প্লুরাল পুলিশিং মডেল হলো প্রচলিত রাষ্ট্রীয় পুলিশিং ব্যবস্থা থেকে ভিন্নতর এক পুলিশিং ব্যবস্থা। যেখানে অনেক বৈচিত্র্যময়তা থাকে অর্থাৎ সকল অংশীজনকে সংগে নিয়ে পুলিশিং করা হয়ে থাকে। অন্যকথায় প্লুরাল পুলিশিং বলতে ঐ সমস্ত সরকারী বা বেসকারী প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, এজেন্সি, কমিউনিটি, ছাত্র, ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ যারা আইন শৃংখলা, নিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত এবং উপরুন্তু যারা পুলিশিং এর সংগে যুক্ত হতে চাই ও পুলিশকে সহায়তা করতে চাই; রাষ্ট্রীয় পুলিশ এক্ষেত্রে সকল অংশীজনের সংগে যোগাযোগ, মিথস্ত্রিয়া ও সমন্বয় সাধন করে থাকে। এরুপ সকল অংশীজনকে সংগে নিয়ে একত্রে পুলিশিং করাকে প্লুরাল পুলিশিং বলে।
প্লুরাল পুলিশিং এর পরিধি বৃদ্ধি ও এর কার্যাবলী-
বাংলাদেশে যেহেতু পুলিশ ও জনগণের অনুপাত অনেক কম এবং দেশের মানুষ কিছুটা আন্দোলনময়ী। সেজন্য রাষ্ট্রের অন্যান্য সরকারী, বেসরকারী সংস্থা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে পুলিশের কাজে অর্ন্তভুক্ত করা প্রয়োজন। নিম্নে প্লুরাল পুলিশিং এর ব্যাপ্তির বৃদ্ধি ও কার্যাবলী বর্ণিত হলো।
আন্ত:সংস্থা সহযোগিতা ও রাষ্ট্রীয় পুলিশিং এর পরিধি বৃদ্ধি-
১) ট্রান্স পোর্ট পুলিশ- যেমন রেলওয়ে পুলিশ, মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং নৌ পুলিশের এর বিশেষায়িত বিশেষ কর্মকর্তা। ২) পরিবেশগত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা: যারা কোন স্থানের বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ জনিত অপরাধ ও বিশৃংখলা মোকাবেলা করে থাকেন। ৩) সহযোগিতামূলক মাল্টি-এজেন্সি হাব: যেখানে পুলিশ, সামাজিক সেবা, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য একে অপরের সংগে শেয়ার করে থাকে। ৪) কমিউনিটি পুলিশিং: কমিউনিটি পুলিশিং এর সদস্য অর্থাৎ কমিউনিটি সদস্যদের সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অপরাধ নিবারণে সক্রিয় অংশগ্রহণ করাতে হবে। ৫) ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি : অপরাধ প্রবণ এলাকায় ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি গঠন করা যেতে পারে।
বাণিজ্যিক প্রাইভেট সিকিউরিটি-
১) করপোরেট অফিস, শপিং মল, মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান সমূহ, আবাসিক কমপ্লেক্স প্রভূতি স্থানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসাবে প্রাইভেট সিকিউরিটি নিয়োগ দেয়া হয়। ২) শিল্পের ভিতরের ও বাহিরের এলাকা সমূহের নিরাপত্তা রক্ষার্থে প্রাইভেট সিকিউরিটির সদস্যবৃন্দ মোবাইল টহল দিয়ে থাকেন। ৩) প্রাইভেট সিকিউরিটির সদস্যরা কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ চুরি, প্রতারণা এবং ইনটেলুকচুয়াল প্রোপার্টি চুরি তদন্ত করে থাকে। ৪) সিসিটিভি পরিচালনা, বায়োমেট্রিক এ্যাকসেস পরিচালনা এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় প্রাইভেট সিকিউরিটির সদস্যরা নিয়োজিত থাকেন। ৫) প্রাইভেট সিকিউরিটির সদস্যরা ক্রীড়ার ইভেন্ট, উৎসবের জনতা ব্যবস্থাপনা প্রভূতি কার্য সম্পাদন করে থাকেন।
ও কমিউনিটি বেইজড পুলিশিং-
১) কমিউনিটিতে সংগঠিত অপরাধ প্রতিরোধ এবং নজরদারীর কাজ। ২) নাগরিকেরা কখনও কখনও সংগঠিত আবার কখনও অসংগঠিত গ্রæপ বা দল হিসাবে কমিউনিটি ও তার চারি পাশে টহল দিয়ে থাকে। ৩) ব্যবসায়িদের অর্থায়নে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বা স্থানে সম্পূরক নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করা হয়ে থাকে। ৪) পুলিশের মধ্যস্থতায় নিকটআত্মীয় এবং বন্ধুবান্ধবদের উপস্থিতিতে অপরাধী ও ভিকটিমের মধ্যে বিরোধ, বিবাদ বা সমস্যা সমূহ নিস্পত্তি হয়ে থাকে। যেমন- ফ্যামিলি কনফারিন্সিং।
বিশেষায়িত পুলিশ ও হাইব্রিড পুলিশিং-
১) শপিংমল, বিশ্ববিদ্যালয়, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর এর মতো স্থানগুলোতে পুলিশ ও জনতা যৌথ উদ্যোগে কাজ করে থাকে। ২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিযুক্ত পুলিশ বা নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ৩) প্রাকৃতিক স্থানে নিয়মকানুন প্রয়োগ এবং নিরাপত্তা প্রদান কল্পে পার্ক রেঞ্জার্স এবং গ্রামাঞ্চলে ওয়ার্ডেন নিয়োগ করা।
অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা দ্বারা পুলিশিং-
১) ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট হিসাবে সীমান্ত টহল ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা।
২) কর ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জালিয়াতি, চোরাচালান এবং আর্থিক অপরাধ তদন্ত।
বাংলাদেশে প্লুরাল পুলিশিং এর গুরুত্ব-
বাংলাদেশ ঘন বসতিপূর্ণ এক দেশ এবং এখানে প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা রয়েছে। বর্তমানে দিন দিন মানুষ অনেকটা অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে এবং এখানে অনেক জটিল নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় পুলিশের একার পক্ষে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, আবেগপ্রবণ জনতা ব্যবস্থাপনা, আইন শৃংখলা রক্ষা ও জন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কষ্ঠকর।
প্লুরাল পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
ক) রাষ্ট্রীয় পুলিশের সংখ্যার ঘাটতি ও তা পূরণ করা
১) বাংলাদেশে সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিন্ম পুলিশ নাগরিক অনুপাত রয়েছে। অর্থাৎ পুলিশ নাগরিক অনুপাত প্রায় ১:১১০০। এরুপ নিন্ম পুলিশ জনগণ অনুপাত নিয়ে রাষ্ট্রীয় পুলিশের পক্ষে একা কার্যকরভাবে সর্বত্র আইন শৃংখলা রক্ষা করা কিছুটা কষ্ঠকর।
২) গ্রাম পুলিশ: গ্রাম পুলিশ বিশেষ করে চৌকিদার ও দফাদারদেরকে সক্রিয় করা যায়। তাদের কাছ থেকে অনেক মূল্যবান ও সঠিক তথ্য পাওয়া যায়।
৩) ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি গঠন করে ১৮ থেকে ৫০ পর্যন্ত ব্যক্তিদের হাতে বাঁশি ও লাঠি দিয়ে অপরাধ প্রবণ এলাকা বা হটস স্পট পাহারা দেওয়া যায় (আলী, ২০১৭)।
খ) অন্যান্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ
১) আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।
২) সাংবদিকেরা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করতে পারে। তাদেরকেও কাজে খাটানো যেতে পারে।
৩) উন্নয়নকর্মী বা ঘএঙ কর্মীদের অনেক প্রোগ্রাম তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই তারা তৃণমূল থেকে অনেক তথ্য পেতে পারে ও পুলিশকে দিতে পারে। যা আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা আনয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে।
গ) নগরায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরাপত্তা প্রদান
১) বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য বড় বড় নগরীতে দ্রুত নগরায়ণ হয়েছে। ফলশ্রæতিতে কর্পোরেট অফিস, শপিংমল, আবাসিক কমপ্লেক্স, গার্মের্টস ফ্যাক্টরী ও কারখানাগুলিতে প্রাইভেট সিকিউরিটির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে (রহমান, ২০১৮)। তাদের সংগে যোগাযোগ রক্ষা করে ও সমন্বয় করে তাদের নিয়োজিত এলাকার আইন-শৃংখলার টেকসই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
২) প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানীগুলি আবাসিক কমপ্লেক্স, রেডিমেট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী, শপিংমল, কর্পোরেট অফিস ও কারখানাগুলিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিকিউরিটি সদস্য নিয়োগ করে। যারা গেটে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, ২৪ ঘন্টা টহল এবং সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের সম্পদের প্ররক্ষা দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহায়তা করে থাকে (রহমান, ২০১৮)। সুতরাং রাষ্ট্রীয় পুলিশ প্রাইভেট সিকিউরিটি সদস্যদেরকে সঠিকভাবে কাজে খাঁটাতে পারে।
ঘ) কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তাদের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা
১) গ্রাম-গঞ্জে বয়স্করা সালিশ করেন এবং প্রায়ই ছোটখাট বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ, গোষ্ঠীদ্বন্দ এবং ছোট ছোট জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয়গুলি সমাধান করেন। যেগুলি পুলিশ ও কোর্টের অতিরিক্ত বোঝা কমাইয়া দেয়। পুলিশ এ জাতীয় বিকল্প সমস্যা সমাধানের প্রয়াসকে উৎসাহিত করতে পারে।
২) স্কুলগুলিতে পুলিশ কিশোর ক্লাব গঠন করে পুলিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধ নিবারণে সহযোগিতা করতে পারে (সিদ্দিক, ২০১৭)।
ঙ) বিশেষায়িত পুলিশ এবং নিদৃষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের জন্য পুলিশিং
১) বাংলাদেশে শিল্প পুলিশ: এ বিশেষায়িত পুলিশ সাধারণত রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), রেডিমেন্ট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী ও শিল্প-কলকারখানায় নিয়োজিত থাকে। শিল্প পুলিশ আলোচনা, প্রেষণা ও শ্রমিক-মালিক দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্ততা ও সমঝোতা করে কাজ করে থাকে। তারা শ্রমিক অস্থিরতা নিবারণ, শিল্প প্রতিষ্ঠানে শৃংখলা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সম্পদ প্ররক্ষার নিমিত্তে কাজ করে থাকে (বার্ষিক রিপোর্ট; শিল্প পুলিশ, বাংলাদেশ)। শিল্প পুলিশকে আরও বেশি প্রশিক্ষণ দিয়ে ও আরও বেশি জনবল বাড়িয়ে গার্মেন্টস ও ফ্যাক্টরীতে কাজে লাগানো যায়।
২) বিশ্ববিদ্যালয় সিকিউরিটি: বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়েরই নিজস্ব সিকিউরিটি ব্যবস্থা আছে। যারা শৃংখলা বজায় রাখা, টহল দেয়া এবং মানুষকে তল্লাশী করে থাকে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ সকল সিকিউরিটি সদস্যরা সংকটের সময়ে পুলিশকে সহায়তা করে থাকে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন করে আরও ভালো পুলিশিং করা যায়।
চ) সন্ত্রাসবাদ দমন ও ইনটিলিজেন্স সংগ্রহ
বাংলাদেশ পুলিশের এন্টিটেরিজম ইউনিট ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট তথ্যের জন্য কমিউনিটি সদস্য, বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটিলিজেন্স ইউনিট (ইঋওট) এবং টেলিকম রেগুলেটরের সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। পুলিশকে সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম ও হুমকী ট্র্যাক করার জন্য এ সকল নেটওয়ার্ক ও সংস্থার সহায়তা অপরিহার্য (ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, ২০১৫)।
প্লুরাল পুলিশিং-এ মূলত সমাজের সকল এজেন্সি এবং সকল স্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ও অংশগ্রহণে পুলিশিং করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান অসহিষ্ণুতা, অপরাধ প্রবণতা, আইন না মানার সংস্কৃতি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষিতে পুলিশকে সকল পক্ষ থেকে সহযোগিতা করতে হবে এবং বাংলাদেশ পুলিশকে সকলের সাথে মিথস্ক্রিয়া, যোগাযোগ, সমন্বয়, শেয়ারিং ও অংশগ্রহণ করে পুলিশিং করতে হবে। তাহলেই দেশের আইন শৃংখলার প্রত্যাশিত উন্নয়ন সাধিত হবে।
লেখক : ডিআইজি, পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