বাংলাদেশ কি কোনো কল্যাণ রাষ্ট্র?
হ্যাঁ সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যদিও ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়নি। শাসনতন্ত্রের ১৫ অনুচ্ছেদে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই দায়িত্ব আমাদের রাষ্ট্র কতখানি পালন করছে বা করলেও সঠিকভাবে করছে কি না, এ প্রশ্ন সামনে আনা দরকার। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ইত্যাদি দেশের সব নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার। কথাটি আবার বলি, এগুলো অধিকার। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুগ্রহ নয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে নাগরিক সাধারণের এ অধিকারগুলো নিশ্চিত করার সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। বস্তুত সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের যে ডিজাইন উপস্থাপন করা হয়, তা ছিল একটি গণতান্ত্রিক ওয়েলফেয়ার স্টেটের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে, সেটাই ছিল অভিলক্ষ্য। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেটা হয়নি বা হতে দেওয়া হয়নি। কেন হয়নি, কোথায় কীভাবে সেই লক্ষ্যচ্যুতি ঘটেছে তার বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। তার আগে আমাদের বুঝতে হবে কল্যাণ রাষ্ট্র কাকে বলে! এটা কেবলই একটি কেতাবি ধারণা নাকি বাস্তবেও সম্ভব! গণতন্ত্রের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ আছে কী নেই! যারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাস করেন তারা মনে করেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের সর্বজনীন কল্যাণ হতে পারে না। কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় যে কয়টি কল্যাণ রাষ্ট্র রয়েছে তার বেশির ভাগই গণতান্ত্রিক দেশ, যদিও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা থেকে কিছু কিছু উপাদান তারা নিয়েছেন। নরওয়ে তার তেল সম্পদের আয় দিয়ে নাগরিক সাধারণের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করেছে। সুইডেন জনগণের কাছ থেকে উচ্চহারে ট্যাক্স নিয়ে ততোধিক উচ্চমাত্রায় সেবা নিশ্চিত করে। সমাজতান্ত্রিক কিউবাও একটি কল্যাণ রাষ্ট্র। উৎপাদনব্যবস্থা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক। কিউবায় চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সুবিধাগুলো জনগণ ভোগ করেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা-কোনো পর্যায়েই নাগরিকদের কোনো খরচ করতে হয় না। এগুলো তারা ভোগ করেন অধিকার হিসেবে। কিন্তু মতপ্রকাশের অধিকার নেই বললেই চলে। সবকিছুই রাষ্ট্র কর্তৃক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো বাধা নেই। অর্থনীতি মিশ্র। বেসরকারি খাত যথারীতি অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম। বাধা নেই।
সমাজতান্ত্রিক হোক আর গণতান্ত্রিক হোক উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিকের অধিকার সর্বজনীন। সবার জন্যই সমান। এমন নয় যে গরিব নাগরিকই কেবল বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন, ধনীরা নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রবীণ ব্যক্তি-ধনী বা দরিদ্র যাই হোন না কেন-রাষ্ট্র তার প্রাপ্য সুবিধা সমানভাবে প্রদান করে। ওয়েলফেয়ার স্টেটে মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের নামে সরকার দয়া-দাক্ষিণ্য বণ্টন করে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সাধারণত গরিব মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তথাকথিত সেফটিনেট বা সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে অনুকম্পা বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই দয়া বা অনুকম্পা বণ্টন করা হয় যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের বিবেচনা অনুযায়ী বাছাই করা কিছু লোকের মধ্যে। অভাবের সময় বিনামূল্যে চাল দেওয়া, ভর্তুকি মূল্যে ভোগ্যপণ্য দেওয়া, বাছাই করে কিছুসংখ্যক বৃদ্ধ বা বিধবাকে যৎসামান্য ভাতা দেওয়া-এ ধরনের কিছু কাজ করে সরকার তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। এভাবে যখন দয়া বণ্টন করা হয়, তখন তা সর্বজনীন হয় না, হতে পারে না। কিন্তু প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্রে সব শ্রেণির নাগরিক খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো সমানভাবে পাওয়ার হকদার। রাষ্ট্রের জনগণের এই হক আদায়ে সরকার যখন সচেষ্ট হয়, তখনই কেবল একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে। আমাদের কেতাবে কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কোনো সরকারই সে পথে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেনি। তার পরিবর্তে সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের জন্য দয়া বণ্টনের নানান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। আমাদের দেশের রাজনীতিও জনকল্যাণমুখী নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্লোগানপ্রধান।
দেশে সমস্যা অনেক। সব সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভবও নয়। একটি ছোট লেখায় বিদ্যমান সমস্যার সবগুলোর আলোচনাও সম্ভব নয়। আজ আমরা আলোচনা করব চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে। স্বাধীনতার পরের সাড়ে পাঁচ দশকে চিকিৎসা খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন কম হয়নি। রাজধানী ঢাকায় সাধারণ ও বিশেষায়িত মিলিয়ে কমবেশি অর্ধশত সরকারি হাসপাতাল হয়েছে। সারা দেশে ৩৭টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও হাসপাতাল আছে। কিন্তু মানসম্মত চিকিৎসা নেই। কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নেই। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় পোস্টেড চিকিৎসক থাকলেও কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই অনুপস্থিত। প্রতিকার নেই।
হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনেশিয়ান নেই। অথবা মেশিন বিকল। সরকারি খাতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের পদ শূন্য। ফলে অনেক হাসপাতালে জনবলের অভাব। অথচ দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন কমপক্ষে ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ৩০ হাজার সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত। এ পরিসংখ্যান বলে দেয় যে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে পদে পদে অব্যবস্থাপনা; বিশৃঙ্খলা।
ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া একজন অভিযোগ করেন, গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে অ্যান্ডোস্কোপির সিরিয়াল পেতে কমপক্ষে ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই ২০ দিনে একজন লিভারের রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠা বিচিত্র নয়। হাসপাতালে অ্যান্ডোস্কোপি করতে যেখানে খরচ ৫০০ টাকা সেখানে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খরচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ গুণ বেশি। অনেক সরকারি হাসপাতালে বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে বলা হয়। যে হাসপাতালে অ্যান্ডোস্কোপি করতে ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে হয়তো লোকবলের অভাব রয়েছে। অথবা প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্লট নেই। এ সমস্যার সমাধান কি খুবই অসম্ভব? একটির জায়গায় রোগী অনুপাতে স্লট স্থাপন করা অসম্ভব কোনো কাজ নয়। কিন্তু যারা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন তারা হয়তো প্রয়োজনবোধ করেন না।
বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে পদে পদে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমনস্কতা। স্বাস্থ্য খাতে যে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে তার পরিচালনা সুশৃঙ্খল হলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে কম খরচে জনগণের জন্য সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যেত এবং সেটা নিশ্চিত হলে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ও ডায়াগনোসিসের নামে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ আপনাআপনিই সংকুচিত হয়ে আসত। বাংলাদেশে চিকিৎসা এখন মোটেও সহজলভ্য নয়। ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। ক্রমেই তা সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও উপকরণও বাইরে থেকে কিনে দিতে হয়। এ বাস্তবতায় বিনামূল্যে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা লাভের অধিকার নিশ্চিত করা তো দূরের কথা, কম খরচে ও সহজে মানসম্মত চিকিৎসাও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেবল চিকিৎসা খাত বলে কথা নয়, জনগণের কল্যাণ ও নাগরিক সেবার যতগুলো খাত আছে, সবখানেই অনিয়ম-অব্যস্থাপনা।
বাংলাদেশের মানুষের এক বৃহদাংশ নিয়মমাফিক আয়কর না দিলেও পরোক্ষ করের আওতামুক্ত কেউ নয়। এ দেশে একজন হতদরিদ্র মানুষও সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে থাকেন। দুই টাকা দামের একটা ম্যাচবাক্স কিনতেও ভ্যাট দিতে হয়। বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে যে সেবাগুলো দেওয়ার কথা তা দেয় না বা দিতে পারে না। জনগণ ও সরকারের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে। সেই দেয়ালের নাম দুর্নীতি। দুর্নীতির গর্ভ থেকে জন্ম নেয় হাজার রকমের সমস্যা, রচিত হয় জনগণের প্রতিকারহীন বঞ্চনার ইতিহাস। আমাদের রাজনীতির সেই দিকে খেয়াল খুব কম, যদিও মুখে অনেক বড় বড় কথা বলা হয়। গত কয়েক বছর ধরে সংস্কার, সংশোধন ও রাষ্ট্র মেরামতের অনেক রাজনৈতিক বাণী ও বক্তৃতা আমরা শুনছি। দেয়াল লিখন দেখেছি, ‘এই রাষ্ট্র মেরামত করতে হবে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে হবে।’ একদল দুষ্ট সুশীল ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর বলতে শুরু করলেন, বাহাত্তরের সংবিধানই বড় সমস্যা। সেই সংবিধানের কোন ধারাটি রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণের কাজে বাধা দিয়েছে, সেটা অবশ্য তারা বলেন না। রাজনীতির এক পক্ষ পড়ে আছে জুলাই সনদ নিয়ে। জুলাই সনদ পাস হয়ে গেলে যেন বা দুধের নহর বইতে শুরু করবে। জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো যেন বা আপনাআপনি পূরণ হয়ে যাবে। দেশ ও সমাজের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত না করে যারা রাষ্ট্র মেরামতের কথা বলেন তারা আসলে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছেন। এ ধরনের অবিবেচক রাজনীতি কখনই জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারবে না।
মনে রাখা দরকার স্বাধীনতার জন্য বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সার্বভৌম দেশটি আমরা পেয়েছি সেই দেশের রাষ্ট্র-দর্শন হলো জনকল্যাণ। স্লোগান দিয়ে জনকল্যাণ হয় না। জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমস্যাগুলো ঠিকমতো শনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক