পূর্ব প্রকাশের পর
বাইতুল মোকাররমে নৃশংস হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিগণ ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বিকেলেই বিক্ষোভ-মিছিল করেন। প্রায় সব স্থানেই পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুসল্লিদের সংঘর্ষ হয়। তবে বেশি খারাপ অবস্থা হয় চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ছাত্ররা বায়তুল মোকাররমের এই সহিংসতার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভূমি অফিসের সামনে সমাবেশ ও পরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ হামলা চালায় ও গুলি করে। পুলিশ নির্বিচার গুলি ছুড়লে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন ও চারজন শাহাদাতবরণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভে পুলিশ গুলি করে একজনকে হত্যা করে।
পুলিশের গুলিতে এই ৫ খুনের প্রতিবাদে ২৮ মার্চ হরতালের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। সারা দেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চলতে থাকে বিক্ষোভ। অব্যাহত এই বিক্ষোভের মধ্যেও মোদিকে নিয়ে এ দেশের শাপলাসহ বহু গণহত্যার মূল হোতা শেখ হাসিনা অনুষ্ঠান করছিল।
২৭ তারিখ হরতালের সমর্থনে সারা দেশের সব জেলায় বিক্ষোভ করে হেফাজত। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমপি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নির্দেশে পুলিশ ও ছাত্রলীগ মুসল্লিদের ওপর তাণ্ডব চালায়। দফায় দফায় হামলা চালায় ‘জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া’ মাদ্রাসায়। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও ব্যাপক সংঘর্ষ হয় হেফাজত ও আওয়ামী লীগের মাঝে। সরকার সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করে। সংঘর্ষের মধ্যে মোদি ঢাকা ত্যাগ করে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয়জনকে শহীদ করার প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা আওয়ামী অফিস ও শেখ মুজিবের মূর্তি ভেঙে দেয়। ২৮ তারিখ পুলিশের গুলিতে নিহত হয় আরও ৫ জন। হাজার হাজার পুলিশ পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। অঘোষিত কারফিউ জারি করে সরকার। আহতদের মধ্যে থেকে ২৯ মার্চ একজন ও ৩০ মার্চ একজন শাহাদাতবরণ করেন। মোদিবিরোধী আন্দোলনে মোট ২০ জন শাহাদাত বরণ করেন। আহত হন দুই সহস্রাধিক। সারা দেশে পুলিশ গ্রেপ্তার করে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ। এই আন্দোলনে চট্টগ্রামে চারজন ও বাকি ১৬ জন শহীদ হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তাই তৌহীদি জনতা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে শহীদবাড়িয়া বলে আখ্যায়িত করেন। এমপি মোকতাদির এই গণহত্যায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালে এবং ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। শাপলা চত্বরে নবীপ্রেমিক জনতার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২১ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলনে রাষ্ট্রের বেপরোয়া দমন-পীড়ন ছিল এক নিষ্ঠুর কৌশল, যেখানে মানুষের প্রতিবাদকে নিঃশেষ করার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। তবে, দুটি ঘটনার মাঝেই একটি অভিন্ন সত্তা রয়েছে মানবাধিকারকে পদদলিত করে ক্ষমতার প্রয়োগ এবং জনগণের সংগ্রামের অটল দৃঢ়তা। এ ঘটনাগুলো কেবল ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায় নয়, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং জনগণের সাহসিকতার এক গভীর লড়াই, যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শাপলা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২০১৩ থেকে ২০২১ হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের খুনরাঙ্গা ইতিহাস বেয়েই শক্তিশালী হয়েছে আধিপত্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম।
শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের অপতৎপরতা ২০১৩ সালে কার্যত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। আর ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদির আগমন দেশে ক্রমবর্ধমান ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নগ্নপ্রদর্শনী ছিল। দেশের এই ক্রান্তিকালে দুবারই শাহাদাতের রক্ত দিয়ে দেশকে রক্ষা করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। আর তাই হেফাজত ও তার বীর শহীদানের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে বাংলাদেশ।
[ধারাবাহিকভাবে চলবে]