বাংলাদেশে এখন সড়কে বের হওয়া মানেই এক অনিশ্চয়তার ভেতর যাত্রা শুরু করা। কেউ কর্মস্থলে যাচ্ছেন, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কেউবা বাড়ি ফিরছেন—কিন্তু নিরাপদে ফিরতে পারবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত মানুষের খবর যেন এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ এই মৃত্যুগুলোর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। তবু কেন থামছে না প্রাণহানি?
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ৬ হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৬০৯ জন মোটরসাইকেল আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ। পথচারী নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৩৫ জন। অর্থাৎ সড়কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন সাধারণ মানুষই।
এ পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, থেমে যাওয়া স্বপ্ন, অনিশ্চয়তায় পড়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিহতদের বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু জননিরাপত্তার সংকট নয়, এটি অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।
দুর্ঘটনার কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো—এসব বহুদিনের বাস্তবতা। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আইনের দুর্বল প্রয়োগ।
সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব খাটিয়ে শাস্তি এড়িয়ে যায়। ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর বদলে দায়মুক্তির সংস্কৃতিই আরও শক্তিশালী হয়।
রাজধানী ঢাকাও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। ফুটপাত দখল, অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা নগরবাসীকে প্রতিদিন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার অনুপযোগী বা অব্যবস্থাপনায় ভরা।
এ অবস্থায় শুধু দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। প্রথমত, সড়ক নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চালকের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা, স্পিড মনিটরিং প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল লাইসেন্স যাচাই চালু করা গেলে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে। উন্নত দেশগুলোতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহারে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। সড়কে দায়িত্বশীল আচরণ শেখাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার কিংবা পথচারীদের নিরাপদ পারাপার—এসবকে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
সবশেষে একটি সত্য স্বীকার করার সময় এসেছে—বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর কেবল দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। কারণ নিরাপদ সড়ক কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
লেখক: তামান্না মিজান
ব্র্যাক, সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি
বিডি প্রতিদিন/নাজিম