আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় পাঁচ লাখের মতো প্রবাসী এরই মধ্যে পোস্টালে তাঁদের ভোট দিয়ে ফেলেছেন। এখন দেশে ভোটারদের অপেক্ষা ভোট দেওয়া আর নির্বাচিত সরকারের। ভোট নিয়ে সরকারের আয়োজনও ব্যাপক। উপদেষ্টারা সরকারি বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
জমা দিতে শুরু করেছেন তাঁদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট। নির্বাচিত নতুন সংসদ সদস্যদের সাবেক স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারের পরিবর্তে কে শপথ পড়াবেন সেই সিদ্ধান্তও পাকা। ভোটের এই তোড়জোড়ের মধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা মানুষকে উদ্বিগ্ন করছে। একটা সামলাতে না সামলাতে হঠাৎ আরেকটির উদ্ভব।
নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে চলল কদিন আন্দোলন। যমুনার দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে থামিয়েছে আন্দোলনকারী সরকারি কর্মচারীদের। নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে পে কমিশনের দিকে যেতে হলো কেন? নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যে গত ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পেশ করা হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এর জের সামলাতে হবে আসন্ন নির্বাচিত সরকারকে।
ভোট সামনে রেখে নবম পে স্কেলের উত্তেজনার মধ্যে আবার মাঠে ইনকিলাব মঞ্চ। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। দেশকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলার হুমকি। হাদি হত্যা মামলার তদন্ত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে করার দাবি মেনে নিয়েছে সরকার।
প্রায় মাসখানেক আগে তোলা হয়েছিল এ দাবি। ইনকিলাব মঞ্চ রাস্তায় নামার পর এখন সরকার জানিয়েছে জাতিসংঘে চিঠি দেবে। ইনকিলাব মঞ্চের দাবি অনুযায়ী হাদি হত্যার ঘটনা তদন্তে ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট শাখায় চিঠি পাঠাবে বলে জানিয়েছে সরকার। সেই চিঠিতে কী লেখা হবে, তা দেখতে চাওয়ার দাবি তুলেছে সংগঠনটি। চট্টগ্রাম বন্দরেও চলছে অচলাবস্থা। পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধের জেরে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি বেসরকারি খাত। কর্মসংস্থানের মাধ্যমও বেসরকারি খাত। কর্মসংস্থানের ৯৩-৯৪ শতাংশের ব্যবস্থা হয় বেসরকারি খাত থেকে। এই সরকারের আমলে দেশের বেসরকারি খাতের অবস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর শত শত বেসরকারি শিল্প-কারখানা হামলা-আগুনের শিকার হয়েছে। মবের ঘটনায় বহু শিল্প-কারখানা বন্ধ। কোনো মতে টিকে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন আবার নতুন করে বন্দরের অচলাবস্থার শিকার। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষার চলমান আন্দোলনকে সমর্থনকারী অনেকেই আছেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে চুক্তি বা একে ইস্যু করে বন্দরে অচলাবস্থা সমর্থনযোগ্য নয়। এ সময় এসে বন্দরসহ নানা চুক্তি ও রাষ্ট্রীয় কেনাকাটায় সরকারের অতি আগ্রহ মানুষের সন্দেহ বাড়াচ্ছে। নির্বাচনের পথে তা কিছুটা সমস্যাও পাকাচ্ছে। কিছু চুক্তিতে নিয়মনীতির খেলাপও হয়েছে। ভোটের পূর্ববর্তী সময়ে এসে কেন তাড়াহুড়ায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনের সঙ্গে এত হাই প্রোফাইলের চুক্তিনামা? প্রশ্নটি সাধারণ মানুষকেও ভাবাচ্ছে। নির্বাচনের তোড়জোড়ের মধ্যে ভোটের গা ঘেঁষা সময়ে সরকারের তড়িঘড়ি রাষ্ট্রীয় কিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে চুক্তি ও কেনাকাটা যেনতেন বিষয় নয়। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নেওয়া বিতর্কিত চুক্তি ও প্রকল্পগুলো বহাল তো আছেই, পাশাপাশি নতুন করে আরো দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি করা হচ্ছে।
চুক্তিগুলোর কোনো কোনোটির মেয়াদ ৩০, ৪০ এমনকি ৫০ বছরের বেশি। যেগুলোর আর্থিক প্রভাব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক উদাহরণ চট্টগ্রাম বন্দরসংক্রান্ত চুক্তিগুলো। লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল নিয়ে ব্যাপক আপত্তি ও প্রতিবাদের পরও সরকার থেমে নেই। এখন ব্যস্ততা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে। নির্বাচনী ব্যাপক ব্যস্ততাসহ নানা কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে ভাবনার গরজ কম। অবস্থানও অস্পষ্ট। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা গত টানা দেড় বছর ‘অপেক্ষা করো’ নীতিতে নির্বাচন ও নতুন সরকারের জন্য অধীর প্রতীক্ষায়। একেকটি দিন তাঁদের কাছে একেকটি বছরের মতো। এমন একটা সময় নানা বাগড়া ও বায়না পাকানোর সূক্ষ্ম চালে ভারাক্রান্ত হয়ে কেউ কেউ এখনো নির্বাচন দেখছেন না। আবার বলছেন, ভোট হলেও সরকার বেশি দিন টিকবে না। পরক্ষণেই কে প্রধানমন্ত্রী হবেন? কে সরকারে, কে বিরোধী দলে যাবে—সেই বিশ্লেষণ করছেন। নির্বাচন না হলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কিভাবে? পজিশন-অপজিশনই বা ঠিক হবে কিভাবে?
এমনিতেই টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রপ্তানি, পণ্য সরবরাহ, মুদ্রা ও পুঁজিবাজার, জনজীবন এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বহুমুখী সমস্যায়। নাজুক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত মুখোমুখি আরো নানা চ্যালেঞ্জে। ভবিষ্যৎ সরকারও এ পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পাবে না। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের কথা ছিল, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের একটি রূপরেখা রেখে যাওয়ার। সাধারণত জুনের প্রথম সপ্তাহে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন হয়। এ দায়িত্ব বর্তাবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের ওপর। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেট তৈরিতে সময় পাবে সাড়ে তিন মাসের মতো। এ সময় একটি সরকার কতটা গোছাতে পারবে, তা কঠিন ভাবনার বিষয়। নতুন সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও পোহাতে হবে বাড়তি তাপ। শিল্প খাতে উৎপাদনের প্রধান উপকরণ গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে তারা বিধ্বস্ত। মূল্যস্ফীতির কারণে স্থানীয় চাহিদা সংকুচিত। মাস কয়েক আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কর্মচারীদের আন্দোলনেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এনবিআরের সংস্কারকে কেন্দ্র করে কমপ্লিট শাটডাউনে দৈনিক আড়াই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হয়েছে তাঁদের। সেই সঙ্গে বহুমুখী চাপ সয়ে কোনো মতে টিকে থাকা ব্যবসায়ীদের নিশ্বাস ফেলতে এখন প্রধান চাওয়া একটি স্থিতিশীল পরিবেশ।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি