দেশের ফুটবলে বিগত ৫৫ বছরে কখনো কোনো ক্লাবের একাডেমি অনূর্ধ্ব-১৬ ছেলে দলকে ফিফা ও এএফসি কর্তৃক অনুমোদিত আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। চীনের ফুজিয়ান প্রদেশে ঝাংঝৌ শহরে চলতি বছরের ১ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘হুরে কাপ ২০২৬ টুর্নামেন্ট’। ক্লাব একাডেমির জন্য আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে ফিফা ও এএফসি শতভাগ নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ‘অর্গানাইজেশনাল মান’ এবং টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড।
চায়নিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক অনুমোদিত, ব্রাজিলিয়ান স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ওলিংগার স্পোর্টস এবং চীনের একাডেমির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে বসুন্ধরা কিংস একাডেমির অনূর্ধ্ব-১৬ দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এটি শুধু বসুন্ধরা গ্রুপের জন্য নয়, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য অনেক বড় সম্মান, গৌরব এবং অর্জন। বসুন্ধরা কিংসের অনাবাসিক একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর তিনটি এজ গ্রুপে। গত বছর অক্টোবর মাসে একাডেমিতে আয়োজন করা হয়েছে নিজেদের মধ্যে প্রথমবারের মতো অভ্যন্তরীণ টুর্নামেন্ট। এরই মধ্যে এই একাডেমির কয়েকজন খেলোয়াড় (অনূর্ধ্ব-১৮) ‘বিসিএল লীগে’ খেলার সুযোগ পেয়েছে।
বসুন্ধরা কিংস একাডেমির প্রতি আস্থা থাকায়ই এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই আমন্ত্রণের মাধ্যমে বসুন্ধরা কিংস একাডেমি আন্তর্জাতিক একাডেমি ফুটবল টুর্নামেন্টে দেশের ফুটবল ইতিহাসে অগ্রগামী হিসেবে নাম লেখাতে সক্ষম হলো।
এবারের টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাচ্ছে ১৬টি একাডেমি দল। এর মধ্যে আটটি চীনের বিভিন্ন একাডেমি, আর বাইরে থেকে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এবং অন্য মহাদেশ থেকে আটটি দল।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুধু বাংলাদেশের বসুন্ধরা কিংস একাডেমির দল থাকছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই টুর্নামেন্টে।
একাডেমি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপের একটি স্বপ্ন ও লক্ষ্য বাস্তবে রূপ পেতে যাচ্ছে। গ্রুপ সব সময় চেয়েছে স্পোর্টসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ইতিবাচক ‘ব্র্যান্ডিং’ করতে। চেয়েছে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। আর এই লক্ষ্যেই ৩০০ বিঘা জমির ওপর বিরাট স্পোর্টস কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে।
এই কমপ্লেক্সে সব খেলার জায়গা হয়েছে দেশের খেলাধুলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য। এখানে উল্লেখ্য যে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে কোনো করপোরেট গ্রুপের এ ধরনের আধুনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ স্পোর্টস কমপ্লেক্স নেই। বিষয়টি বাংলাদেশিদের জন্য অবশ্যই গর্বের বিষয়।
কিছুটা অবাক হয়েছি, আন্তর্জাতিক মানের একাডেমি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ থেকে একটি একাডেমি দল অংশ নেবে, অথচ মিডিয়ায় এই বিষয়টি আলোচনায় স্থান পায়নি গ্রুপের মিডিয়া ছাড়া। কিংস একাডেমি দল অংশ নেবে সত্যি, তবে বিষয়টির সঙ্গে দেশ আর দেশের স্বার্থ জড়িত। কিংসের মিডিয়া যারা ‘হ্যান্ডলিং করেন’, তাঁরা বা কিংসের ফুটবল প্রশাসন কী ভাবছে, জানি না। তবে বলব, জাতীয় স্বার্থে সবাইকে এক কাতারে এসে দাঁড়ানো উচিত, দাঁড়ানো উচিত ক্লাব সংস্কৃতির স্বার্থে।
বসুন্ধরা কিংস একাডেমি ‘হুরে কাপ টুর্নামেন্টে’ খেলবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্টে বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের শক্তি, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা যাচাই করে নেওয়ার এটি একটি বিরাট সুযোগ। এই অভিজ্ঞতা কিশোর ফুটবলারদের আগামী দিনগুলোতে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।
আমন্ত্রণপত্র গ্রহণের পর থেকে বসুন্ধরা কিংস একাডেমির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর বায়েজিদ আলম জুবায়ের নিপুর নেতৃত্বে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার নামি ক্লাবের একাডেমি দল এই টুর্নামেন্টে নিয়মিতভাবে অংশ নিয়ে থাকে। আর এতে করে এই টুর্নামেন্টের মান উঁচু। এখানে সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্য নিয়েই খেলতে নামে। আর তাই এই টুর্নামেন্টের গল্প সহজ-সরলভাবে চলার সুযোগ নেই। এই ফুটবলের গল্পে আছে বৈচিত্র্য ও রোমাঞ্চ। এবার ঠিক কোন ১৬টি দল অংশ নিতে যাচ্ছে, এই তথ্য আমার জানা নেই। তবে এই টুর্নামেন্ট সব দলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে—এটিই বাস্তবতা।
এই টুর্নামেন্টে অতীতে জার্মানির বরুশিয়া ডটমুন্ড, নেদারল্যান্ডসের পিএসভি ও ফেয়েনুর্দ, পর্তুগালের স্পোর্টিং সিপি, আর্জেন্টিনার রিভার প্লেট, ব্রাজিলের সাও পাওলো ছাড়াও বিভিন্ন খ্যাতিমান ক্লাবের একাডেমি দল বিভিন্ন বছর খেলেছে অন্যান্য মহাদেশ থেকে।
২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রৌদ্রকরোজ্জ্বল অপরাহ্নে আনুষ্ঠানিকভাবে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, যিনি মনে-প্রাণে ক্রীড়াপিপাসু, কিংস অ্যারেনা উদ্বোধন করতে এসে বলেছেন, ‘আমাদের স্বপ্ন হলো ক্লাবের বড় একটি আবাসিক একাডেমি, যেখানে এক হাজারের বেশি ছেলে ফুটবল শিখবে। দেশি ও বিদেশি টেকনিক্যাল পারসনরা নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য এখানে কাজ করবেন। আমাদের লক্ষ্য হলো সবাইকে নিয়ে টেকসই ফুটবল উন্নয়নের জন্য কাজ করা। একাডেমি বিল্ডিংয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ছোট পরিসরে অনাবাসিক একাডেমি কার্যক্রম শুরু করবে।’ সেদিন তিনি আরো বলেছেন, ‘দেশের বাইরে থেকে বেশ কয়েকটি ইউরোপের ক্লাব একাডেমিতে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে। পুরোপুরি আবাসিক একাডেমি চালু না হওয়া পর্যন্ত এটি সম্ভব হবে না।’
একই দিন সন্ধ্যায় খেলার পর কথা হয়েছে বসুন্ধরা কিংসের প্রেসিডেন্ট মো. ইমরুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, ‘চেয়ারম্যান স্যার কোনো ধরনের প্রতিদানের আশায় বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে স্পোর্টস কমপ্লেক্স তৈরি করছেন না, শুধু খেলাধুলাকে ভালোবেসে এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে তাঁর এই উদ্যোগ। তাঁর লক্ষ্য হলো ক্রীড়াঙ্গনে টেকসই উন্নতির ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে অবদান রাখা। বলতে পারি, চেয়ারম্যান স্যার যে স্বপ্নের বীজ এই কমপ্লেক্সে বপন করেছেন, এর ফল দেশের ক্রীড়াঙ্গন কয়েক বছরের মধ্যে পাবে। এতে ক্রীড়াঙ্গনের অবস্থা পাল্টে যাবে। এই কমপ্লেক্স নিয়ে শুধু দেশের মানুষ গর্ব করবে না, বিদেশেও আলোচনা হবে। এখন পর্যন্ত এত বিশাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স তো দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো করপোরেট হাউস তৈরি করার উদ্যোগ নেয়নি। এই দিক থেকে বাংলাদেশের বসুন্ধরা গ্রুপ এগিয়ে থাকল।’
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া