বাংলাদেশ আজ দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির পথে অগ্রসর হলেও, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো মূলত তৈরি পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ভিত্তি গড়ে তুলতে যথেষ্ট টেকসই সমাধান নয়। কেননা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অপরাপর দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ কথা নয়। প্রতিটি দেশ তাদের প্রচলিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পথে হাঁটছে। World Economic Forum-এর মতানুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎকর্ষতার এই সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে আধুনিক জীবপ্রযুক্তি আগামীর বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করবে।
জীবপ্রযুক্তিনির্ভর এই প্রাণ-অর্থনীতি (Bioeconomy) ইতোমধ্যে বৈশ্বিকভাবে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে—যা বাংলাদেশের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের অর্থনীতির তুলনায় প্রায় পঞ্চাশগুণ বেশি। Congress.gov–এর তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপির ৫ শতাংশেরও বেশি অংশ এখন বায়োইকোনমি থেকে আসে। এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে নীতিমালা ও কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও শ্রীলংকাও এই অগ্রযাত্রায় শামিল।
ভারতের উদাহরণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির বায়োইকোনমি গত অর্থবছরে প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা তাদের জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশেরও বেশি। ভারতের জীবপ্রযুক্তি বিভাগ (Department of Biotechnology)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এই খাতের আকার ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে—যা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা থাকলে জীবপ্রযুক্তি একটি দেশের কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিল্প খাতে অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। এই বাস্তবতায়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে বায়োইকোনমি একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বায়োইকোনমি নিয়ে আমাদের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কোনো নীতিমালা বা কর্মপরিকল্পনার উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে বলে জানা নেই।
কৃষিতে জীবপ্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা অনেকদিন ধরেই চলছে, কিন্তু বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তার একটি বাস্তব, মাঠপর্যায়ের প্রমাণ হাজির করেছে—Bt বেগুন। এটি কেবল একটি ফসল নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা যে, সঠিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে কৃষি খাত কীভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। Taylor and Francis প্রকাশনার GM Crops and Food জার্নালের ২০২৫ সালের ১৬ নং ভলিউমে প্রকাশিত গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, Bt বেগুন চাষে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৫,৮৪৫ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষকের অতিরিক্ত আয় দাঁড়িয়েছে গড়ে ২,২৬,৫৭৭ টাকা (প্রায় দুই হাজার ডলারের কাছাকাছি), যার ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্যের চাকা ফেরানোর স্বপ্ন বুনতে পারে। একই সঙ্গে কীটনাশক ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য হ্রাস শুধু উৎপাদন খরচ কমায়নি, বরং কৃষক ও ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমিয়েছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া প্রমাণ করে যে, জীবপ্রযুক্তি কেবল পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সরাসরি মাঠে কার্যকর ফল দিচ্ছে। Bt বেগুনের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, জীবপ্রযুক্তি কোনো বিলাসী বা ভবিষ্যতনির্ভর ধারণা নয়; এটি একটি কার্যকর অর্থনৈতিক মডেল।
দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ এবং ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানির মাধ্যমে ঔষধশিল্পে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে এই সাফল্যের পরেও উচ্চমূল্যের বায়োলজিক ও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা আমাদের অগ্রগতিকে স্থবির করে রেখেছে। অথচ জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে ইনসুলিন, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, ভ্যাকসিন এবং জেনেটিক থেরাপির মতো উচ্চমূল্যের পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সম্ভব, যা শুধু স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং অর্থনৈতিকভাবে দেশকে আরও স্বনির্ভর করে তুলবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ইনসুলিন উৎপাদনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন উৎপাদনে বিনিয়োগ শুরু করেছে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাসের পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্যতা ও স্বাস্থ্যখাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তির বিকল্প নেই।
McKinsey Global Institute-এর ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী বায়োফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের খাতে পরিণত হবে, যেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো প্রায় শূন্যের কোটায়। অন্যদিকে স্পিরুলিনা উৎপাদন পুষ্টি নিরাপত্তা ও রপ্তানিমুখী সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র হলেও শিল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। বহুবছর ধরে চলে আসা টিস্যু কালচার প্রযুক্তি এখনো জাতীয় পর্যায়ে শিল্পায়নের রূপ পায়নি। বৈশ্বিকভাবে বায়োপ্লাস্টিক, বায়োফুয়েল, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত এনজাইম এবং ফুড বায়োটেকনোলজির মতো খাতগুলোতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে, কারণ এগুলো শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, বরং উচ্চ লাভজনক। উদাহরণস্বরূপ, জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে বায়োফুয়েল এবং প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বায়োপ্লাস্টিক এখন বিশ্ববাজারে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি সংকটে বায়োডিজেলকে ‘এই মুহূর্তের সমাধান’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, ঘন ঘন বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই কৃষি, পানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এই ক্ষেত্রেও জীবপ্রযুক্তি টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের লবণাক্ততা সহনশীল বোরো ধান (BRRI dhan67) উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একইভাবে, বন্যা সহনশীল ধান (BRRI dhan52) কয়েকদিন পানির নিচে টিকে থাকতে পারে, যা আকস্মিক বন্যায় ফসলহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। এর পাশাপাশি, বায়োরেমিডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষিত পানি ও মাটি থেকে ভারী ধাতু ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করা সম্ভব।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে জীবপ্রযুক্তির একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৩০ বছর বয়স হলেও সামগ্রিক সমন্বয়ের অভাব (বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের মাঝে শীতল মিথস্ক্রিয়া ও অপ্রতুল সহযোগিতা) ও সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল না থাকায় এই খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যায়নি। প্রায় ১৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজি বিভাগ রয়েছে এবং প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার গ্র্যাজুয়েট পাশ করে বের হয়। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে কিংবা নিয়োগ বিধিমালার শর্তের কারণে সবরকম যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের বিবেচনা করা হচ্ছে না। কোনো এক অজানা কারণে ৪–৫ বারের অধিক খসড়া প্রণয়ন হলেও জাতীয় জীবপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের আওতাধীন জীবপ্রযুক্তি নীতিমালা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এতে করে ব্রেইন ড্রেইনের ঘটনা ঘটছে। সময় এসেছে নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন–বাস্তবায়ন, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জীবপ্রযুক্তি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার।
ড. মুহাম্মদ সওগাতুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক বায়োটেড
মো. মেহেদী হাসান সোহাগ, সহকারী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ড. মুনিয়া আমিন, পরিচালক এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো