থ্রি জিরো’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ) তত্ত্বের বাস্তব রূপায়ণ এখন জরুরি। শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং প্রশাসনিক সহজীকরণ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। প্রতিটি মেধাবী তরুণ যেন তার একটি আইডিয়া নিয়ে সরকারের কাছে গেলে সহায়তা পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার পথ মসৃণ হলে জালিয়াতির বাজার এমনিতেই ছোট হয়ে আসবে।
৫. প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটা বেইস : মধ্যপ্রাচ্যের এক মন্ত্রীর সঙ্গে ড. ইউনূসের আলাপে উঠে এসেছে যে ডাক্তার সেজে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ার লজ্জা। এই লজ্জা শুধু ওই ব্যক্তির নয়, পুরো জাতির। বিদেশে গমনেচ্ছু প্রতিটি মানুষের জন্য একটি ‘সেন্ট্রাল ডেটা বেইস’ তৈরি করা অপরিহার্য, যেখানে পাসপোর্ট নম্বর দিলেই তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং কর্মদক্ষতা দেখা যাবে। এই ডেটা বেইসের অ্যাকসেস গন্তব্য দেশগুলোর দূতাবাসকে দিতে হবে। এতে কোনো ব্যক্তিই মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিদেশে যেতে পারবে না এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে।
৬. মেধা পাচার রোধ ও যোগ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন : বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, মেধাবীরা যোগ্য সম্মান না পেয়ে দেশ ছাড়ছে, আর দুর্নীতিবাজরা ভুয়া সনদ দিয়ে ক্ষমতার আসনে বসছে। এই বৈষম্য তরুণদের হতাশ করে তোলে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে বিসিএস থেকে শুরু করে সাধারণ চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মেধার মূল্যায়ন হলে তরুণরা জালিয়াতির পথে নয়, পড়াশোনায় মন দেবে। যখন একজন মেধাবী দেখবে যে তার পরিশ্রমের চেয়ে জালিয়াতি করা ব্যক্তিটি বেশি সুবিধা পাচ্ছে, তখনই সে বিপথে পা বাড়ায়। এই চক্রটি ভাঙতে হবে।
৭. নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ : জালিয়াতি একটি সামাজিক পাপ এবং এটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে—এই বোধটি জাগিয়ে তোলা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে জালিয়াতির কুফল তুলে ধরতে হবে। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য যে ক্ষণস্থায়ী এবং এর পরিণাম যে ভয়াবহ, তা তরুণদের মগজে গেঁথে দিতে হবে। প্রতিটি পরিবারকেও সচেতন হতে হবে, যাতে তাদের সন্তান কোনো অসদুপায় অবলম্বন না করে। সামাজিক এই প্রতিরোধই হতে পারে জালিয়াতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দেয়াল।
৮. ‘হ্যাসেল ফ্রি’ সরকারি সেবা ও দালাল নির্মূল : সাধারণ মানুষ কেন জালিয়াতির আশ্রয় নেয়? কারণ বৈধ পথে সেবা পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ এবং সময়সাপেক্ষ। পাসপোর্ট অফিস বা এনআইডি সংশোধনে যদি মানুষকে দিনের পর দিন হয়রানি হতে হয়, তবে তারা দালাল ধরবে এবং জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হবে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে প্রতিটি সরকারি সেবা ‘পেপারলেস’ এবং ‘কন্টাক্টলেস’ করতে হবে। মানুষ ঘরে বসে তার সেবা পেলে দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং জালিয়াতির সুযোগ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
৯. তরুণদের জন্য বিশেষায়িত উদ্ভাবন তহবিল ও ইনকিউবেশন : বাংলাদেশে প্রতিভাবান ক্যাডার, ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ানদের অভাব নেই। কিন্তু তাঁদের মেধা বিকাশের জন্য নেই পর্যাপ্ত ল্যাব বা তহবিল। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে ‘ন্যাশনাল ইনোভেশন ফান্ড’ গঠন করতে হবে। মেধাবী তরুণদের প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করলে তারা দেশেই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে। তাদের মেধা যখন সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকবে, তখন জালিয়াতির মতো ধ্বংসাত্মক কাজে তাদের মগজ ব্যবহার করবে না।
১০. আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আস্থা পুনরুদ্ধারে কূটনৈতিক তৎপরতা : যেসব দেশ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না বা কড়াকড়ি করছে, তাদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন। ড. ইউনূস বিশ্বজুড়ে সমাদৃত একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর এই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে হারানো বাজারগুলো উদ্ধার করতে হবে। তবে এর আগে আমাদের প্রমাণ দিতে হবে যে আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি বন্ধ করেছি। জালিয়াতিমুক্ত বাংলাদেশই হবে আমাদের কূটনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
১১. ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহ ও নাগরিক অধিকার : প্রধান উপদেষ্টা ইন্টারনেটের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন, এটি তরুণদের প্রাণের জিনিস। ইন্টারনেট বন্ধ করা মানে তাদের শ্বাস রোধ করা। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থ হওয়া উচিত প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ইন্টারনেটকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম না বানিয়ে একে আয়ের উৎস এবং দক্ষতা অর্জনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।
১২. তারুণ্যনির্ভর নীতি নির্ধারণ ও অংশীদারি : রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাধারণত অভিজ্ঞদের প্রাধান্য থাকলেও তরুণদের প্রতিনিধি রাখা জরুরি। জালিয়াতির যেসব নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবিত হচ্ছে, সেগুলো প্রতিরোধের প্রযুক্তিগত সমাধান তরুণরাই দিতে পারে। নীতিনির্ধারণে তরুণদের সম্পৃক্ত করলে তারা নিজেদের রাষ্ট্রের অংশ মনে করবে এবং দায়িত্বশীল আচরণ করবে। তরুণদের শক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
১৩. সামাজিক ঘৃণা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ : জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক বিশাল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যারা জালিয়াতি করে বিদেশে যায় বা ভুয়া সনদে চাকরি পায়, সমাজকে তাদের বয়কট করতে হবে। জালিয়াতিকে যখন মানুষ ‘বীরত্ব’ না ভেবে ‘লজ্জা’ হিসেবে দেখবে, তখনই এটি নির্মূল হবে। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় জালিয়াতিচক্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। এই সম্মিলিত লড়াই ছাড়া ড. ইউনূসের দেখা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়া সম্ভব নয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে সত্যটি তুলে ধরেছেন, তা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে সত্য, তবে এটিই আমাদের পরিবর্তনের বড় সুযোগ। জালিয়াতির কলঙ্ক তিলক কপালে নিয়ে কোনো জাতি বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। এখন সময় সেই স্পৃহা নিয়ে জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার। তরুণদের মেধা যদি ইতিবাচক পথে পরিচালিত হয়, তবে বাংলাদেশ আর ‘জালিয়াতির কারখানা’ থাকবে না; এটি হবে ‘বিশ্বের উদ্ভাবনী কেন্দ্র’। আমরা বিশ্বাস করি, সুযোগ পেলে আমাদের তরুণরা আকাশ ছোঁবে এবং বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত করবে। জালিয়াতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হোক ছাব্বিশের শপথ।
লেখক : সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের উপদেষ্টা