বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যরত ব্যাংকের সংখ্যা ৬০টিরও বেশি, যা প্রায় সমমানের অর্থনীতির অনেক দেশের তুলনায় বেশি। অতিরিক্ত সংখ্যক ব্যাংক থাকলে প্রতিযোগিতা বাড়লেও তদারকি জটিল হয়ে পড়ে, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনাও বাড়ে। ফলে ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করতে সংখ্যাগত পুনর্গঠন এখন আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০–এর দশকে, যখন সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বিকল্প হিসেবে শরিয়াহসম্মত আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৮৩ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তী তিন দশকে একে অনুসরণ করে আরও দশটি ব্যাংক গড়ে ওঠে; আলোচিত পাঁচটি ব্যাংক তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন, সুদবিহীন লেনদেন এবং মুনাফাভিত্তিক বিনিয়োগের নীতির কারণে গত এক দশকে এ খাতে আমানত ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক উইন্ডোর মোট ব্যাংকিং-এর সকল ইনডিকেটরের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, ইসলামী ব্যাংকিং এখন আর প্রান্তিক কোনো ধারা নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত সেই স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য—এটি ছিল আর্থিক পুনর্গঠন, আমানত সুরক্ষা এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি কমানোর একটি প্রশাসনিক সংস্কার। বিপরীতে, অনেক গ্রাহক, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরও কেন ব্যাংকের সামনে গ্রাহকের সারি, দাবিদাওয়া ও আন্দোলনের খবর শোনা যাচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন জনমনে।
উল্লেখ্য, আলোচিত পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে কয়েকটি ছিল চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক—অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক। তখনকার অর্থমন্ত্রী একাধিকবার প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে, দেশের অর্থনীতির আকার ও বাজারের সক্ষমতার তুলনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া রাজনৈতিক কারণেই, সুতরাং সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পরবর্তীকালে দেখা যায়, এসব নতুন ব্যাংকের কিছুতে ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, মূলধন শক্তি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল। ফলে আর্থিক দুর্বলতা দ্রুত প্রকট হয়ে ওঠে।
ব্যাংক মার্জার বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক নয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হয়; ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে আমানত সুরক্ষিত রাখা হয়। মালয়েশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং খাতেও পুনর্গঠন ও একীভূতকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও বড় ব্যাংক মার্জারের নজির রয়েছে, যেখানে দক্ষ তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়—মার্জার সফল হয় তখনই, যখন তিনটি শর্ত পূরণ হয়: স্বচ্ছ নিরীক্ষা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীর আস্থা নিশ্চিতকরণ। কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে একীভূত করলেই স্থিতিশীলতা আসে না; কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
এই একীভূতকরণ নীতিনির্ধারকদের যুক্তি ছিল—পৃথক পৃথকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখার চেয়ে একটি শক্তিশালী কাঠামোর অধীনে এনে পুনর্গঠন করা অধিক কার্যকর। আর্থিক খাতে পদ্ধতিগত ঝুঁকি কমানো, আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা এবং কেন্দ্রীয় তদারকি সহজ করাই ছিল লক্ষ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেয়, যাতে আমানতকারীরা আতঙ্কে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকেন।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—কেন কেবল এই পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক? দেশে আরও দুর্বল সুদভিত্তিক ব্যাংকও ছিল। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট একই সময় প্রকট হয়ে ওঠায় নীতিনির্ধারকেরা একত্রে পুনর্গঠনের পথ বেছে নেন। অন্যদিকে সুদভিত্তিক দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে পৃথক পুনঃমূলধনীকরণ বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়। ফলে এক ধরনের ‘টার্গেটেড মার্জার’ নীতি অনুসৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয় তবে এই ব্যাংকগুলোর মার্জারের সফলতার ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে আরও ব্যাংক মার্জারের কথা ইতোমধ্যে আলোচিত হচ্ছে।
এই ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ ও গোষ্ঠীভিত্তিক ঋণ বিতরণ। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত জামানত ও প্রকল্প যাচাইছাড়াই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অনুমোদন। তৃতীয়ত, দক্ষ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের অভাব। খেলাপি ঋণের হার বাড়তে বাড়তে কিছু ব্যাংকে দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছে যায়। মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (CAR) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে নেমে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। সময়মতো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, ঝুঁকি মূল্যায়নে শৈথিল্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সমস্যাটি ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে।
একীভূতকরণের ঘোষণার পর গ্রাহকদের মধ্যে প্রথম যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা হলো অনিশ্চয়তা। অনেকেই শাখায় ভিড় করে আমানত তুলে নিতে চান। নগদ সংকটের আশঙ্কা ও অনলাইন লেনদেনে সীমাবদ্ধতা গ্রাহক আস্থাকে আরও দুর্বল করে। আমানতকারীদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল—তাদের অর্থ নিরাপদ কি না। ইসলামী ব্যাংকে মুনাফাভিত্তিক আমানত হওয়ায় ক্ষতির অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গুজব ছড়ায়। যদিও সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানত সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, তবু আস্থার ঘাটতি দ্রুত কাটেনি। বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। চলমান প্রকল্পে অর্থায়ন বিলম্বিত হয়, নতুন বিনিয়োগ স্থগিত থাকে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কার্যক্রমে ধাক্কা খান। অন্যদিকে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও পূর্বতন মালিকগোষ্ঠীর প্রভাব কমে যায়; মালিকানার কাঠামো পুনর্বিন্যাস হওয়ায় তাদের আর্থিক ও প্রভাবগত ক্ষতি ঘটে।
নতুন রাজনৈতিক সরকার ও নতুন গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের পর তদারকি জোরদার ও নিরীক্ষা প্রক্রিয়া শুরু হলে ব্যাংকের ভেতরের অনিয়ম আরও প্রকাশ্যে আসে। এতে কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ে। কেউ কেউ মনে করেন, পূর্বতন মালিকগোষ্ঠীর স্বার্থহানির ফলে পরোক্ষভাবে আন্দোলন উসকে দেওয়া হয়েছে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জনসমক্ষে নেই, তবে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতার অভাব গুজবকে শক্তিশালী করে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক গ্রাহক আন্দোলনের পেছনে কেবল আর্থিক অনিশ্চয়তা নয়, নীতিগত বার্তা ও যোগাযোগের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একীভূতকরণ ও কার্যত সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই শুনা যায়—শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারমূল্য শূন্যে নেমে যেতে পারে, ডিপোজিটররা মুনাফা পাবেন না, এমনকি আমানতের একটি অংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়; সামান্য অস্পষ্ট বার্তাও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। ফলে অনেক আমানতকারী নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন এবং শাখাগুলোতে চাপ তৈরি হয়।
শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। একীভূতকরণের ফলে মালিকানার কাঠামো পুনর্বিন্যাস হয় এবং পূর্বের পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে পূর্বতন উদ্যোক্তা ও প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ কমে যায়—এটি স্বাভাবিকভাবেই তাদের অর্থনৈতিক ও প্রভাবগত অবস্থানকে দুর্বল করে। বাজারে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় পুরোনো শেয়ারগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন যথাযথভাবে হয়নি অথবা ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের অবমূল্যায়নের মুখে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের অস্থিরতা বাড়ায় এবং তা গ্রাহকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, একটি মত রয়েছে—পূর্বতন মালিকগোষ্ঠীর স্বার্থক্ষতির ফলে পরোক্ষভাবে আন্দোলনে উৎসাহ জোগানো হতে পারে। কারণ, সরকারিকরণের ফলে ব্যাংকের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ, ঋণনীতি এবং ব্যবস্থাপনায় তাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব আর থাকে না। যদিও এ অভিযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণ জনসমক্ষে নেই, তবে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি থাকলে এমন সন্দেহ সহজেই জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে যখন নতুন প্রশাসন পূর্বের ঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার অনিয়ম তদন্ত শুরু করে, তখন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান আন্দোলনের পেছনে কেবল তারল্য সংকট বা মুনাফা বিতরণ নয়; বরং নীতিগত বার্তার অস্পষ্টতা, মালিকানাগত পরিবর্তনের প্রভাব এবং স্বার্থসংঘাতের জটিল সমীকরণ কাজ করছে। আস্থা পুনর্গঠনের জন্য তাই শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়—স্বচ্ছ যোগাযোগ, শেয়ার ও আমানতের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন সম্পর্কে স্পষ্ট নিশ্চয়তা এবং পুনর্গঠনের ধাপগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। তা না হলে গুজব ও সন্দেহই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। নিচে উত্তরণের কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পথ তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট প্রকাশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের স্বতন্ত্র অডিট ফার্ম দিয়ে গত কয়েক বছরের ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ, সম্পর্কিত পক্ষকে দেওয়া ঋণ এবং মূলধন ঘাটতির প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে আনতে হবে। গুজব বা অনিশ্চয়তার সুযোগ নেই—আস্থা পুনর্গঠনের এটিই প্রথম ধাপ। দ্বিতীয়ত, আমানত সুরক্ষা বিষয়ে স্পষ্ট আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স সীমা এবং সরকারের গ্যারান্টি পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। প্রয়োজনে আমানত গ্যারান্টি তহবিল সাময়িকভাবে বাড়ানো যেতে পারে।
তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন জরুরি। বড় ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, নির্দিষ্ট সময়সীমায় রিকভারি এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা জনগণের আস্থা ফেরাতে সাহায্য করবে। চতুর্থত, পেশাদার ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তব রূপ দিবে। শরিয়াহ বোর্ডকেও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে হবে। পঞ্চমত, যোগাযোগ কৌশল উন্নত করা জরুরি। নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং, ওয়েবসাইটে আর্থিক হালনাগাদ, এসএমএস বা ইমেইলে গ্রাহককে অবহিত করা—এসব অনিশ্চয়তা কমাবে। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য শেয়ার মূল্যায়ন, পুনঃমূলধনীকরণ এবং ভবিষ্যৎ লভ্যাংশ নীতিও স্পষ্ট করতে হবে। ষষ্ঠত, ধাপে ধাপে পুনর্গঠনের রোডম্যাপ প্রকাশ করা প্রয়োজন—প্রথম ছয় মাসে তারল্য স্থিতিশীল, এক বছরে খেলাপি ঋণ কমানো, দুই বছরে মূলধন পর্যাপ্ততা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত। সপ্তমত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী ব্যাংক পুনর্গঠনের সময় দ্রুত ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ব্যয় সংকোচন ও শাখা যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছিল। সম্মিলিত ব্যাংকেও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানো ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো আস্থা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই পুনর্গঠন কেবল একটি ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সংখ্যাগত পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। অর্থনীতির আকার, আমানত বাজার এবং তদারকি সক্ষমতার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে একাধিক ব্যাংককে একীভূত করা প্রয়োজন হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এই পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরকারিকরণ ও তারল্য সহায়তা স্বল্পমেয়াদে স্থিতি আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা পুনর্গঠনই মূল চাবিকাঠি। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বৃহত্তর বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে—অর্থনীতির তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি এবং অনেক ব্যাংকের ভিত্তি দুর্বল। তাই বর্তমান সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনাই সফল ব্যাংক মার্জারের ভিত্তি। বাংলাদেশেও যদি সেই পথ অনুসৃত হয়, তবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কেবল সংকট কাটিয়ে উঠবে না; বরং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারে। আর সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক সংস্কারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
লেখকঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]