খুব নিস্তব্ধ আজকের রাত। কটা বাজতে পারে কিংবা এখন কয় প্রহর, তা যেমন ধারণা করা যাচ্ছে না, তেমনি বুঝতে পারার কোনো উপায় নেই-বাইরের প্রকৃতিটি কেমন! গরমকালের এ সময় প্রকৃতি একেবারে নিথর থাকতে পারে। কিন্তু এ রাত সে রাত নয়, এ রাত হচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকারের চেয়েও ভয়াবহ। এখন প্রায় রাতেই আকাশ গুড়ুম গুড়ুম শব্দে কাঁপে কিংবা দেখা যায় খাকি পোশাকের ভীতিকর টহল। যা এখন মানুষের জন্য আতংকের বিষয়। এই সময়ে দিন আর রাতকে একই আবর্তের ক্ষণ মনে হয়। যেখানে মানুষের জীবনযাপন, আশা-নিরাশা সর্বদাই কম্পমান থাকে।
তখন আমি সদ্য কিশোর। ঘরের অন্ধকারে গুমোট আবহ ভেদ করে কিছু ফিসফাঁস কথা শোনা যাচ্ছে। পাশের ঘরে আব্বা-আম্মার ফিসফিসানি কিছুটা আমি ঠাহর করতে পারি।
আব্বা বলেন, ‘তোমাকে আমি বোঝাবার অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু তোমার কোনো রেসপন্স পাচ্ছি না কেন?’
আম্মা জবাব দেন, ‘আমি কী বলবো! দেশের যে অবস্থা, সেখানে আমরা তো কেউই নিরাপদ না।’
আব্বা বলেন, ‘আমি বাজারে গেলেও খাকি ফোর্স পিছনে লাগে। আমাকে ফলো করে।’
-আমি সেদিন পাশের বাড়ির ভাবির কাছ থেকে পানসুপারি ধার আনতে গিয়েছিলাম। রাস্তায় কিছু বাঙালিই আমাকে উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে। ‘এরা কারা?’- আম্মা জিজ্ঞেস করেন।
-আস্তে কথা বলো, এরা রাজাকার। আর্মির দোসর।
-তাহলে এখন আমরা কী করব?
-জিনিসপত্র, বিশেষ করে কাপড়চোপড় কিছু গুছিয়ে ফেল। সকাল হলেই আমরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেব। আমি অফিসে যাচ্ছি না। তাতেও সমস্যা। তাই এভাবে আর চলা যাবে না। সেটা ঠিকও হবে না।
ভোরের সূর্য তখন কেবলই লাল আভা ছড়াচ্ছে। আমরা শহরের বাসা থেকে বের হলাম। আমরা মানে আব্বা-আম্মা, ছোট তিন ভাই এবং আমি। মেইন রোডে উঠে দেখি পুরো এলাকা নীরব। রাস্তায় একটা কুকুর পর্যন্ত নেই! বেশ কিছু সময় অপেক্ষার পর দুটি রিকশা পেলাম। মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে রিকশা আর ঘোড়া বা গরুর গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো বাহন দেখা যেত কদাচিৎ। আমি আর আব্বা প্রথম রিকশায় উঠলাম। আমার কোলে দেড় বছর বয়সি ছোট ভাই শোয়েব। আর পিছনের রিকশায় আম্মা, ছোট দুই ভাই শাহীন, সাহনূর। তখন মে মাসের প্রথম সপ্তাহ।
ময়মনসিংহ শহরে রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে আসতেই হঠাৎ এক বিকট আওয়াজে থামতে হলো। আমাদের সামনে-পিছনে খাকি পোশাকে পাকিস্তানি সেনা। একজন জোরে ধমকে উঠল, ‘ঠেরো, আপ কিধার যাতা হ্যাঁয়?’
আব্বা উত্তর দিলেন, ‘হামলোগ গাঁওকা ওয়াতন ম্যায় যাতা হু।’
-ওয়াতন কাঁহা হ্যাঁয়
-ভালুকা ম্যায় হ্যাঁয়।
আর্মি আব্বাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুম মুসলমান হুঁ?’
