১৭ বছরে পদার্পণ। অর্থাৎ অপেক্ষা এখন আঠারোর। আর আঠারোতে পরিপূর্ণ হয় একটি বয়সসীমার। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিদিন অনেক আগেই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাই তো আজ মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে বিজয়রশ্মি। ১৭ কিংবা ১৮ যা-ই বলি না কেন, সংখ্যা বা বছর দিয়ে আটকানো যাবে না এ ভালোবাসাকে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ ভালোবাসা বেড়েছে। বলছি, বাংলাদেশ প্রতিদিনের কথা। সপ্তদশে প্রবেশ করল দেশের সর্বাধিক প্রচারিত এ দৈনিকটি। পত্রিকাটির জন্মলগ্ন থেকে তো বটেই প্রস্তুতিপর্ব থেকে জড়িয়ে আছি। তাই আবেগটা হয়তো একটু বেশি।
গত ষোলো বছর এ পত্রিকা নিজের শক্ত অবস্থান আঁকড়ে রেখেছে। এর আলোকচ্ছটা ছড়িয়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও। এর অনলাইন সংস্করণও পাঠকদের মন জয় করেছে ইতোমধ্যে। বিশ্বের ১৯২টি দেশ থেকে নিয়মিত পত্রিকা (ই-পেপার) এবং এর অনলাইন সংস্করণ পড়া হয়। বর্তমানে মাল্টিমিডিয়া দুনিয়াতেও সমানতালে এগিয়ে চলেছে। সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনের বিভিন্ন বিভাগে নিজেকে জড়িয়েছি। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েব ভার্সনেই আমার ফোকাস বেশি।
গত ১৬ বছরে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সময়টা দিয়েছি এ পত্রিকায়। ২৭ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলাম, এখন বয়স ৪৪ ছুঁইছুঁই। বলা চলে যৌবনের সেরা সময়টা দিয়েছি এখানে। ঠিক তেমনি এ পত্রিকাও দিয়েছে অনেক কিছু। সমাজে পেয়েছি সম্মান ও ভালোবাসা। আদর-স্নেহ পেয়েছি দেশবিদেশের অনেক বরেণ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও প্রখ্যাত সব সাংবাদিকের। রুটি রুজির কথা, সেটা না হয় না-ই বললাম। পেয়েছিও অনেক। কিন্তু সম্মানের কাছে এটা তো কিছুই না। অর্থকড়ি আজ আছে কাল নেই, কিন্তু সম্মান তা তো ইউনিভার্সাল।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের পরীক্ষামূলক ডামি থেকে এখনো জড়িয়ে আছি। ২০১০ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে হাতে গোনা কয়েক দিন ডামি প্রকাশিত হয়েছিল। অজস্র চ্যালেঞ্জ নিয়ে ১৫ মার্চ বাজারে আসে এ পত্রিকা। সেই সময় অফিস ছিল মগবাজারে। একটি পত্রিকা কীভাবে জন্ম নেয় তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন ঘিরে অনেক স্মৃতি। দু-চারটি কথা না লিখলেই নয়। এখনো চোখে ভাসে সেই প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। পত্রিকা প্রকাশের চার দিন আগে অনেকগুলো অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয় আমাকে। এর মধ্যে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের রহস্যময় পুকুর নিয়ে ফিচার করা। যা ‘রকমারি পেজ’-এ প্রকাশিত হবে। একটা কথা না বললেই নয়, প্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই এ রকমারি পেজ বাংলাদেশ প্রতিদিনের অন্যতম পাঠকপ্রিয় পাতা হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি এ পাতায় লেখালেখির জন্য আমি নিজেও হিংসা করতাম পাতার দায়িত্বে থাকা রণক ইকরামকে। যেদিন সে অফিস মিস করত সেদিন এই পাতার পেজ মেকাপ ও লেখার দায়িত্ব থাকত আমার। তাই খুশি হতাম এই ভেবে, আজ রণক নেই তাই আমার লেখা যাচ্ছে। পাতার পেজ মেকাপ করতেন লক্ষ্মণ, এখনো তিনি করেন। রণক না এলে তাকে নিয়ে বসে পড়তাম পেজ মেকাপে। আর কাজ শেষ হলেই চলে যেতাম অফিসের পাশে সিরাজ ভাইয়ের সেই চায়ের দোকানে।
যে কথা বলছিলাম, শহীদুল্লাহ হলের রহস্যময় পুকুরের অ্যাসাইনমেন্ট পেলাম। সঙ্গে গেল সহকর্মী আলী আফতাব। সে নিজেই পুকুরের ছবি তুলল। ১৫ মার্চ প্রথম সংখ্যায় ছাপা হলো ‘শহীদুল্লাহ হলের রহস্যময় পুুকুর’। এরপর হয়তো এ পত্রিকায় শত শত ফিচার যেমন ক্যারিয়ার, স্বাস্থ্য, আইটিবিষয়ক লেখা প্রকাশিত হয়েছে আমার। শোবিজ পাতায়ও নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রথম লেখার আবেগ এখনো অন্যরকম।
একটি কথা না বললেই নয়, কম শব্দে এবং গুণগত ভাষা ব্যবহার করে কীভাবে লেখা যায় তা শিখেছি প্রথম পাতার টপ প্যানেলে যে তিনটি শর্ট নিউজ থাকে তা লিখে। বড় কোনো খবরকে ওই ছয় লাইনে সীমিত করা লাগত। শব্দচয়নে হেল্প করতেন কামাল মাহমুদ ও সুমন পালিত ভাই। আমার একটি দুর্বলতা ছিল, তা হলো দ্রুত কম্পোজ করতে পারতাম না। প্রায়ই আমি বলতাম আর কি-বোর্ডে কম্পোজ করতেন তোফাজ্জল ভাই। এ কম্পোজ করাকে আমি বলতাম লাইভ কম্পোজ।
বাংলাদেশ প্রতিদিন আমার কাছে দ্বিতীয় পরিবার। এ পরিবারের জন্য কখনো কখনো আমার প্রথম পরিবার বাবা-মা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানকে খুব একটা সময় দেওয়া হয় না। এমনকি ডিউটি টাইম এবং ডে-অফের শিডিউলও ঠিক রাখা যায় না। অনলাইন বিভাগের দায়িত্ব থাকায় ঈদপার্বণেও কি-বোর্ড ধরতে হয়। মাঝেমধ্যে আক্ষেপ হয় এ নিয়ে। স্ত্রী-সন্তানদেরও অনেক অনুযোগ থাকে। তারা হয়তো কিছু বলে না, কিন্তু আমি তো অনুধাবন করতে পারি-তাদের এ বিয়োগতা। তবে একটাই সান্ত্বনা নিজের জন্য না, দেশ ও দশের কথা ভেবে হয়তো পুরোপুরি সময় দিতে পারছি না তাদের। ১৭ বছরের পথচলায় দেখলাম কত রাষ্ট্রীয় উত্থানপতন, দেখলাম কত রাজনৈতিক সংকট, দেখলাম কত বৈশ্বিক সংকট। আর এসব সংকট মোকাবিলা করেই চলতে হচ্ছে আমাদের। কারণ দায়িত্বটা যে অনেক বড়।
লেখক : অনলাইন ইনচার্জ, বাংলাদেশ প্রতিদিন