মানুষের কথাই তো সাহিত্য। প্রয়োজন শব্দের যথাযথ চয়ন এবং বাক্যের সুনিপুণ গাঁথুনি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো আমাদের চট্টগ্রামও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ অঞ্চল। শিক্ষাদীক্ষায়, জ্ঞানে- প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম অনেক বরেণ্য সাহিত্যিকের জন্ম জনপদ। এই অঞ্চলের সাহিত্যের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯১৬ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে ২৩ জন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যের যে সাড়ে ছেচল্লিশটি চর্যা আবিষ্কার করেছিলেন, তা-ই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। পণ্ডিতদের মতে, চর্যাগুলো রচিত হয়েছিল নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে উল্লেখ আছে (১৯৭৩ : পৃ. ৬৯) ১৬ সংখ্যক বৌদ্ধ গানের কবি মহীধর বা মহিল ‘গুরুর সহিত চাটিগাঁয়ে গিয়েছিলেন’, আর তাঁর গুরু ছিলেন সুবিখ্যাত সিদ্ধাচার্য কানুপা, যাঁর সর্বাধিক সংখ্যা চর্যা (১৩টি) শাস্ত্রী আবিষ্কৃত সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং যিনি অন্তত ৫৭টি ছোট-বড় পুস্তকের প্রণেতা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
এতেই প্রতীয়মান হয় যে, চট্টগ্রামে সে সময়কার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাঁদের চট্টগ্রামে টেনে এনেছিল।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখ মহান জ্ঞানসাধকদের প্রচুর পুঁথি সংগ্রহ কাজের সুবাদে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের যেসব নিদর্শনের সন্ধান আমরা এ যাবৎ পেয়েছি, তাতে চট্টগ্রামের ভূমিকা ও অংশীদারত্ব দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। মনে হয়, বাংলা সাহিত্যচর্চায় মধ্যযুগে চট্টগ্রাম যেন সারা বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে। মধ্যযুগ বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত ড. আহমদ শরীফের অনুসরণে বলা যায়, ‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের রচনা বলতে প্রায় সবটাই তো চট্টগ্রামের দান।’
“কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যকণা কবিতা; যে কবিতা শুনতে জানে না, সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।” চট্টগ্রাম কবিতার শহর। কবিতার প্রতিটি শব্দ কথা বলে পাঠকের সঙ্গে। স্নিগ্ধ কবিতার কবিরাও ঋদ্ধ। শব্দ চয়নে, বাক্য গঠনে অনেক আন্তরিক। তাই তো চট্টগ্রামের কবিদের কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে ঈর্ষণীয়। ২০২৫ সালে খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত হয়েছে- প্রাণ-প্রকৃতির কবি হোসাইন কবিরের নির্বাচিত প্রবন্ধ, প্রেমের কবি শুক্লা ইফতেখারের একান্নবর্তী আকাঙ্ক্ষা। কবি শুক্লা ইফতেখার মূলত ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক। এ পর্যন্ত তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সম্পর্কের স্বরলিপি (২০২০), দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন (২০২২) উল্লেখযোগ্য। কবি হোসাইন কবির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কবিতা ভালোবাসার অঙ্গন। ইতোমধ্যে তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে- ও মাটি ও শূন্যতা, ডাহুক এখনো ডাকে, সাঁকোর নিচে শান্ত জল, অগ্নিজলে সুগন্ধ শরীর উল্লেখযোগ্য। কবি ও শিশুসাহিত্যিক আইউব সৈয়দের ছড়ার বই ‘দুই কন্যার ছড়া’ এবং চেনা-জানার ছড়া খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত অভীক ওসমানের ‘গুরুদক্ষিণা’ অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র অভীক ওসমান সিটি করপোরেশন প্রদত্ত সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কবি, অনুবাদক মুজিব রাহমানের অনুবাদগ্রন্থ ‘সমুদ্র ও সৈকত’ গ্রন্থটি তৃতীয় চোখ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক। এ ছাড়াও কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মহীবুল আজিজের কবিতার বই ‘এইসব লাল দিন’ এবং The Art of Emergency প্রকাশিত হয়েছে। আপন আলো থেকে কথাসাহিত্যিক আজাদ বুলবুল রচিত “চাকমা গালি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ” শামসুদ্দীন শিশিরের “বাংলাদেশের অসমীয়া”, “তৃণমূলের শিক্ষার প্রসার ও সংকট”, “লেখক কোষ” প্রকাশিত হয়েছে। আজাদ বুলবুল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত গুণীজন। তিনি ‘হালদা’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। দ্বিমত থেকে কবি জিললুর রহমানের কাব্যগ্রন্থ “যথা নির্দেশ উপুড় হয়ে আছি” কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ রচিত কাব্যগ্রন্থ “সম্পন্ন সাম্পান”সহ অর্ধশত গল্প কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রামের নারীরাও কবিতা সৃষ্টিতে সমান এগিয়ে। কবি মর্জিনা আক্তার, কবি লিপি বড়ুয়া, কবি রুনা তাসনিমা, কবি তহুরুন সবুর ডালিয়া, কবি শিউলি দাশ, কোহিনূর সাকী, কোহিনূর আক্তার ডেইজি, কবি রেহেনা মাহমুদ, কবি সুবর্ণা দাশ মুনমুন, কবি রহিমা রউফ, কবি নিশাত শিরিন প্রমুখ। কবিতার আড্ডা হয় নগরের নানান জায়গায়। উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো- চট্টগ্রাম একাডেমি, চেরাগীর মোড়, মাসিক আন্দরকিল্লা আড্ডা, খড়িমাটি আড্ডা, দি এড কমিউনিকেশন, শিল্পকলা প্রাঙ্গণ, বলাকা আড্ডা ইত্যাদি।
‘বাতিঘর’ চট্টগ্রামে বনেদি সাহিত্য-আড্ডার একটা জমজমাট স্থান। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবি-সাহিত্যিকরা চট্টগ্রামে গিয়ে- একবার বাতিঘরে যাবেন না; ভাবা যায় না।
কবিতা আবৃত্তিচর্চায়ও বেশ এগিয়ে চট্টগ্রাম। রয়েছে- প্রমা, ক্বণন, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বোধন, উচ্চারক ইত্যাদি সংগঠন। আমার জানা মতে, দুটো লিটল ম্যাগাজিন ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে। খড়িমাটি থেকে অণু “বিবাহ” সংখ্যা এবং আপন আলো থেকে কথাকোবিদ “ভাত” সংখ্যা। প্রবন্ধ সাহিত্যের লেখকদের মধ্যে রয়েছেন- হরিশংকর জলদাশ, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, ওমর কায়সার, অঞ্জন নন্দী, আজাদ বুলবুল, মাঈনুদ্দীন জাহেদ, আরমানোজ্জামান, মোহাম্মদ ইসহাক, ফরিদ উদ্দীন ফারুক, জিললুর রহমান, নাসের রহমান, মহীবুল আজিজ, সুভাষ দে, রাশেদ রউফ, আবু মোশাররফ রাসেল, আনোয়ারা আলম, ইলিয়াস বাবর প্রমুখ। নাটক চর্চায় চট্টগ্রামের বেশ নাম আছে। বছরজুড়ে শিল্পকলা একাডেমি বা থিয়েটার ইনস্টিটিউটে নাটক মঞ্চায়ন হয়। এবং আগ্রহী দর্শকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। নাট্যদল-প্রতিনিধি, নান্দীপাঠ, কথা সুন্দর। নাটকের সঙ্গে জড়িত অনেকের মধ্যে সঞ্জীব বড়ুয়া, জাহেদুল ইসলাম, ইউসুফ ইকবাল দীপু, প্রদীপ দেওয়ানজী, কুন্তল বড়ুয়া, সুচরিত, ম সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রাম বেতার এবং টেলিভিশনেও নিয়মিত সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা, আড্ডা চলে। ফেসবুকেও সাহিত্যের আলোচনা, পর্যালোচনা সমানতালে চলছে। চট্টগ্রামের সাহিত্য সেবায় প্রকাশনাগুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বই প্রকাশ ও প্রচারণায় বছরজুড়ে ব্যস্ত থাকে। এখানকার লেখকদের অনেকেই নিয়মিত জাতীয় পত্র-পত্রিকাগুলোতে লিখছেন। হরিশংকর জলদাস, ওমর কায়সার, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, আইউব সৈয়দ, ময়ুখ চৌধুরী, অমল বড়ুয়া, উৎপল বড়ুয়া, নিযামুদ্দীন, শ্যামল কান্তি দাস উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্যে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন রাশেদ রউফ, হরিশংকর জলদাস, ওমর কায়সার, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, হাফিজ রশিদ খান, সুকুমার বড়ুয়া প্রমুখ সাহিত্যিক। এঁদের অনেকেই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন- আজাদ বুলবুল, শামসুদ্দীন শিশির, আনোয়ারা আলম, খোরশেদ আনোয়ার, ওভীক ওসমানসহ অনেকে। আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোতে সাহিত্যের পাতা প্রকাশিত হয়। তবে দৈনিক আজাদী এবং পূর্বকোণ তাদের পূর্বের গৌরব ধরে রাখতে পারেনি। আমি মনে করি, সাহিত্যের পাতা প্রকাশে আরেকটু আন্তরিক হলে কলেবর বাড়ালে আগামী প্রজন্ম নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে। দৈনিক সুপ্রভাত এবং দৈনিক পূর্বদেশ সাহিত্যের পাতা সমৃদ্ধ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গবেষণা সাহিত্যেও চট্টগ্রাম অনেক দূর এগিয়েছে আঞ্চলিক ইতিহাস, মসজিদ, মন্দির, বিহার, গির্জা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মহান ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম, শিক্ষাবিষয়ক খুঁটিনাটি, ভ্রমণ সাহিত্য ইত্যাদি লেখায়- হারুনুর রশিদ, মুস্তফা নঈম, শামসুল আরেফিন, জাহেদ মোতালেব, জামাল উদ্দিন, শামসুল হক, শিমুল বড়ুয়া, নোমান উল্লাহ বাহার, সোহেল মো. ফখরুদ্দিন, অমল বড়ুয়া, কাঞ্চন মহাজন, নাসির উদ্দীন হায়দার প্রমুখ। ছড়া-সাহিত্যেও এ জনপদ বেশ ঋদ্ধ। ছড়া লেখায় পারদর্শী রয়েছেন- রাশেদ রউফ, তালুকদার হালিম, আহসানুল করিম রিটন, আনোয়ারুল হক নূরী, সুকুমার বড়ুয়া, মিজানুর রহমান শামীম, আখতারুল ইসলাম, কাজী সাইফুল হক, বিপুল বড়ুয়া, অমিত বড়ুয়া, জসীম মেহবুব, ইসমাঈল জসীম প্রমুখ। রম্য সাহিত্য রচনায় সত্যব্রত বড়ুয়ার নাম সর্বাগ্রে।
উল্লিখিত আলোচনার বাইরেও বহু লেখক সাহিত্যচর্চা করতেন বা এখনো করছেন। তবে কয়েক শ বছর আগে থেকে চট্টগ্রামে সাহিত্যের নান্দনিক বিকাশ এ অঙ্গনকে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের পথ মসৃণ হবে। তবে সে জন্য সাহিত্য আড্ডা, সাহিত্য চর্চা, সাহিত্য প্রতিযোগিতা, সাহিত্য নিয়ে গবেষণাকর্ম, নাটক মঞ্চায়ন বহুগুণ বাড়াতে হবে। তরুণদের রুচিশীল সাহিত্যকর্মে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তরুণদের এসব আয়োজনে দায়িত্ব দিতে হবে।