দৃশ্যপট-১
জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। একটা জোড়াতালির টিনশেডে তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছে শিশুরা। এভাবেই চলছে তাদের পাঠদান। পাঁচজন পরিপাটী শিক্ষক, তাঁদেরও একই দশা। বিদ্যালয় পরিদর্শককে দেখে সকল শিক্ষক এগিয়ে এলেন তাঁদের দূর্গতির কথা তুলে ধরতে। এদৃশ্যে পরিদর্শকেরও মন ভারাক্রান্ত হলো, তিনি আর শিশুদের পড়ালেখা বিষয়ক কোনো আলাপে যেতে পারলেন না। অতঃপর পরিদর্শকের নজরে এলো এই জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবনের গা ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সুদৃশ্য উপাসনালয়। উপাসনালয়ের দরজায় তখন তালা ঝুলছে। আর ঠিক তার পাশেই অত্র বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের প্রাচীরঘেরা প্রাসাদোপম আপনালয়। গ্রামের অন্যান্য বাড়িগুলোও বেশ পরিপাটি, গোছানো গৃহস্থালির উপমা।
দৃশ্যপট-২
গ্রামের সুদৃশ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নজর কাড়ে পথিকের। বিদ্যালয় পরিদর্শকও কৌতুহলী হয়ে দূর থেকে বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য্য দেখার জন্য গাছের ছায়ায় খানিকটা থামলেন। বিদ্যালয়ের সামনে খেলার মাঠে তখনও কয়েকজন শিশু ক্রীড়ারত। যদিও সেটা শ্রেণি পাঠদানের সময়। পরিদর্শক ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন বিদ্যালয় ভবনের দিকে। সেদিকে শিক্ষকগণের নজর পড়তেই তাঁরা একে একে শ্রেণিকক্ষের দিকে পা বাড়ালেন। পরিদর্শক শ্রেণিকক্ষে উঁকি দিয়ে দেখলেন মাত্র ৪/৫ জন শিশু এক একটি শ্রেণিকক্ষে। অপ্রস্তুত শিক্ষক জানালেন দীর্ঘদিন বিদ্যালয় ভবন না থাকায় শিশুরা অন্যত্র চলে গেছে এখন বিদ্যালয় ভবন হয়েছে ঠিকই কিন্তু শিশুরা আর ফিরে আসছে না! শিক্ষকগণও তাই অনেকটা হালছেড়ে বসে আছেন সেই পুরোনো অভ্যাসে নিজেদের স্বাচ্ছন্দটুকু নিশ্চিত করে নিয়ে।
জরাজীর্ণ বিদ্যালয়
গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অত্র গ্রামের সকল শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র অবলম্বন। গ্রামের ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব পরিবারই তাদের শিশুকে এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। যে শিশুটি তার বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, সে যখন বিদ্যালয়ে এমন অযত্ন-অবহেলার শিকার হয় তখন বিদ্যার্জন তার কাছে দূরাশা। শিক্ষকগণও তথৈবচ। পরিপাটি আপনালয় ছেড়ে জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ে তাঁরও মন বসে না। অথচ তিনি নির্বিকার। সরকারি চাকুরি বলে কথা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরকারি শিক্ষকগণ সরকারের অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকেন। অভিভাবকগণও সরকারের এমন উদাসীনতার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন আর নিজের সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে আক্ষেপ করেন। অতঃপর যখন সরকারের সদয় অনুগ্রহে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হয় ততদিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজের গা বাঁচিয়ে স্বস্তি খুঁজে নিতে শিখে গেছে। ভবনের উন্নতি হলেও তাতে বিদ্যালয়ের শিখন পরিবেশের কোনো পরিবর্তন হয়না। অথচ নিজেদের সন্তানের শিক্ষা যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য সামাজিক উদ্যোগে কয়েকটা শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা অনায়াসে হতে পারত এখানে। যেমনটি বিদ্যালয়ের জন্মলগ্নে হয়েছিল কিংবা যেমনটি উপাসনালয়ের জন্য হয়েছে।
গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আজ থেকে অর্ধশতাব্দী আগে এই গ্রামের মানুষের অবদানেই গড়ে উঠেছে। সরকারের আনুকুল্য ছাড়াই বহুদিন শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে এই বিদ্যালয় সুনামের সাথে। তার প্রমাণ এই বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক যিনি একসময় এই বিদ্যালয়েই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন। আরও বহু শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আজ সমাজে ভালো অবস্থানে আছেন। সরকারি হওয়াতেই কি গোল বাঁধলো? বিদ্যালয়ের এমন দূর্গতি এবং আমাদের সন্তানের কষ্টেও আর আমাদের মন আদ্র হয়না এখন!
দ্বার রুদ্ধ উপাসনালয়
উপাসনালয় সমাজের আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি জাগতিক বা সামাজিক শৃঙ্খলা, মানবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। উপাসনালয় ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত মানবসমাজ গড়ে তোলার তাগিদে সৃষ্টি। বিদ্যালয় যেমন সমাজের প্রয়োজনে মানব সন্তানের শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত তেমনি উপাসনালয়ও সমাজের প্রয়োজনে মানুষকে ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে ক্রিয়াশীল। উভয়েরই উদ্দেশ্য মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করা। কিন্তু বিদ্যালয়কে অবহেলায় পাশে ফেলে রেখে যে উপাসনালয় সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে তাকে আপনি কী বলবেন? যে সমাজ শিশুর শিক্ষার প্রয়োজনকে অবহেলা করে নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির নিমিত্তে উপাসনালয় গড়ে তুলতে অধিক মনোযোগী হয় সেখানে শিশুদের ভবিষ্যৎ কী?
দেয়াল ঘেরা আপনালয়
আপনালয় হলো নিজের বাসস্থান। নিজের পরিবারকে নিয়ে বসবাস করার জন্য প্রত্যেক সংসারী মানুষই আপনালয় গড়ে তোলেন। যে যার সাধ্যমত গড়ে তোলেন তার আপনালয়। কিন্তু কেবল নিজের বাসস্থানকে পরিপাটী গড়ে তুললেই সমাজে সুস্থভাবে বাঁচা যায় না। সমাজে সুস্থভাবে বাঁচতে হলে গোটা সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকতে হয়। পরস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে সকলের জন্য স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। এই সহজ সত্য যে সমাজের মানুষ প্রতিপালন করে না তারা সমাজে বাস করেও অসামাজিক। আপনালয়ের উচুঁ নিরাপত্তা দেয়াল যে বঞ্চিতদের আর্তনাদে মুহুর্তেই ভেঙে পড়তে পারে তার বহু উদাহরণ আমরা দেখেছি। তবুও যারা চারপাশের মানুষের প্রতি নূন্যতম সহমর্মী না হয়ে ক্রমাগত আপনালয়ের দেয়াল তুলছেন তারা অনাগত আগামীর প্রতি উদাসীন। তারা প্রতিবেশীর উঠোনের ধুলোমাখা শিশুটির কান্না শুনতে পাই না।
শিক্ষার সমাজপট
শিশু তার চারপাশের পরিবেশ থেকে শিক্ষা লাভ করে। শিশুর জন্য শিক্ষার সমাজপট তাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যে শিশু বঞ্চনার মধ্যে বড় হচ্ছে তাকে উদারতার পাঠ দিয়ে লাভ নেই। সে একদিন তার বঞ্চনার প্রতিশোধ নেবে, নেবেই। আজ যে শিক্ষক সমাজে নিপীড়িত হয়ে ভাবছেন সমাজ উচ্ছন্নে গেছে তিনি তাঁর শ্রেণিকক্ষের সেই বঞ্চিত শিশুটির মুখ হয়তো ভুলে গেছেন যে শিশুটি আজ তাঁর সামনে নিপীড়কের ভূমিকায়।
উপসংহার
আমাদের সন্তানদের শিক্ষার প্রয়োজনে আমরা সামাজিক উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে গড়ে তুলেছি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সে বিদ্যালয় আজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাই বলে কি আমরা মুখ ফিরিয়ে নেব? রাষ্ট্র কি আমাদের সামাজিক দায়বোধ থেকে মুক্তি দিল? কখনই তা নয়, বরং আমরা যেন আরও ভালোভাবে আমাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে পারি সেজন্য রাষ্ট্র তার সাধ্যমত সহযোগিতা দিল মাত্র। বাকী কাজ তো আমাদেরই। আমাদের সন্তানের শিক্ষার ভার তো আমাদেরই। তাই বলে কেবল নিজের সন্তানের জন্য কায়দা করে বেঁচে থাকার শিক্ষা দিয়ে তাকে ভালো রাখা যাবে না। তাকেও সমাজবদ্ধ হয়ে বাঁচার শিক্ষাটা দিতে হবে। আর সেজন্যই বিদ্যালয়কে সম্মিলিত চেষ্টায় কার্যকর রাখতে হবে সামাজিক উদ্যোগেই। শিক্ষার সমাজপটের আশানুরুপ পরিবর্তন না হলে সরকারের কোনো চেষ্টাই সফল হবে না। কারণ প্রাথমিক শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সবই সমাজপটের অনুগামী। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের সন্তানের শিক্ষার প্র্রয়োজনে সামাজিক উদ্যোগে এগিয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সফল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সত্যেরই প্রতিফলন দৃশ্যমান।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