শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ জুন, ২০২১ ০০:৩১

কবিতার সাথে সারাদিন

হোসেন আবদুল মান্নান

কবিতার সাথে সারাদিন
Google News

ভাবছি, ছুটি, করোনা, লকডাউন, একাকিত্বে বসবাস, সব মিলিয়ে সত্যিই কেমন যেন এক অনিশ্চিত এলোমেলো গদ্যময় সময় অতিক্রম করে চলেছি। জীবনকে কাব্যময় করে ভাবতে পারা এত সহজ কথা নয়। এটা কেবল একজন প্রকৃত সুখী মানুষের কাজ বলেই আমার কাছে মনে হয়। তাহলে কবি কাজী  নজরুল ইসলাম কি একজন সুখী মানুষ ছিলেন? এ প্রশ্ন হয়তো অনেকের। মানুষের জীবনানন্দ, হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনার ছন্দময় এবং নানন্দিক প্রকাশ বোধকরি সবচেয়ে বেশি ঘটেছে কবিতায়। শিল্পের বহুমাত্রিক রূপ রূপান্তরের ধারায় ভাবের বহিঃপ্রকাশ কাব্যের ভিতর দিয়েই সর্বাধিক কার্যকরভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। যা মানব হৃদয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে কাল-কালান্তরে অনুরণন তোলতে সক্ষম হয়েছে।

২. আসলে মানুষের জীবনের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই কবিতা। বাস্তবে প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো দুঃখ কষ্ট নিয়ে অতিবাহিত করে যায় তার যাপিত জীবন। আর এ থেকে পরিত্রাণ বা মুক্তির বড় উপায় হলো সারাক্ষণ স্বপ্নের মধ্যে বসবাস করা।  কবিতায় প্রকাশিত ভাষাই স্বপ্ন। স্বপ্নময় শব্দের অনুপ্রাস সমষ্টিই

হলো কবিতা। যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, আন্দোলিত করে, অনুভূতিশীল ও সংবেদনশীল করে তুলে নিমিষে।  কবি আল মাহমুদ এক নিবন্ধে বলেছেন, ‘যে ভাষা বা শব্দের বিন্যাসে ছন্দ নেই, গন্ধ  নেই, ভাব নেই, নেই ঈশ্বর, নেই প্রকৃতি-প্রেমহীন উপমার চিত্রকল্পের পঙক্তিগুলো মানে কবিতা নয়।’

৩. তবে কবিতা সবসময় সরাসরি কথা বলে না, যা পাওয়া যায় গদ্যে। ভাষা, ছন্দ বা তালকে বৃত্তাবদ্ধ করতে গেলে কবিকে কম-বেশি অক্ষরের খেলায় মেতে থাকতে হয়। এ খেলার নিয়মরীতি জানাও অপরিহার্য। যারা এসব মানে না তাদের গন্তব্যের সীমানা অদূরেই মিলিয়ে যায়। কাব্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তারা অকবিদের দলভুক্ত বা ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’র কাতারে আসন পান। তবে সকল কবিতা একই মাত্রায় সুখপাঠ্য, বোধগম্য ও স্থায়ী নয়। কখনো কখনো কবিতা হয়ে উঠে কঠিন দুর্বোধ্য এবং পাঠদুরূহ। বাহ্যিক আঙ্গিকে এসব কবিতাকে মনে হবে অক্ষরবৃত্তের ভেতরে বা ছন্দের টানে বেশ অর্থবোধক (সবধহরহম ভঁষষ) কিন্তু না পরক্ষণেই পাঠককে কিছুটা সংশয়াচ্ছন্ন ও ধন্ধিত করে তুলবে। এ ধরনের কাব্যের সুর ও আমেজ খুব ক্ষণস্থায়ী হয়। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ভিন্ন কথা, 

‘কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে, বুঝিলাম না, তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুঁকিয়া বলে, কিছু বুঝিলাম না, তাহাকে এই কথা বলিতে হয়, ইহাতে বুঝিবার কিছু নাই, এই যে কেবল গন্ধ’।

৪. কবিতার কাছে ফিরে যাওয়া, কবিতা বলা, পাঠ করা বা আবৃত্তি করাও একটি অতি জনপ্রিয় মাধ্যম।

আবৃত্তির কলাকৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান নিয়েও এখন সর্বত্র অনেক কাজ হচ্ছে। এটি একটি প্রকাশ বা উচ্চারণের শৈল্পিক কথোপকথন শিল্প। গানের বাণী যেমন সুরের মূর্ছনায় শিল্পীর কণ্ঠে মুক্তো ঝরায়, কবিতার পঙক্তিমালাও কণ্ঠ বিশেষে হিরম্ময় ব্যঞ্জনায়

শ্রোতার হৃদয়ে স্পর্শ করে যায় এবং কবিতার ভালো শ্রোতারাই কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক। যথার্থ পাঠে তার অক্ষমতা জেনেও সে নিয়মিত পাঠক এবং কবিতানুরাগী। এ ক্ষেত্রে কবিরা অনেকটা গীতিকারদের মতন, গান লিখে দিয়ে চলে যান অদৃশ্যে, যা পরবর্তীতে নানা সুরে, লয়ে ও তালের মাধুর্যে গীত হচ্ছে। আবার এ গান কারও কারও হৃদয়ে ঝড়ও তুলছে। কবিরা সচরাচর ভালো আবৃত্তি করেন না। অর্থাৎ স্বরচিত কবিতার পাঠকপ্রিয়তা কম।  রপ্রন্দ্রনাথ, নজরুল, মাইকেল বা জীবনানন্দই এর প্রমাণ। অথচ তাদের রচিত কবিতাগুলোই আবৃত্তির বদৌলতে কণ্ঠশীলনের মাধ্যমে দুনিয়াব্যাপী জনপ্রিয় এবং কালোত্তীর্ণ হয়ে বেঁচে আছেন। 

৫. কবিতার শক্তি, কবিতার প্রাণ বা কবিতার বর্ণমালা কত সাহসী ও কালোত্তীর্ণ তা বোঝা যায় দু-একটি নমুনা থেকে।

ক. ‘শুন হে মানুষ ভাই,

সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই।’

কবি চ-ীদাসের এমন একটি চরণের মর্মার্থ বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষের অন্তহীন জয়গান গাওয়া হচ্ছে। সভ্যতা বিনির্মানে এর প্রভাব  যে কত ভাবা যায়? মনে হয়, মর্ত্যরে জীব হিসেবে যতকাল মানুষ অস্তিত্ববান ততকালই এ গান বর্তমান।

খ. ‘যে সবে বঙ্গে ত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

চট্টগ্রামের কবি আব্দুল হাকিম-এর এ কালজয়ী দুটো লাইন উচ্চারণ করার পর মাতৃভাষা, মাতৃভূমি আর স্বদেশপ্রেম নিয়ে বেশি কিছু বলার থাকে কী?

মাতৃভাষা দিবস আন্তর্জাতিক বা দেশের মধ্যে যেভাবেই উদযাপন করা হোক না কেন এর চেয়ে শক্তিশালী পঙক্তিমালা মেলা ভার। শতাব্দীর অধিক কালব্যাপী এটাই সত্যে উপনীত হয়েছে।

গ. আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সময় কাব্যিক ও শ্রুতিমধুর স্লোগানগুলোর কথা স্মরণ করলেও আমরা মহাশক্তিমান কবিতা খুঁজে পাই। যেমন-

‘তোমার আমার ঠিকানা

পদ্মা মেঘনা যমুনা।’

মনে হয়, নিতান্ত সহজ সরল কারও উক্তি। অথচ লক্ষ-কোটি মানুষের মননকে বা ব্যক্তিক-চেতনা ও বিবেককে জাগ্রত করে জন্মভূমির প্রতি শপথ নিতে অভাবনীয়ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমরা সময়ের রথে ইতোমধ্যে অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত। তবু যেন এই বাণীতে অতুলনীয় দেশপ্রেমের এক সুপ্ত মুগ্ধমন্ত্র লুকিয়ে আছে।

৪. আজ আমি ক-জন অমর কবির কাছে ফিরে যেতে চাই-তাদের চেনা জগতের সাথেই আমাদের বসবাস।

‘ধন্য সেই পুরুষ যার নামের ওপর পাখা মেলে দেয়

জ্যোৎস্নার সারস,

ধন্য সেই পুরুষ যার নামের ওপর পতাকার মত দুলতে থাকে স্বাধীনতা।’

-ধন্য সেই পুরুষ, শামসুর রাহমান।

‘সেখানকার নদী কি এমনি মধুমতি?

মাটি কি এমনি মমতা মাখানো?

ধান কি এমনি বৈকুণ্ঠ বিলাস?

সোনার মতো ধান আর রুপোর মতো চাল?

বাতাস কি এমনি হিজল ফুলের গন্ধভরা, বুনো বুনো, মৃদু মৃদু?

মানুষ কি সেখানে কম নিষ্ঠুর, কম ফন্দিবাজ, কম সুবিধে খোর?’

-উদ্বাস্তু, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত।

 

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন।’

-বনলতা সেন, জীবনানন্দ দাশ।

 

‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম

চির মনোরম চির-মধুর।

বুকে নিরবধি বহে শতনদী

চরণে জলধির বাজে নূপুর।’

-বাংলাদেশ, কাজী নজরুল ইসলাম।

 

‘নমো নমো নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!

গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।

অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি,

ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো  ছোটো গ্রামগুলি।’

-দুই বিঘা জমি,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

চলমান গদ্যময় সময়ের খেরোখাতা থেকে তুলে আনা সামান্য কাব্যবিলাস যদি কারও মনোজগতে ঈষদুষ্ণতা ছড়াতে পারে তাই হবে আমার যথার্থ নিবেদন। আর ছুটির দিনের যথাযথ মূল্য পরিশোধ করাও যে সকলের দায়।