জাতিসংঘ এসক্যাপ (ESCAP) সমীক্ষা ফেব্রুয়ারি ২০১১ অনুসারে, বাংলাদেশে প্রায় ১.৮ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আমাদের আশপাশে বাস করে। জনসংখ্যা ও আবাসন শুমারি ২০২২ অনুসারে, বাংলাদেশের স্বাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%। আনুমানিক ৪৭.২২ লাখ মানুষ (যা মোট জনসংখ্যার ৯.১%) শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আমাদের দেশের ৩-১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৭% বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে। এদের মধ্যে ৩% শিশু ঢাকা শহরের এবং বাকিরা দেশের বিভিন্ন শহরের।
বাংলাদেশে যেখানে ঐতিহাসিকভাবে সীমিত সচেতনতা এবং সামাজিক কলঙ্ক প্রতিবন্ধকতা ও বিশেষ চাহিদাকে ঘিরে ছিল, সেখানে সহায়তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণে এবং সমাজের ধারণা পরিবর্তনে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান প্রয়াস একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এখানে প্রয়াসের বিশেষত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্ট প্রতিবন্ধিতা সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩-এর প্রেক্ষাপট এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ অনুসারে প্রয়াসের প্রতিষ্ঠাতা দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি প্রধান লক্ষ্যকে ধারণ করে-
১. বিশেষায়িত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা প্রদান।
২. থেরাপি, চিকিৎসা সহায়তা এবং পুনর্বাসন প্রদান।
৩. সামাজিক সংহতি প্রচার এবং কলঙ্ক হ্রাস করা।
প্রয়াস ১৫ জুন ২০০৫ সালে ঢাকা সেনানিবাসে ‘সেনা সহায়ক স্কুল’ নামে সেনা পরিবারকল্যাণ সংস্থার তত্ত্বাবধানে মাত্র ১৭ জন ছাত্র-ছাত্রী এবং ৩ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তবে প্রয়াসের গল্প কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের নয়; এটি বিশেষ মনোযোগের প্রয়োজন এমন শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং অঙ্গীকারের গল্প। প্রয়াসের বিভিন্ন কর্মসূচি ও সাফল্যের ভিত্তিতে এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে অটিজম স্কুল, বিশেষায়িত ক্লিনিকসমূহ কাউন্সেলিং, বাক ভাষা থেরাপি, কর্মথেরাপি, ফিজিওথেরাপি, অডিওলজি, হাইড্রোথেরাপি এবং হাইপারব্যাপিক অক্সিজেন সেবা শিশুদের জন্য জন্ম থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত সহায়ক পথ তৈরি করে। পাশাপাশি পাইজার (PISER - Proyash Institute of Special Education and Research) নামক প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতার উল্লেখ করা হয়েছে যা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এর অধীনে শিক্ষক ও থেরাপিস্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন, ক্যান্টনমেন্টজুড়ে বিস্তৃত উপস্থিতি এবং সমন্বিত সেবা প্রদান পদ্ধতির কারণে প্রয়াস অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও সহায়তার একটি অনুকরণযোগ্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, প্রয়াসই দেশে সর্বপ্রথম প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতির আলোচনা করে যার উদ্দেশ্যে ছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা যেন দিন দিন উন্নতি এবং দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তারই ধারাবাহিকতায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়স উপযোগী শিশুদের প্রয়োজন, ধরন এবং দক্ষতা বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন প্রোগ্রাম চালু করা হয়। মেইনস্ট্রিম শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়াসের কারিকুলাম শিক্ষা এবং অন্যান্য শিক্ষা কার্যক্রম দেশের শিক্ষাঙ্গনে অভূতপূর্ব এক পরিবর্তনের উদাহরণ হয়ে চলেছে।
