২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হয়েছিলেন অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের লাখো নেতাকর্মী। সেই সমাবেশ থেকে পেশ করা দাবির বিষয়ে ওই সময়ের স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুরাহা না হওয়ায় সমাবেশ অব্যাহত থাকে। ৫ মে দিন গড়িয়ে রাত হলে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নাম দিয়ে এক ভয়াবহ অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে মতিঝিল-শাপলা চত্বর এলাকা বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণ অবস্থান পণ্ড করতে চালানো সেই অভিযানে হতাহতের ঘটনা আজো রহস্যাবৃত। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে পরিচালিত ওই নির্মমতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবি হেফাজতসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী, শাপলা চত্বরে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নাম দিয়ে ভয়াবহ ক্র্যাকডাউনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলায় হেফাজত ইসলামের ৬১ জন শহীদ হন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষের দিকে। শুধু ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। ৭ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হবে।
এই দিনের ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে ‘শহীদনামা’ নামের একটি জীবনী স্মারক প্রকাশ করেছে শাপলা স্মৃতি সংসদ। তাগলীবে দ্বীন ফাউন্ডেশনের সার্বিক সহযোগিতায় ও আল্লামা মামুনুল হক, শায়খ মুসা আল হাফিজ ও মাওলানা আবুল হাসানাত জালালীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই স্মারকের গ্রন্থনা ও সংকলন করেছেন আশরাফুল ইসলাম সাদ। স্মারকগ্রন্থটির চুম্বকাংশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনলাইন সংস্করণে।
‘শহীদনামা’ স্মারকগ্রন্থটি এক রক্তঝরা বাস্তবতার নীরব দলিল। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত বর্বর গণহত্যা এবং ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনে শাহাদাতবরণকারী শত শত অজানা শহীদের আত্মত্যাগ, বেদনাভরা প্রস্থান ও জীবনের ক্ষণিক দ্যুতি- এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে তাঁদের পরিচয় ও সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্তের মাধ্যমে।
গ্রন্থটি প্রয়াসের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি সংরক্ষণযোগ্য দলিল তৈরি করা, যা ইতিহাসের গহ্বরে চাপা পড়ে যাওয়া নির্মম সত্যগুলোকে সামনে আনবে। যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে, কীভাবে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, তথ্য গোপন ও ইতিহাস বিকৃতির প্রেক্ষাপটে হাজারো দেশপ্রেমিক মানুষ তাঁদের রক্ত উৎসর্গ করেছিলেন। এই গ্রন্থ শুধু নামের তালিকা নয়, এটি ইতিহাসের একটি জীবন্ত অংশ, যা আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও প্রত্যয়ের নিঃশব্দ স্ফুলিঙ্গ।
এই উদ্যোগটি তাগলীবে দ্বীন ফাউন্ডেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শাপলা স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই গ্রন্থে প্রকাশিত শহীদদের তালিকা নিঃসন্দেহে পূর্ণাঙ্গ নয়। অনেক শহীদের পরিচয় পাওয়া যায়নি, অনেকে এখনো নিরুদ্দেশ। অনেকে শহীদের মর্যাদা পেয়েছেন বটে, কিন্তু পরিবার বা সমাজে তাঁদের নিয়ে কথা বলা ভয় বা ভীতির কারণে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে আসার পরও অনেক শহীদ পরিবার এখনো ট্রমার মধ্যে আছেন। আওয়ামী জাহিলিয়াতের দমন-পীড়নে তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে সাহস পান না। কারো কারো কাছে তথ্য ছিল, কিন্তু দীর্ঘদিনে হারিয়ে গেছে।
২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে পরিচালিত যে রাষ্ট্রীয় অভিযান হয়েছিল, তা ছিল আধুনিক বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক নির্মম উদাহরণ। সেদিনের গণসমাবেশে অংশগ্রহণকারী হাজারো মানুষ রাতারাতি নিখোঁজ হয়ে যান, অসংখ্য লাশ গুম হয়ে যায়, পরিবারের সদস্যরা আর কখনো প্রিয়জনের মুখ দেখতে পাননি। কিন্তু রাষ্ট্র সেই ঘটনা গোপন রাখে, অস্বীকার করে। গণহত্যার বদলে প্রচার করা হয় ‘অপারেশন’ কিংবা ‘অভিযান’ শব্দ। অথচ তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
২০১৩ সালের ১২ মে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ মে রাতে হেফাজতের অবস্থান তুলে দিতে যে অভিযান পরিচালিত হয়, তাতে ব্যবহৃত হয় অন্তত ১ লাখ ৫৫ হাজার গোলাবারুদ। অপারেশনে অংশ নেয় ৭ হাজার ৫৮৮ সদস্য। এই সংখ্যা শুধু শাপলা চত্বরমকেন্দ্রিক; পরদিন ৬ মে ঢাকার উপকণ্ঠ কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সানারপাড়সহ অন্যান্য অঞ্চলে হেফাজত কর্মীদের হটাতে আরও প্রায় ১০ হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। হাটহাজারী ও বাগেরহাটে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও গোলাগুলি চলে। সারা দেশের ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিলে ব্যবহৃত গোলাবারুদের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে যায় বলে অনুমান।
সরকারি হিসাবে ৮০ হাজার টিয়ারশেল, ৬০ হাজার রাবার বুলেট, ১৫ হাজার শর্টগানের গুলি ও ১৫ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়। পিস্তল ও রিভলবারের ৩৫০ রাউন্ড গুলি ছাড়া আরও বহু ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়, যার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। এসব তথ্য থেকেই অনুমেয়, কত ভয়াবহ ও ব্যাপক ছিল সেদিনের হত্যাযজ্ঞ। অথচ রাষ্ট্র এখনো সেই ঘটনার স্বীকৃতি দেয়নি, তদন্ত হয়নি, বিচার তো দূরের কথা।
এই স্মারকগ্রন্থের মাধ্যমে সেই চাপা পড়ে যাওয়া কাহিনির একটি ক্ষুদ্র অংশ উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়, বরং ইতিহাসকে সত্যের আলোয় তুলে ধরা। ইতিহাস বিকৃত হলে জাতি পথ হারায়, চেতনা ভোঁতা হয়ে যায়। সত্য চাপা থাকলে তা একসময় বিস্ফোরিত হয় এবং সেই বিস্ফোরণ হয় আরও ভয়াবহ। তাই আমরা চাইনি, এই শহীদদের আত্মত্যাগ সময়ের অতলে হারিয়ে যাক। তাঁদের রক্তের ঋণ শোধ করা না গেলেও স্মরণে রাখা, সম্মানে রাখা- এটাই ন্যূনতম দায়িত্ব।
এই স্মারকগ্রন্থে হেফাজতের আন্দোলনের পটভূমি সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত বিবরণ রাখা হয়েছে। কারণ শহীদদের কথা জানাতে গেলে তাঁদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। কেবল নাম-ঠিকানার তালিকা দিলে ইতিহাস পূর্ণ হয় না; সে ইতিহাসকে অর্থবহ করতে হয় প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিজেই একদিন এই শহীদানদের নিয়ে আরও বড় ও সুসংগঠিত কাজ করবে। তখন এই স্মারকগ্রন্থ হয়তো তাদের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। কিংবা সময়ের নিরিখে এটি হয়ে উঠবে একটি প্রাথমিক খসড়া- যে খসড়া পরিপূর্ণতা পাবে ভবিষ্যতের কর্মে ও কণ্ঠে। এই ক্ষুদ্র প্রয়াসকে তেমন একটি মহতী উদ্যোগের সূচনা বলেই মনে করা হচ্ছে।
‘শহীদনামা’ স্মারকগ্রন্থটি কেবল তথ্যের সংগ্রহ নয়, এটি একটি শোকগাথা, একটি ইতিহাসচর্চার সূচনা, একটি স্মৃতিচারণ, একটি প্রত্যয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানুক- রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখনো কেউ কেউ ইতিহাস লেখে। সেই ইতিহাস লেখা হয় চোখের জল, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ আর অদম্য বিশ্বাস দিয়ে। এর আলোকবর্তিকা যেন জ্বলে থাকে প্রতিটি হৃদয়ে, প্রতিটি কালপরিক্রমায়।
[ধারাবাহিকভাবে চলবে]