উত্তর দেওয়ার পর কালেমা বলতে বললে আব্বা উচ্চস্বরে কালেমা বলেন, আমরা নিষ্কৃতি পাই।
আর. কে মিশন রোড এলাকার ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছার পর আরেক পরিস্থিতি। গুলির খোসা, ভাঙা ইট-পাথর, লোহার পাত এবং কাচের ভাঙা বোতলের ছড়াছড়ি এখানে-সেখানে। মনে হয় এখানে হানাদার সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া একপ্রস্থ এর মধ্যে হয়ে গেছে। পুরো বাসস্ট্যান্ডে একটি মাত্র বাস। তাও মুড়ির টিন মার্কা। দরোজা ভিতর থেকে বন্ধ। ড্রাইভার তার সিটে বসে পা হুইলের ওপর তুলে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। পিছনের সিটে হেলপার বিড়ি ফুঁকছে। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর হেলপার খুব বিরক্ত হয়ে গেট খুলে দিলে আমরা উঠে বসলাম।
আব্বা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, বাস কখন ছাড়বা?
ড্রাইভার জবাব দিল, ‘এইডার কোনো টাইম নাই। পরিস্থিতি বালা না। কাইল রাইতে এইহানে পাক আর্মি আর মুক্তিযোদ্ধার লগে গন্ডগোল-গোলাগুলি অইছে।’ দুই হানাদার মরছে।
-তবু তোমরা যাবে তো?
-অপেক্ষা করুইন, দেহা যাউক।
পরিবেশ-পরিস্থিতি এখন খুব প্রতিকূলে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হইছে। এর মধ্যে অনেক মানুষই বাড়ি-ঘর ছাড়ছে। তারা ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধ করছে।
আল্লাহর রহমতে দীর্ঘক্ষণ পরে হলেও, অল্পকিছু যাত্রী নিয়েই আমাদের গন্তব্যের যাত্রা শুরু হয়। এমনিতে ধীরগতিতে চলছে মুড়ির টিন বাস, তার ওপর ঘনঘন আর্মির চেকিংয়ে পড়তে হয়।
সন্ধ্যার দিকে আমরা মামার বাড়ি পৌঁছলেও, সেখানে মহা বিব্রতকর পরিবেশ। মামাদের আত্মীয়-স্বজনের কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে গেছে। আবার একটি পক্ষ আল-বদর, আল-শামস্ কমিটির নামে এলাকায় খবরদারি করছে। আতংক ছড়াচ্ছে। রাতে আমাদের যত্ন-আত্তি পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো এক বিভীষিকায় পড়তে হলো। মামাদের গ্রামের আল-বদর গ্রুপ আমাদের নানা জেরায় ফেলল। শহর থেকে যে আমরা এলাম, তো কী বার্তা নিয়ে এসেছি? মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর দিতে পারব কিনা! কেউ কেউ আব্বাকে হাজারটা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাল।
একজন বলে উঠল, ‘মিয়া সাহেব, আপনি তো সরকারি চাকরি করেন। তাহলে চাকরি রেখে এখানে খুঁটি গাড়তে এসেছেন কেন? উদ্দেশ্যটা কী?’
বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন যুুক্তিহীন প্রশ্নের কী জবাব দেবেন। আব্বা! তার নীরবতাকে আবার অনেকে সন্দেহ করে বসল।
আরেকজন বলল, ‘ঐ মিয়া? আপনে কী মুক্তিযুদ্ধে যাওনের লাইগ্যা বউ-পোলাপানরে এইখানে রাইখ্যা যাইতে আইছুইন?’
আব্বা বললেন, ‘দেখুন, শহরের অবস্থা ভালো না। প্রতিদিনই গোলাগুলি হয়। বাসায় বাসায় তল্লাশি করে আর্মিরা। এ অবস্থায় আমরা কারও সাতে-পাঁচে যেতে পারি না। তো কী করব?’
একজন বলে, ‘আপনের বাসায় তল্লাশি অইলে তো আপনে অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধাগরে আঙ্গর খবর পাচার কইববেন, কন হাঁচা কিনা?’
এ কথার কী জবাব দেবেন আব্বা? বলেন, ‘বিপদে পড়ে আত্মীয়দের এখানে এসেছি। আপনারাও এ গ্রামেরই মানুষ। এমন সম্ভাষণ পেলে তো কেউ স্বস্তিতে থাকতে পারবে না।’
কয়েকজন চিল্লিয়ে বলে, ‘অত কথার দরকার নাই, কাইল সকালে অন্যহানে চইলা যাইবান কইলাম। নাইলে কপালে খারাবি আছে।’
এরপর আর এখানে থাকা যায় না! মামা আমাদের নিয়ে রাতেই তাদের বছর-চুক্তির কামলা আলামতের বাড়িতে রেখে গেলেন। সেখানে অনেক কষ্টে পড়া গেল। পানি আছে তো জগ নেই। চাল আছে তো ডাল নেই। রাতে চাল ভাজা করে আম্মা আমাদের খাওয়ালেন। সকালে এখানে আরেক পরিস্থিতি দেখতে পেলাম। প্রায় বাড়ি-ঘরই পুরুষশূন্য। পুরুষরা মুক্তিযুদ্ধে গেছে। নারীরা বেহাল অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রটি নারীদের ওপর কুনজর দিচ্ছে! এ বাড়ির কর্তা আলামত মুক্তিযুদ্ধে গেছেন- এ অবস্থায় আমরা এখানে থাকলে সমূহবিপদের আশঙ্কা।
আলামতদের বাড়ি থেকে এবার আমাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে আমরা একটু ঘুরপথে রওনা দিলাম। কারণ সহজ পথের বেশ কয়েক জায়গায় নাকি পাকিস্তানি সেনারা অবস্থান নিয়েছে। ঘুরপথে দেখা দিল আরেক বিড়ম্বনা। এই এলাকার নামকরা নারাঙ্গীর পুল কয়েকদিন আগে আর্মিরা ডিনামাইটে উড়িয়ে দিয়ে গেছে। নারাঙ্গী একটি ছোট নদী। কিন্তু ভরা বর্ষার বর্তমান আবহে টইটম্বুর হয়ে আছে। আমার কোলে বরাবরই ছোট ভাই শোয়েব থাকে। আব্বার হাতে কিছু বোঝা থাকায় আম্মা ছোট দুই ভাই শাহীন আর সাহনূরকে সামলান।
নদীর পারে একরকম দৈবক্রমেই একটি কলার ভেলা একটি গাছের সঙ্গে আটকে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলাম। সেই ভেলায় চড়ে পর্যায়ক্রমে আমরা ওপারে পৌঁছাই। সেখানে কোনো যানবাহন না পাওয়ায়, প্রায় সাত মাইল আমাদের বাড়ির পথে হাঁটতে হবে। কী আর করা! আমরা হেঁটেই রওনা দিলাম। যুদ্ধকালীন এ সময়ে শহরের চেয়ে গ্রামীণ পরিবেশ আরও কঠিন।
দূরে একটি পুকুর ঘাটে কিছু লোকের জটলা দেখে আমরা উৎসুক হয়ে সেদিকে গেলাম। লোকজনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা। কিছু লোকের তর্ক-বিতর্ক চলছিল। আমরা কাছে যেতেই তাদের সহানুভূতি পাওয়া গেল।
ভিড়ের মাঝের একজন বলে-দেশের এই টালমাটাল অবস্থায় আপনারা কেমনে বাড়ি ছাড়লেন? বাচ্চা-কাচ্চা নিয়া বিরাট ঝুঁকি নিয়া ফালাইছেন না?’
আব্বা বললেন, ‘কয়েকদিন আগে থেকেই আমরা শহর ছাড়া। আজ এখানে, কাল ওখানে করে দিনাতিপাত করছি। কিন্তু এখানে জটলা কেন?’
-একজন বলেন, ‘আর কইয়েন না, আঙ্গর ভাতিজা মুক্তিযুদ্ধে গেছে। কই আছে। কেউ জানে না। এর মইধ্যে রাজাকাররা কেমনে জানি খবর পাইছে ঈমান আলী বাড়িত আইছে। এই ভুয়া খবরেই রাজাকাররা আর্মি লইয়া গত রাইতে এলাকা চইষ্যা গেছে।’ আর যা করছে তা এই নারী-শিশুদের সামনে বর্ণনা করা যাইবো না। ইবলিসের দল!
আব্বা বললেন, ‘আপনারা সাবধানে থাকবেন!’
এবার আমরা আমাদের গ্রামের পথ ধরলাম। আমাদের গ্রামে প্রায় সবার ঘরই মাটির। চালা ঘর অথবা ছনের ঘর। বাড়িতে কোনো বয়স্ক পুরুষ নেই। শিশু, বাচ্চা ছেলে ছাড়া। এর কারণ হলো- আব্বার আপন বড়ভাই, আলতাব জ্যাঠা ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর হঠাৎ এক রাতে বাড়ির সবার সঙ্গে দেখা করেন অল্প সময়ের জন্য। তার কাঁধে স্টেনগান, আর কোমরের থলিতে গ্রেনেড ছিল। তখন জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সেক্টরে শামিল হয়েছেন আলতাব জ্যাঠা। এ তো খুব সাংঘাতিক ব্যাপার! আমরা গর্ববোধ করলাম। কিন্তু ভয়ও জাগলো রাজাকার বাহিনীর কাছে খবর গেলে, গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে হানাদার বাহিনী। আব্বা খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুধু আমাদের কথা ভেবে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেননি। এ আফসোস তার সারা জীবনের।
আমাদের গ্রাম টিলা আর লাল মাটির। তখনকার চালের সঙ্গে লাল মাটির ছোট কণার মিশেল থাকত। ভাত খেতে গেলে লাল মাটির কণা দাঁতে লাগে। কিচমিচ করে। কষ্ট হলেও তাই গিলতে হয়। কারণ, এর কোনো বিকল্প নেই। যুদ্ধদিনের শেষ সময়ে মানুষের মনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। কী হয় না হয়! দেশ কি স্বাধীন হবে?
এই অস্থির সময়ের মধ্যে একদিন খবর এলো, ধলিয়া হাই স্কুলের সামনে হানাদার বাহিনী তাঁবু গেড়েছে। তারা যে কোনো সময় আসতে পারে। আব্বা আমাদের বাড়ির সবাইকে উল্টোদিকে শুকনির বিলের কাছে নিয়ে গেলেন। বিলের পাড়ে বিশাল বিস্তৃত পাট খেত। তখন পাট গাছ বেশ লম্বা হয়েছে। আমরা পাট খেতের ভিতরে লুকিয়ে থাকলাম।
হঠাৎ বিলের অন্য পার থেকে বিকট গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ হলো। আমরা চমকে কুঁকড়ে গেলাম। ব্যাপার কী! হানাদার বাহিনী এখানে এসে গেল নাকি? খবর অনুযায়ী তো এখান থেকে ধলিয়া হাই স্কুল এক মাইল দূরে। তাহলে কী আমরা ভুল খবর পেয়েছিলাম! হতে পারে। আমরা সবাই পাট খেতে মাটির সঙ্গে একবারে লেপ্টে গেলাম। এ অবস্থায় দূর থেকে দেখতে পেলাম- আমাদের বাড়িঘরসহ পুরো গ্রাম যেন জ্বলছে। দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের লেলিহান শিখা অনেক ওপরে লাল সূর্যের আকার ধারণ করেছে। যার রশ্মি চারদিকে আগুনের ফুলকি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা পাট খেতের সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আছি। যেন অগ্নিকুণ্ডটি লাল সূর্য আর তার নিচে সবুজ ঘাসের গালিচায় একটি সদ্যোজাত স্বাধীন সত্তা উঁকি দিচ্ছে!