প্রয়াসের কার্যক্রম শুধুমাত্র ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশের সকল অঞ্চলের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যাত্রা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, যশোর, বগুড়া, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা, সাভার, ঘাটাইল ও গাজীপুরে প্রয়াস স্থাপনের মাধ্যমে এই সাহসী কাজ সম্পন্ন করছে এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রয়াস স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়াও শুরু থেকেই প্রয়াস বিভিন্ন ধরনের গতিশীল এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। যেমন- অটিজম, সেলিব্রাল পালসি, বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা, হিয়ারিং অ্যান্ড ভিজ্যুয়াল ইমপেয়ার্ড এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম।
সাম্প্রতিক জাতীয় পরিসংখ্যান, বিশেষায়িত হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপকতা ও সম্ভাবনা উভয়ই তুলে ধরে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল সার্ভে অন পারসনস উইথ ডিসঅ্যাবিলিটি (NSPD) ২০২১ অনুযায়ী, আনুমানিক ৪৬.২ লাখ ব্যক্তি অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.৮% হলো প্রতিবন্ধী। শিশুদের মধ্যে মাত্র ৪০.৪১% প্রতিবন্ধী শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ভর্তি রয়েছে; এর মধ্যে ৬৫.২৫% প্রাথমিক ও ৩৪.৭৫% মাধ্যমিক শিক্ষায় অধ্যয়নরত রয়েছে, যা অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতার ইঙ্গিত বহন করে। এমআইসিএস (MICS) ভিত্তিক গবেষণার পরিপূরক তথ্য অনুযায়ী, ২-৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৩% এবং ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৮% কার্যকরী অসুবিধায় ভোগে যা মূলধারার বিদ্যালয়গুলোকে বৈচিত্র্যময় বিকাশ ও শিক্ষাগত চাহিদা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত প্রয়াস এই চাহিদা মোকাবিলার নিমিত্তে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রয়াস হাজার হাজার প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতামাতার একমাত্র আস্থার জায়গা।
বাংলাদেশের আইনগত কাঠামো একটি উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে, যা কল্যাণনির্ভর পদ্ধতি থেকে অধিকারভিত্তিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়েছে। ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন (RPPDA) পূর্ববর্তী ২০০১ সালের আইনকে রহিত করে এবং অধিকারের স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নির্ধারণ করে। একইসময়ে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ প্রবর্তিত হয় যার মাধ্যমে সেবা প্রদানের অর্থায়নে এবং সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় ট্রাস্ট গঠন করা হয় যার মধ্যে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত। এসব আইন কাঠামো এবং পরবর্তী বিধিবিধান ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়াসের মতো প্রতিষ্ঠানসমূহের মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বলাবাহুল্য যে, অনেক প্রতিষ্ঠান এই প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তবে প্রয়াসের উদ্দেশ্য এবং কার্যধারা তাদের পথকে অনেক সহজ করেছে।
প্রয়াস ২০০৬ সালের জুলাই মাসে কার্যক্রম শুরু করে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। এর সদর দফতর ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত। এ ছাড়াও যশোর, বগুড়া, চট্টগ্রাম, রংপুর, সাভার, কুমিল্লা, সিলেট এবং ঘাটাইলে অনুরূপ কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রয়াস বিওএফ (BOF) এর মতো সংস্থাভুক্ত ইউনিটগুলোকে সহায়তা প্রদান করে। প্রয়াস মডেলটি সুস্পষ্টভাবে বহুকেন্দ্রিক এবং জাতীয় পরিসরে বিস্তৃত যা সামরিক ও সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। সকল সেবা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক পরিবারগুলোর জন্যও উন্মুক্ত। প্রয়াসের সাংগঠনিক কাঠামোয় শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল ও থেরাপি সেবাসমূহ সমন্বিত রয়েছে এবং পরিবহন নিরাপত্তা ও প্রবেশগম্য অবকাঠামোর মতো মানসম্মত সুবিধা সব স্থানে বজায় রাখা হয় যা সেনাবাহিনীর পরিচালন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সেবার আদর্শমান নিশ্চিত করে। অনেক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী নিজস্ব উদ্যোগে এবং নিজস্ব স্থাপনা দিয়ে প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারযুক্ত শিক্ষার্থীসহ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্কুল অব অটিজম’ বিশেষায়িত শিক্ষা প্রদান করে। ‘আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট’ (ECDP) অল্প বয়সী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করে। ‘অ্যাডাল্ট লেইজার অ্যান্ড লার্নিং প্রোগ্রাম’ (ALLP) প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের বিনোদনমূলক কার্যক্রম ও নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ প্রদান করে। ‘ভোকেশনাল স্কুল’ মূলধারার কর্মসংস্থান বা সম্মানজনক কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে উপযোগী বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রদান করে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর একক শিক্ষা পরিকল্পনা (Individualized Education Plans - IEP) এবং জাতীয় পাঠ্যক্রমের উপযোগী অভিযোজনের মাধ্যমে তাদের অ্যাকাডেমিক ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
‘স্কুল অব প্রাইমারি এডুকেশন’ এবং ‘প্রত্যয় ইনক্লুসিভ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল’ এখন শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করে। যেখানে প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে শেখার সুযোগ পায় এবং প্রয়াসের থেরাপি টিমের সহায়তা গ্রহণ করতে পারে। প্রত্যয় নিজস্ব ভর্তি ও অ্যাকাডেমিক নিয়মাবলি বজায় রাখে। তবে প্রয়াসের সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনেই এটি পরিচালিত হয়।
শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকে থেরাপি সেবার মাধ্যমে সুদৃঢ় করা হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যালয় ব্যবস্থায় ব্যাপক থেরাপি সেবায় অভাব লক্ষ করা যায়। স্পিচ ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, কর্ম ও সংবেদনশীলতা থেরাপি, ফিজিওথেরাপি, বাইন্সেলিং, অডিওলজি, গ্রেন্থেটিকস ও অর্থোটিকস, হাইড্রোথেরাপি, মিউজিক থেরাপি, যোগব্যায়াম এবং এমনকি হাইপারব্যারিক অক্সিজেন চেম্বারের মতো সেবা খুবই সীমিত থাকে। এসব সেবার ঘাটতি পারিবারিক চাপ বাড়ায় এবং প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
প্রবেশগম্যতার বাধা হ্রাস বিদ্যালয়ভিত্তিক থেরাপির পাশাপাশি প্রয়াস একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হস্তক্ষেপ ক্লিনিক পরিচালনা করে যেখানে চিকিৎসা মূল্যায়ন, স্নায়বিক মূল্যায়ন, মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন এবং খাদ্যাভ্যাস ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া আউটডোর সেবায় ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, সাঁতার, শিল্পকলা, সংগীত এবং নৃত্য অন্তর্ভুক্ত। অনলাইন শিডিউলিং প্রবর্তনের ফলে আউটডোর সেবা গ্রহণের বুকিং প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে যা পরিচর্যাবান্ধব ও ডিজিটাল যুগোপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত।
পাইজার (PISER) অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশেষায়িত শিক্ষক ও থেরাপিস্ট সংকট। এই সমস্যা সমাধানে প্রয়াস পাইজার (PISER Proyash Institute of Special Education and Research) প্রতিষ্ঠা করে যার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ০২ জুন ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এর তত্ত্বাবধানে। বর্তমানে পাইজারে শিক্ষা ও থেরাপি বিষয়ে মোট ০৯টি ডিগ্রি কর্মসূচি চালু হয়েছে। এই বিস্তৃত পাঠ্যক্রমের লক্ষ্য হলো প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় জনবল জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ করা। পাশাপাশি পাইজার বিশ্বমানের সর্বোত্তম অভ্যাসকে স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোজনের জন্য গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রত্যয় ও মূলধারার প্রত্যাবর্তন প্রয়াসের প্রত্যয় ইনক্লুসিভ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। এখানে আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা এবং সাধারণ ও বিশেষ শিক্ষকের সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়। জনসমক্ষে প্রচারিত তথ্যে দেখা যায় যে, এমন অন্তর্ভূতিমূলক পরিবেশে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ও সামাজিক মানসিক বিকাশ উন্নত হয়। অন্যদিকে প্রয়াসের সাফল্যচিত্রে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ফলাফল তুলে ধরা হয় যা ‘Special Child, Special Right’ দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রতিফলিত করে। যেহেতু প্রয়াস একইসঙ্গে একটি বিদ্যালয় নেটওয়ার্ক ও ক্লিনিক্যাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, এর প্রভাব বিস্তৃত কার্যকরী উন্নয়ন, মূলধারার অন্তর্ভুক্তি এবং বিদ্যালয় উত্তর ফলাফল পর্যন্ত। উন্মুক্ত তথ্যসূত্রে প্রকাশিত সামগ্রিক চিত্র প্রতিষ্ঠানটির পরিসর ও অগ্রগতির দিকনির্দেশনা উপলব্ধিতে সহায়ক।
সেনাবাহিনী বিভিন্ন সেনানিবাসে সম্প্রসারণ শুরু করে, যেখানে শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই বেসামরিক পরিবারের সন্তান। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রতিবেদনে শাখার সংখ্যা বেড়ে ১১টি এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৩০০-এর বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে। শাখার সংখ্যা ওঠানামা করলেও সামগ্রিক প্রবণতা সম্প্রসারণধর্মী এবং জাতীয় পরিসরে বিস্তৃতির দিকে কেন্দ্রিত।
প্রয়াস বহুমুখী থেরাপি পরিচালনা করে যার মধ্যে রয়েছে হাইড্রোথেরাপি, হাইপারব্যারিক অক্সিজেন থেরাপি, প্রোস্থেটিকস/অর্থোটিকস এবং অডিওলজি। এসব সেবার সমন্বয় পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত সেবাপ্রাপ্তির সমস্যাকে হ্রাস করে।
প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাবিদ্যা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্পকলা এবং মূলধারার কর্মসংস্থানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের নথিবদ্ধ বিবরণ সংরক্ষণ করে। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল শিক্ষার বাইরে শিশুদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে প্রয়াসের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। বিশ্বব্যাপী গবেষণাও প্রমাণ করে যে, সমন্বিত শিক্ষা ও থেরাপি উদ্যোগসমূহ বিশেষত প্রারম্ভিক ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অ্যাকাডেমিক ও কার্যকরী ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নীত করে।
প্রয়াস দেখিয়েছে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহানুভূতি এবং পেশাদারত্ব বিশেষ শিক্ষা কেমন হতে পারে। এর সামগ্রিক মডেল শিক্ষা থেরাপি, পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং কমিউনিটি অংশগ্রহণকে একত্রিত করে ভবিষ্যতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রয়াস একটি সুসংহত, অধিকারভিত্তিক ও পেশাদারত্বসম্পন্ন সেবা কাঠামোর উৎকৃষ্ট উদাহরণ যা শক্তিশালী প্রশাসনিক সহায়তায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবন ও শিক্ষা ফলাফল পরিবর্তন করছে। বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, ক্লিনিক্যাল দক্ষতা, প্রত্যয় এর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং পিসারের মাধ্যমে সক্ষমতা উন্নয়ন বাংলাদেশের প্রতিবন্ধিতা কাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনের জন্য প্রয়াস ও সংশ্লিষ্ট জাতীয় ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ফলপ্রকাশ গ্রামীণ সম্প্রসারণ এবং মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে একীভবনে নিবিড় গুরুত্বারোপ করতে হবে। যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ‘Special Child, Special Right’ কেবল একটি স্লোগান নয় বরং একটি বাস্তব জাতীয় অর্জনে রূপ পেতে পারে।
প্রয়াস বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান। যেখানে শুধু সেনাবাহিনীতে কর্মরত সেনাসদস্যদের সন্তানরাই নয়, দেশের অন্যান্য অসামরিক পরিমণ্ডল থেকে আগত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান যা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এমন অনেক মহতী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের এবং দেশের জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি