অভাবে-অনটনে না পড়া পর্যন্ত উৎরানোর চিন্তা অনেক সময়ই জাগ্রত হয় না। আসে না বিকল্প ভাবনা। সামনে বিদ্যুৎ খাতে বড় রকমের ঝুঁকি আঁচ করে সব মহলেই এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের টানাপোড়েন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ ঘাটতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নগরজীবনের চাপ যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে তখন সময় ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নবায়নযোগ্য শক্তির কথা সামনে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিশ্ববাজারে এলএনজি ও তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জটিলতা জনজীবনে লোডশেডিংসহ নানা যন্ত্রণা অনেকটাই নিশ্চিত। শোনা যাচ্ছে দেশে গ্যাস সরবরাহ প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম হওয়ায় দৈনিক লোডশেডিং ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া পড়ে আছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির ভরসা কয়লাভিত্তিক বড় কেন্দ্রগুলোর দিকে। যেগুলোর বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি। কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে অন্তত ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত সম্ভব হলে সম্ভাব্য এ লোডশেডিং কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন সেই তুলনায় যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ একটি বড় সমস্যা। দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে। বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে এসব কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর বড় অংশই আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভরশীল।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এক হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পটুয়াখালীর পায়রা, বাগেরহাটের রামপাল, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার, কক্সবাজারের মাতারবাড়ী। এ ছাড়া রয়েছে বরগুনায় স্থাপিত ৩০৭ মেগাওয়াটর বরিশাল পাওয়ার আর ৫২৫ মেগাওয়াটের দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র। পটুয়াখালীর নোরিনকোর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। ভারতের আদানির কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এগুলো একেবারেই সম্ভাব্য হিসাব। বাস্তবটা আরো কঠিন হতে পারে। এ কঠিনকে অতিক্রম করতে বিকল্প ভাবনা নেয়া হয়েছে বেশ ক’বার। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎকে মূল কৌশল হিসেবে নেয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার আওতায় সৌর বিদ্যুৎকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রণোদনাও দেয়া হয়েছে। সাড়া জাগলেও ফলাফল কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের জন্য সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে, এর জন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এসব ভাবনায় রেখেই ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল । ২০৪১ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের রোডম্যাপও করা হয়েছিল। বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে ৬-৮ ঘণ্টা সূর্যালোক থাকে এবং প্রতি বর্গমিটারে ৪.৫-৫.৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা শক্তি পাওয়া যায়, যা সৌরবিদ্যুতের জন্য আদর্শ । তা পরিবেশের জন্য সুরক্ষামূলক। ১ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ বছরে ১,৫০০ টন কার্বন নিঃসরণ রোধ করতে সক্ষম। এখানে কর্মসংস্থানও প্রাসঙ্গিক। প্রতি ১ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে গড়ে ৫৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথাও জানানো হয়েছিল। এর বিপরীতে কিছু চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জমির স্বল্পতা, উচ্চ প্রারম্ভিক খরচ এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এর দ্রুত প্রসারে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিশাল জমির প্রয়োজন, যা ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে একটি বড় বাধা। এখানে ছাদ ও অব্যবহৃত জমি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
এখানে সারা বছর প্রচুর পরিমাণে সূর্যালোক পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বছরে ৩০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে যথেষ্ট রোদ থাকে, যা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশেও এত বেশি রোদ থাকে না। কিছু কিছু দেশ তাদের বাস্তবতার আলোকে সাধ্য মতো এর সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে পাকিস্তান দ্রুত সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকে আমদানি ব্যয় কমাতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ একই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়ে পাকিস্তান। গ্যাস ঘাটতি ও তাপপ্রবাহে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মুখে দেশটি বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেয়। বৈশ্বিক বাজারে সৌর প্যানেলের দাম কমে যাওয়া এবং সরকারি প্রণোদনার ফলে দ্রুত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমপরিমাণ সৌর সক্ষমতা গড়ে তোলে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমে এবং গ্যাস ও এলএনজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এড়াতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। বর্তমানে পাকিস্তানে এলএনজির ব্যবহার মোট বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং তা মূলত রাতের সময় সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অংশ ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনো গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপরই প্রধান নির্ভরতা রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে পড়ায় সৌর বিদ্যুৎ তাই আবারো আলোচনায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌর শক্তির জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। দেশটি ২০ থেকে ২৫° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থান করছে, যার মানে হলো দেশে বছরে প্রায় ৫ ঘন্টা দৈনিক গড় সূর্যালোক পাওয়া যায়। দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এ সময় আরো বেশি। এই অব্যাহত সূর্যালোক দেশকে বড় মাপের সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক সুবিধা দেয়। তথ্য বলছে, বাংলাদেশ প্রতি বছর ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি জ্বালানি আমদানি করে। এর বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন মাত্র ৮০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। সময়মতো পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দিনের বড় অংশের বিদ্যুৎ চাহিদা সৌরশক্তি থেকে পূরণ করা সম্ভব ছিল। ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ালেও বাংলাদেশে সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি। শিল্প খাতে এরইমধ্যে ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আরও ৪০০-৬০০ মেগাওয়াট প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে। এসব সম্ভাবনা সামনে রেখে উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সাফল্য পায়নি। বড় বড় সৌর প্রকল্প যেমন মিরসরাই, পায়রা বা রাজশাহী অঞ্চলে কিছুই সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি। শুল্ক ও নীতিগত সহায়তা বাড়ানো গেলে এ খাতে দ্রুত অগ্রগতি আসবে। শিল্পকারখানার ছাদ ও জলাশয়ে সৌর অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট কমানো, স্থিতিশীল নীতি ও কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও খরচের প্রেক্ষাপটে সৌর বিদ্যুৎ বা সোলার এনার্জি দেশের জন্য একটি “গেম চেঞ্জার” হতে পারে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও সৌর বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়। প্রযুক্তির দাম কমানো এবং ব্যাটারি স্টোরেজের উন্নতির ফলে বড় স্কেলের সৌর ফার্ম স্থাপনের খরচ এখন আগের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া, সৌর খাতের বিনিয়োগ নতুন চাকরি সৃষ্টি করতে পারে- ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনস্টলেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন সংক্রান্ত ক্ষেত্রগুলোতে। এতো সম্ভাবনার সমান্তরালে বাধাগুলো দূর করা জরুরি। সেইক্ষেত্রে সৌর শক্তিকে শুধু “ফ্যাশনেবল” বিকল্প হিসেবে না দেখে ভাবতে হবে টেকসই ভিত্তি হিসেবে।
লেখক: সাংবাইদক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন