ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউর সাথে ভারতের বাণিজ্য চুক্তিতে চরম দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। প্রতিযোগিতা নয়, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠবে বলে শঙ্কা তাদের। এ চুক্তির গোমড় বুঝতেও ৩-৪ মাস কেটে গেছে দেশের কারো কারো। প্রায় এক দশককাল আলোচনা শেষে জানুয়ারিতে সই হওয়া এফটিএ চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা আগামী বছর থেকে। বিনিয়োগ সুরক্ষা থেকে শুরু করে ভৌগোলিক স্বত্ব-জিআই সব মিলিয়ে এই চুক্তি ভারতের জন্য এক বিশাল জানালা খুলে দিল। একদিকে যখন মার্কিন শুল্কের খাঁড়া ঝুলছে, তখন এই চুক্তির হাত ধরে ইউরোপের ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার ভারতের সামনে উন্মুক্ত হবে। ভারতের অর্থনীতির এটি একটি ‘গেম চেঞ্জার’। শুল্ক কাঠামোর এ উদারীকরণের যাবতীয় সুযোগ এখন তাদের কব্জায়।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অন্যতম শক্তিশালী আরেক দিক হলো পরিষেবার বাণিজ্য। ভারত ইইউ-এর মোট ১৪৪টি উপ-খাতে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যার মধ্যে আইটি, শিক্ষা, আর্থিক পরিষেবা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই চুক্তির অধীনে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ইইউ-এর দেশগুলোতে ‘আনক্যাপড মোবিলিটি’ (সীমাহীন যাতায়াত) ও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর ফলে ভারতীয় মেধাবী শিক্ষার্থীরা ইউরোপের ২৭টি সদস্য দেশে কোনো নির্দিষ্ট কোটা ছাড়াই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে। তাই পেশাদার কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই চুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ পেশাদাররা এখন থেকে ইইউ দেশগুলোতে কাজ করার জন্য দ্রুত ও সহজতর অনুমতি পাবেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ‘সামাজিক সুরক্ষা চুক্তি’ সম্পন্ন করার নির্দিষ্ট কাঠামো। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই কাঠামো চূড়ান্ত হলে ভারতীয় পেশাদাররা দ্বৈত করের বা ডুয়াল ট্যাক্সেশনের (একই আয়ের ওপর ভারত এবং ইউরোপ-উভয় দেশেই কর দেওয়ার বোঝা) হাত থেকে মুক্তি পাবেন, যা তাঁদের সঞ্চয় ও পেশাদার জীবনকে আরও সুরক্ষিত করবে। একই সাথে এটি ভূ-রাজনীতি ও ভারতের কৌশলগত বর্মও। ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি এমন এক সময়ে সই হয়েছে, যখন বিশ্ব বাণিজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সংরক্ষণবাদী নীতির চাপে টালমাটাল। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন ভারতের ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছে, তার বিপরীতে এই চুক্তিটি ভারতের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত রক্ষাকবচ।
মার্কিন শুল্ক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারত এখন ইউরোপের বিশাল বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবে, যা মার্কিন বাজারের ওপর ভারতের অতিনির্ভরতা কমিয়ে বিশ্ববাজারে নিজের ‘মার্কেট শেয়ার’ রক্ষা করতে সাহায্য করবে। আঞ্চলিক ও বিশ্বায়নের কূটনীতিতে এটি ভারতের জন্য বিশাল প্রাপ্তি। এসব নিয়ে বাংলাদেশকে একটা সময় পর্যন্ত ভাবতে হয়নি। বরং এতদিন সুবিধাজনক পজিশনেই ছিল বাংলাদেশ। জিএসপি-জেনারেল সিস্টেম অব প্রেফারেন্স সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কারণেই ইউরোপের বিশাল বাজারে আধিপত্য তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের। ইইউতে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পেলেও ভারতকে নির্দিষ্ট হারে শুল্ক দিয়ে পোশাক রপ্তানি করতে হতো। কিন্তু এ চুক্তির ফলে ভারতের দুয়ার খুলে গেল ভারতের। তাদের আর শুল্ক গুণতে হবে না। তারওপর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যায় ভারত বড় ধরনের থাবা দেবে বলে শঙ্কা ঘুরছে এ খাত সংশ্লিষ্টদের মাঝে। ভিয়েতনামের সাথেও তারা এ চুক্তি করেছে। ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশ-এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আর থাকবে না। এমন একটি ক্রান্তিকর সময়েই ইইউর সাথে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি-এফটিএ সই। ঘোষিত চুক্তিটি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট এবং ভারতের পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে ২০২৭ সালে কার্যকর হওয়ার কথা।
চুক্তিটি কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পোশাকের ওপর বিদ্যমান ১২ শতাংশ শুল্ক উঠে গিয়ে তা শূন্যে নেমে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের পোশাক খাত এতদিন যে সুবিধা পেয়ে আসছিল, তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই চুক্তির আওতায় ইইউ ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে তাদের রপ্তানি দ্বিগুণ করতে চায়। বিনিময়ে ইইউ সাত বছরের মধ্যে ভারত থেকে আমদানিকৃত ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর অনুকূলে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরোর শুল্ক সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই চুক্তির ফলে দুই দেশ ও অঞ্চলের ৯৯ শতাংশেরও বেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়া হবে। এর আওতায় ভারত ইইউর ৯১ শতাংশ পণ্য এবং ইইউ ভারতের প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এতে দুই অঞ্চলের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে বিশাল আয়তনে। ভারতের তৈরি পোশাকই নয়, চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের রপ্তানিও ব্যাপকভাবে বাড়বে। সমান্তরালে ইউরোপীয় গাড়ি, ওয়াইন এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম কমে আসবে ভারতে। দেশটির শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার খবরে ইউরোপের বায়াররা এরই মধ্যে ড্রেস রিহার্সালের মতো নড়াচড়া শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ব্যবসার নিরাপত্তা ও শুল্কমুক্ত সুবিধার আশায় তাদের যাতায়াত চলছে ভারতে। দেশের বিজনেস কমিউনিটির কাছে এ সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম তাদের অর্ডারগুলো বাংলাদেশ থেকে শিফট করা গোপন বিষয় নয়। আগামী এক বছরের মধ্যে আরও অনেক অর্ডার সেখানে চলে যেতে পারে। গত বছরের আগ পর্যন্ত এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশে প্রতি বছরই অর্ডার প্লেসিং বাড়িয়েছিল। এই বছরই একমাত্র তারা অর্ডার বাড়ায়নি, বরং কমিয়েছে। এর মূল কারণ তারা ভারতের দিকে পা বাড়িয়েছে। অনেক বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ ১৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক ইইউতে রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল ২৮.৫৮ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পোশাক রপ্তানির দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে বিশ্বে দ্বিতীয় ধরা হয়। ভারতের অবস্থান চতুর্থ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যথাক্রমে ১৮.৩১ ও ১৯.৪১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ভারত রপ্তানি করেছে যথাক্রমে ৪.১৮ ও ৪.৫২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক।
অ্যাডহক নয়, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে বাংলাদেশকে। এ কাজটির বিশেষ দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশেরও এফটিএ’র আলোচনা শুরু করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ যে হাই ভলিউমে মানসম্পন্ন পোশাক তৈরিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞ, তা প্রচারে রাখতে হবে। ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিনামার আলোচনা জারি রাখতে হবে। বাংলাদেশও এফটিএ করার উদ্যোগ নিয়েছে, বায়ারদের কাছে এ বার্তা গেলেও তাদের মধ্যে একটি ভাবনা যোগ হবে। স্বস্তি আসবে। নিজস্ব কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতেই হবে। ভারত এই চুক্তির আগে তা করেছে। চাইলেই কোনো দেশ এফটিএ করতে রাজি হবে না। এটি দ্বিপক্ষীয় বিষয়। অপর দেশকেও কিছু সুবিধা দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হয়। গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির সরবরাহের বার্তা দিতে হবে। কাস্টমস বা আইন-কানুনসহ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যাংকিং খাতের সংকটগুলো দূর করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি তো আনতেই হবে। দ্রুত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাপোর্ট নিশ্চিতের বার্তা যেতে হবে বায়ারদের কাছে।
রপ্তানি বাণিজ্যে পণ্যের বৈচিত্র্য, গুণগত মান উন্নয়নও করতে হবে। আর তা শুধু কথায় হাতি ঘোড়া মেরে হবে না। গালগল্প দিয়ে নয় কাজ দিয়ে দেখাতে হবে। ১৯৭৫ সাল থেকে ইইউর দেওয়া বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর ভর করে বাংলাদেশ চীনের পর ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার্স ও টি-শার্টের মতো কিছু ক্ষেত্রে চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। ইইউ বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তার মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ইইউর বাজারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন, কানাডায় ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন, জাপানে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
শিল্পমালিকদের তথ্য বলছে, ইউরোপে প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশের তৈরি ডেনিম ট্রাউজার পরেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি গেছে ইইউ দেশগুলোতে, যার আর্থিক মূল্য ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে ২০২৯ সালের পর ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শূন্য শুল্ক সুবিধা ভোগ করতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ট্যারিফ ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের পর এখন পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য প্রধান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইউরোপ। ব্রোকারেজ ফার্ম ব্র্যাক ইপিএল এক গবেষণা নোটে বলেছে, ‘বাজারে হঠাৎ অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দরকষাকষির ক্ষমতা এখন ইইউর ক্রেতাদের হাতে। তারা সরবরাহকারীদের ওপর কঠিন শর্ত ও কম সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহের চাপ দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে বিশ্বের ২৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি যৌথভাবে ইইউ ও ভারতের দখলে। তাদের হাতেই আছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বড় এক বাজার। তাই দুই দেশের কাছে এটি ‘মাদার অব অল ডিলস’ (সব চুক্তির সেরা)। তা কথামালা দিয়ে হয়নি। আরো মনে রাখতে হবে, ভারত একবার শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। তখন চেষ্টায়ও কাজ দেবে না। তাই সতর্ক হওয়া এবং পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের এফটিএ বা জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিতের সময় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলে আরো পেছনে পড়বে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
বিডি প্রতিদিন/এমআই