পারমাণবিক সুরক্ষার জানান দেয়া সংশ্লিষ্ট দেশের সক্ষমতার প্রকাশ। আর এ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সেইসাথে এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এর ভিত্তিটা গড়তে হয় জাতীয় পর্যায়ে নিজেদেরই। পরে সেখানে যোগ হয় আন্তর্জাতিক শরীকানা। এ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে সেই ক্লাবভুক্ত হয়ে গেছে। বাকিটা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এগিয়ে চলার ওপর।
বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলে না। প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও দক্ষ হতে হয়। এর বাস্তবতা তো বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ-উত্তেজনার পরিবর্তিত রূপের মাঝেই স্পষ্ট। যা কেবল ট্যাংক, কামান, বিমান বা প্রচলিত অস্ত্রে সীমিত নয়। ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, তথ্যযুদ্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে সেখানে কামা-গোলার চেয়েও বড় ফ্যাক্টর। কোনো কোনো রাষ্ট্র তো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই তার আর্থিক ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক যোগাযোগ, জনমত ও তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে আঘাত হানছে। তাই পারমাণবিক নিরাপত্তা আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তবে, তা অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রেখে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বুধবার এ বাস্তবতার কথাই উল্লেখ করেছেন রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এমআইএসটির এক সেমিনারে। যথার্থই বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক স্থাপনা ও প্রযুক্তির সুরক্ষা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অত্যন্ত সম্পৃক্ত। সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হুমকি, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বলতা, সবকিছুই এখন পারমাণবিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থানও চমৎকারভাকে তুলে এনেছেন শামছুল ইসলাম। জানান, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল, সমন্বিত নীতিমালা এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অপরিহার্য। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে উঠে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও প্রস্তুতির কথা।
অনুষ্ঠান শেষে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত রোবটিক্স ও ড্রোন প্রকল্প পরিদর্শন করে অভিভূত হন। দেশের প্রযুক্তিগত শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এমআইএসটি। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা ও গবেষণা করছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশেও রেখেছে অনন্য অবদান। উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গবেষণামুখী কার্যক্রম এবার সরাসরি প্রত্যক্ষ না করলে তা জানার বাইরেই থেকে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম তা ঘুরেফিরে দেখেছেন। বেশ এনজয় করেছেন। সামরিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে এমআইএসটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত রোবটিক্স, ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প যত দেখেন, আর মুগ্ধ হয়েছেন। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রায় তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের এভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্রিয়াকর্ম দেখে যারপরনাই আশাবাদী হয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে গর্বের বিষয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ এ গর্বের অংশীদার। সেইসাথে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পাশাপাশি এর সর্বোচ্চ সুরক্ষার ওপর জোরও দিচ্ছে। তা একদিকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। আরেকদিকে সন্ত্রাসবাদ, সাইবার ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় যার যার দেশের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৩টি দেশে ৪০০-এর বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পের জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মতো ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তার নিশ্চয়তারই বহিঃপ্রকাশ।
পারমাণবিক কেন্দ্র পরিচালনা করা এবং তার সুরক্ষায় সক্ষম হওয়া একটি দেশের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল খাতে ব্যাপক উন্নতির প্যারামিটারের মতো। কারণ পারমাণবিক নিরাপত্তা এখন আর কোনো সাধারণ বিষয়ভুক্ত নয়, তা একটি দেশের সক্ষমতা ও নিরাপত্তার বড় মাপকাঠি।
পারমাণবিক সুরক্ষা সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং ভৌত নিরাপত্তার একটি জটিল সংমিশ্রণ। বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে এই সক্ষমতা অর্জন করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেশাদারিত্বের সাথে ভৌত নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় দায়িত্ববোধ, উচ্চমানের প্রস্তুতি এবং আন্তঃসংস্থাসমূহের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া সর্বোচ্চ পারমাণবিক সক্ষমতার অধিকারী। ভারত ১০,০০০ কি.মি. রেঞ্জের আইসিবিএম প্রযুক্তির মাধ্যমে তার প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করছে। ওড়িশা উপকূলে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম। অন্যদিকে ইউরোপে পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শীর্ষে ফ্রান্স। তাদের ভৌত নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ হুমকি প্রতিরোধ এবং জরুরি সাড়া প্রদানের সমন্বিত ব্যবস্থা বিশ্বে আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়া ১২,০০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম। এশিয়ায় পারমাণবিক কর্মসূচি বাড়লেও, বিশ্বের প্রায় ১০০টি পুরনো চুল্লি আগামী ১০-১৫ বছরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের অনেক প্রথাই ভেঙে গেছে। ধারণা ও চর্চায় এসেছে নতুনত্ব। বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলে না। প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হয়। দেশের প্রযুক্তি নির্ভর উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার গৌরবময় অধ্যায় তৈরি করবে বলে ধারণা বেশ। ধারণাটি ক্রমশ বিশ্বাসের দিকে যাচ্ছে। কেবল ডিগ্রি ধরিয়ে দেওয়া নয়, সশস্ত্র বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির শিক্ষালয়ও হতে পারে। সেইক্ষেত্রে এমআইএসটির গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ, প্রকল্প ও একাডেমিক কার্যক্রমকে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা সংস্কৃতি, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে। এ অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে পারমাণবিক সুরক্ষা নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত নীতিমালা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এ বিষয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নীতিগত প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও আরো বাড়াতে হবে। সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনের ব্যাপক সম্ভাবনার দেখা দিয়েছে। সবকিছু বিদেশ থেকে কিনে এনে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশ নিজস্ব সক্ষমতায় নকশা, পরীক্ষা, উন্নয়ন, উৎপাদন ও সুরক্ষা করতে পারে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
এই লক্ষ্যে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও গবেষণা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেকেই পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় জনগণকে সঠিক তথ্য প্রদান, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়ার আয়োজন করা দরকার।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।
বিডি-প্রতিদিন/শআ