ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে! মধ্যপ্রাচ্যের কসাই নেতানিয়াহুর পাশাপাশি কি উচ্চারিত হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম? যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসই বা কীভাবে মূল্যায়ন করবে এই পাগলাটে রাষ্ট্রনায়ককে? যুদ্ধবাজ উন্মাদ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নাকি শান্তির দূত হিসেবে আমেরিকার জনগণ তাঁকে মনে রাখবে চিরকাল? নাকি বিশ্ব তাঁকে চিনে নেবে এক আত্মপ্রবঞ্চক নৃপতি হিসেবে? ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইলেকশন ক্যাম্পেইনের স্লোগান ছিল আমেরিকা ফার্স্ট। অর্থাৎ সবার আগে আমেরিকার স্বার্থ। এই স্লোগানের অনেকে সারার্থ করেছিলেন যে বিদেশে আমেরিকার সামরিক খাতে অর্থ ও জনবল ক্ষয়ের নীতি থেকে তিনি সরে আসবেন। অন্য দেশের সমস্যা নিয়ে নাক গলিয়ে স্বদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না। আমেরিকায় অভিবাসনের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবেন। ষোলো সালে তাঁর আরেকটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন। আমেরিকাকে আবারও মহান জাতিতে পরিণত কর। প্রথম মেয়াদের দুটি স্লোগানই আমেরিকান জনগণ গ্রহণ করেছিল। সে যাত্রায় হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ট্রাম্প জয়যুক্ত হয়েছিলেন। প্রথম মেয়াদে কথাবার্তায় পাগলামি থাকলেও তখন বড় ধরনের কোনো যুদ্ধে আমেরিকা জড়ায়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শান্তি প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন।
আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তিনিই কমিয়ে আনতে শুরু করেন। ট্রাম্পই তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত করেন। পাশাপাশি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি কৌশলগত মিত্র সৃষ্টি করা হয়, যারা একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। আরব আমিরাত ও বাহরাইন এমনই দুটি দেশ। আব্রাহাম চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের শিকড় মজবুত করা। ট্রাম্প প্রথম মেয়াদেই সেটা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রথম মেয়াদে তিনি তাঁর যুদ্ধংদেহি রূপ দেখাননি। বরং শান্তি-সমঝোতার একটা বাতাবরণ তৈরি করতে পেরেছিলেন। এমনকি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নের একটা হাস্যরসাত্মক পরিবেশও তিনি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এত সব করেও তিনি আমেরিকান ভোটারদের মন পাননি, যদিও তিনি ভাবছিলেন যে চার বছরে তিনি আমেরিকাকে অনেক মহত্ত্ব দান করেছেন। হয়তো সেজন্যই ২০২০ সালের ইলেকশনে তাঁর স্লোগান ছিল আমেরিকার মহত্ত্ব ধরে রাখ-কিপ আমেরিকা গ্রেট। কিন্তু স্লোগানে চিড়ে ভেজেনি। সেবার জো বাইডেনের কাছে তিনি হেরে যান। মি. বাইডেন বিশ্বের দেশে দেশে গণতন্ত্র রপ্তানির মিশন নিলেন। এমনকি বাংলাদেশেও। পূর্বসূরি ট্রাম্পের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন। কাবুলে পুনরুত্থান ঘটে তালেবান বাহিনীর। ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে আশরাফ ঘানির।
কাবুলে তালেবানের উত্থানে যেমন, তেমনই ক্রীড়নক ঘানি সরকারের বিপর্যয়ের পেছনে নেপথ্যে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে যখন আবারও বীরদর্পে তালেবান ফিরে এলো তখন প্রশ্ন উঠল, বিশ্ববলয়ে তালেবানের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো মিত্র কে বা কোন রাষ্ট্রশক্তি? রাশিয়া, চীন, ইরান, সৌদি আরব নাকি পাকিস্তান? না! ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু বলছে অন্য কথা। আফগানিস্তানের জনপ্রিয় নেতা নূর মোহাম্মদ তারাকিকে হত্যা করে ১৯৭৯ সালে কাবুলের ক্ষমতা দখল করেন তাঁরই কমরেড বিশ্বাসঘাতক হাফিজুল্লাহ আমিন। এই আমিনের পৃষ্ঠপোষক মস্কো। আমিন প্রশাসনকে সহযোগিতার নামে অনতিবিলম্বে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে সোভিয়েত বাহিনী।
আমিনের পরে কাবুলের ক্ষমতায় আসেন মস্কোর আরেক ক্রীড়নক বারবাক কারমাল। বস্তুত আফগানিস্তানে কায়েম হয়ে যায় সোভিয়েত দখলদারি।
এই জায়গাটাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে তালেবানের সবচেয়ে বড় মিত্রটিকে। সোভিয়েত আগ্রাসন রুখতে তখন আমেরিকার অর্থ ও অস্ত্র সহযোগিতায় গড়ে ওঠে আফগান মুজাহিদ বাহিনী। বাংলাদেশেও তখন আমেরিকান দূতাবাসের সহযোগিতায় প্রকাশিত হয়েছে সোভিয়েত আগ্রাসনবিরোধী অনেক সংকলন, আয়োজিত হয়েছে বহু সেমিনার। আমেরিকার সংস্কৃতিকেন্দ্রে বিনে পয়সায় প্রদর্শিত হয়েছে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর নিষ্ঠুরতার বহু ডকুমেন্টারি। মহামূল্যবান বক্তৃতা শুনেছি তখন বুদ্ধিজীবীদের। ইউসিসে ঘটা করে সেমিনার আয়োজন করা হতো তখন। মুজাহিদদের সোভিয়েতবিরোধী সেই লড়াইকে এক মহান যুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। চালানো হয়েছে প্রোপাগান্ডা।
তালেবান নামে নব্বই দশকের মধ্যভাগে কাবুলের মসনদ দখল করে নেয় মার্কিন-সমর্থিত সেই মুজাহিদ বাহিনী। ১৯৯৬ সালে মোল্লা ওমর হলেন সরকারপ্রধান।
সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনে আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ওয়াশিংটনের ক্রোধ গনগনে চুল্লিতে পরিণত হলো। তালেবানশাসিত আফগানিস্তানকে চিহ্নিত করা হলো সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে। ন্যাটো জোটের সর্বব্যাপী বিমান হামলায় পতন হলো মোল্লা ওমরের তালেবান সরকারের।
এদিকে কুড়ি বছরের মধ্যে ভোলগা, টেমস, আমাজন, কাবুল ও আমু দরিয়ায় পানি গড়িয়েছে অনেক। আমূল বদলে গেছে বিশ্বপরিস্থিতি। মাথা ঠান্ডা জো বাইডেন এসে চুলোর আগুন কমিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর তালেবান ও আমেরিকার পুরোনো মিত্রতা পুনর্জীবন লাভ করে। এই জায়গাটায় অনুঘটকের কাজ করে বাইডেনের পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট’ নীতি। উল্লেখ্য ২০১৬ সালে আমেরিকার গ্রেটনেসের তাৎপর্য ছিল একরকম আর এখনকার ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রেটনেসের তাৎপর্য আরেক রকম। সেই সময়ে গ্রেটনেস বলতে দৃশ্যত একমেরু বিশ্বে আমেরিকাকে এক মহান, উদার জাতি হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জিতে ট্রাম্প শুরুতে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সেই ঔদার্য প্রদর্শনের অভিনয় শুরু করেছিলেন। ইতিহাসে তিনি নিজের নাম লেখাতে চেয়েছিলেন এক মহান জাতির শান্তিবাদী মহান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পাঁচ মাসের মাথায় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার চার দিনের সংঘাত থামাতে সক্রিয় অবদান রাখেন। ইউক্রেন বিরোধ নিরসনেও তিনি ইতবাচক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এর আগেরবারের তেহরান-তেল আবিব যুদ্ধের শুরুতে তিনি ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধংদেহি মনোভাব গ্রহণ করলেও পরে ভোল পাল্টে ফেলেন। প্রথম দিকে ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলাও চালিয়েছিলেন। শেষের দিকে এসে ইসরায়েলের পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত তখন তিনি হয়ে যান শান্তির দূত। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য বিশ্বশান্তির পথে এ-ও তাঁর এক বড় কাজ হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ফিলিস্তিনে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতিতেও তিনি ভূমিকা রাখেন, যদিও তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষপাতী নন। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। যদিও গাজা উপত্যকাকে পর্যটন ও অবকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে আমেরিকার আধিপত্য কায়েমের মনোবাসনা তার ছিল। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করার প্রস্তাবও করা হয়েছিল। এমতাবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ধরেই নিয়েছিলেন যে, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন। সাধারণ একটা ধারণাও তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, ২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পের গলায় ঝুলবে, কেবল ঘোষণার অপেক্ষা। যে শর্তগুলো পূরণ করলে কেউ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন, তাতেও তিনি এগিয়েছিলেন। স্কোর ভালো ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। পেয়েছে ভেনেজুয়েলার অখ্যাত নেত্রী করিনা মাচাদো।
নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রেটনেস তথা মহত্ত্ব বা বড়ত্বের ভাবার্থ বদলে নিলেন। বিশ্বনেতা হওয়ার চাইতে দুনিয়ার বস হওয়ার এক উদগ্র বাসনায় যেন তাঁকে পেয়ে বসল। আমেরিকান ঔদার্যের চাদর যেন বা তিনি ছুড়ে ফেলে দিলেন জীর্ণ বস্ত্রের মতো। চলতি বছরের (২০২৬) শুরুতেই রাতের অন্ধকারে তিনি আক্রমণ চালালেন ভেনেজুয়েলায়। তুলে নিয়ে যাওয়া হলো প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে। সঙ্গে তাঁর স্ত্রীকেও। ভেনেজুয়েলায় সফল অভিযানের পর আমেরিকাই এখন দেশটি চালাবে। তেল সম্পদের সদ্ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়ন করা হবে। কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট পলিটিশিয়ান শান্তিতে নোবেলজয়ী মাচাদো ভেবেছিলেন তিনি ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। কিন্তু বাস্তবে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া যতটা সহজে সম্ভবপর হয়েছে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ততটা সহজ হচ্ছে না। কারাকাসে এখনো মাদুরোর সরকারই রয়েছে। নিকোলাস মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। তেলের ওপরও আমেরিকার পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেননা ভেনেজুয়েলার জনগণ রাজপথে সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন গড়ে তোলেনি। জনসাধারণ বরং মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলছে। মাচাদোরও কোনো জনসমর্থন নেই। তা সত্ত্বেও নতুন করে একটি ফেয়ার ইলেকশনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলা প্রশ্নে বিশ্ব জনমতও আমেরিকার বিপক্ষে।
তাহলেও প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চাইলেন। কারণ এই দ্বীপে মজুত রয়েছে বিপুল পরিমাণ দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদ। যেখানে সম্পদ সেখানে আমেরিকা চায় একচ্ছত্র আধিপত্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো মনে করেন যে এটা আমেরিকার অধিকার। প্রথমে সামরিক অভিযানের কথা ভাবলেও পরে ট্রাম্প আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের মালিক ডেনমার্ক পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড তাদের, তাদেরই থাকবে। এই দ্বীপ বিক্রয়যোগ্য নয়। গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে হোঁচট খেলেও দমে যাওয়ার পাত্র নন ট্রাম্প।
আবার চোখ ইরানের ওপর। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হামলা চালানো হলো ইরানের ওপর। অতর্কিত হামলায় খামেনিকে হত্যা করা হলো। বোমা মেরে হত্যা করা হলো স্কুলের নিষ্পাপ শিশুদের। বিতাড়িত রেজা শাহ পাহলভির পুত্র আবারও প্ররোচিত হলেন ইরানের হারানো মসনদ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখার। ট্রাম্প ইরানের জনগণের প্রতি আহ্বান জানালেন খামেনি সরকারের পতন ঘটিয়ে নতুন সরকার গঠনের। কিন্তু জনগণ সেই ভুলটি করল না। ইরানের জাতীয় ঐক্যে এই হামলা বড় ধরনের কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি। উল্টো ইরানের সাঁড়াশি আক্রমণে ইসরায়েল পর্যুদস্ত, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প হতাশ ও হতভম্ব। অতঃপর ট্রাম্প সম্পর্কে কী বলবে ইতিহাস!
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক