নানা কারণ ও জটিলতায় দীর্ঘদিন অনিশ্চিত হয়ে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির দুয়ার আবার খুলতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে। ন্যূনতম খরচ এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভেঙে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে রাজি হয়েছে দু’দেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ নিয়ে দফায়-দফায় চেষ্টা চলেছে। আসি আসি করেও সাফল্য ধরা দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে শূন্য খরচে কর্মী নিতে মালয়েশিয়ার ‘এআই’ প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ, স্বচ্ছতার মাধ্যমে সিন্ডিকেট মুক্ত শ্রমবাজার দ্রুত চালুর খবরটি এ সময়ের সেরা সংবাদ।
এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালুর বিষয়ে উভয় দেশ সম্মতির পাশাপাশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রিত নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে জানা গেছে, ৯ এপ্রিল মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে। মালয়েশিয়ার পক্ষে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রামানান রামাকৃষ্ণান। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। বন্ধ থাকা শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে গত বুধবার মালয়েশিয়ায় যান তারা। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে এটি প্রথম সফর। এ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয়ে তার সঙ্গে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের শুরুতে আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।
শ্রমশক্তি বিষয়ে বৈঠক শেষে দেওয়া হয় যৌথ বিবৃতি। জানানো হয়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় খুলবে। কাজটি হবে একটি সুষ্ঠু, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও অভিবাসন ব্যয় কমানো হবে। আটকে পড়া কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়েও বৈঠকে জোর দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হবে নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে। বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কর্মী নিয়োগে মালয়েশিয়ার নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, কর্মী পাঠানো সকল দেশের জন্যই তারা একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও এআইভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘এমপ্লয়ার পেজ প্রিন্সিপল’ (নিয়োগকর্তা কর্তৃক সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের নীতি) মেনে চলবে এ ব্যবস্থাটি।
এর সুবাদে অভিবাসন ব্যয় কমবে। কর্মীদের জন্য নিশ্চিত হবে জিরো কস্ট। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার সাথে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। একযোগে কাজ করার আগ্রহও দেখিয়েছে। দু’দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে আরও অনেক বিষয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মানব পাচার সংক্রান্ত চলমান আইনি মামলাগুলো। মালয়েশিয়া তাগিদ দিয়েছে তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে এমন যেকোনো ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড মোকাবিলার। বাংলাদেশ এতে কেবল সায় দেয়নি, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে নিজস্ব অবস্থান ও প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে। অনিয়মিত কর্মীদের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন বাড়ানোর বিষয়েও কথা হয়েছে দু’পক্ষে। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে উভয় দেশের কর্মকর্তারা তাদের দীর্ঘস্থায়ী এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদারিত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে এই গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখার সিদ্ধান্তে উভয়পক্ষ বৈঠকে সন্তোষ জানিয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ভেঙে তা সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার দাবিতে অনেক দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। ছিল সিন্ডিকেট চক্রের মূল হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে এক নজিরবিহীন অরাজকতা ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম হয়। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আরেকদিকে সাধারণ কর্মীদের করেছে নিঃস্ব। হাল খবরে তারা সন্তুষ্ট। সিন্ডিকেটের হোতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ায় তাদের সন্তুষ্টিতে ভিন্ন মাত্রা। সঙ্গে আবার এও বলা হচ্ছে, কেবল একজনকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না, সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নিজাম হাজারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, কালা ফিরোজ, মনসুর কালাম, কাজী মফিজসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট নিয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটি এজেন্সি-বায়রায়ও পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। তারাও প্রকারান্তরে কোনো না কোনো সিন্ডিকেটভুক্ত। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করতে এসে দু’পক্ষে গালাগালি-মারামারিও হয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা আবার কোলাকুলি-গলাগলিও করেছে। এদের উভয়ের ভেতরেই অন্ধকার। কম-বেশি উভয়পক্ষই চক্রভুক্ত।
এক পক্ষ দাবি করেছে তারা মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে চায়। আরেক পক্ষ বলেছে, যারা এখন সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বলছে, আগে তারাও সিন্ডিকেটর অংশ হয়ে প্রচুর অর্থ হাতিয়েছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রফতানির সিন্ডিকেটটি বরাবরই কোনো না কোনোভাবে শক্তিমান। দেশটিতে শ্রমবাজার গোলমালের মূল কারণ এরাই। এরপরও নানা চেষ্টা তদ্বিরে ২০২১ সালে একটি সমঝোতা চুক্তির আওতায় ১০২টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ শুরু হয়। ২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ার জনশক্তির বাজার আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার এ বন্ধ দুয়ার খোলার ব্যাপক চেষ্টা করে। পুত্রাজায়ায় দেশটির তিনজন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীও এ নিয়ে অনেক তৎপরতা চালিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ওই চেষ্টায় কিছুটা সাফল্যের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে, আগামী কয়েক মাসে মালয়েশিয়া এক থেকে দেড় লাখ বিদেশি জনশক্তি নেওয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে। দুষ্টচক্রের কাণ্ডকীর্তিতে তা ভণ্ডুল হয়ে যায়। মাঠে মারা যায় তাদের ওইসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা। এখন নির্বাচিত সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে আবার আশাবাদ। এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা আবশ্যক যেন সিন্ডিকেট চক্র বা চক্রের কোনো সদস্য এ প্রক্রিয়ার ধারেকাছে ঘেঁষতে না পারে। কারণ এরা বড় ভয়ংকর। ফ্যাসিস্ট জমানার মন্ত্রী-এমপিসহ অনেক হোমড়া-চোমড়ার সঙ্গে এদের বেশ সংশ্রব। সরকারের যে কোনো জনবান্ধব উদ্যোগ বরবাদ করে দেওয়ার হিম্মত তারা এখনো রাখে। এর আগে, টানা অনেক বছর ধরে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারের যতো সর্বনাশ করা যায় এর সবই তারা করেছে। তাই সবিশেষভাবে তাদের ব্যাপারে সতর্কতা আবশ্যক। নূন্যতম ফাঁকফোঁকর পেলেই তারা সুঁচের মতো ঢুকে পড়বে দেশের জন্য কল্যাণকর ও চমৎকার এ পাইপলাইনে। একবার ঢুকতে পারলে আর রোখা যাবে না। তখন নির্ঘাত আবারও করবে সর্বনাশ।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন