জামাল খন্দকার নিজকে মিতব্যয়ী বললেও, লোকে বলে হাড়কিপটে। শুধু পাড়াপড়শিরা নয়, নিজের ঘরের মানুষও তার কিপটেমিতে বিরক্ত। রান্নাঘরে বউ গরম তেলে সবজি ঢালবে, খন্দকার বলে, ‘এত তেল দিতে হয় সবজিতে! দু-চামচ তুলে নাও, তারপর সবজি ঢালো।’ মেয়ে একজোড়া সালোয়ার-কামিজ চাইলে বলে, ‘তোমার না দু-জোড়া আছে। আগে ওগুলো ছিঁড়ুক, তারপর দেখা যাবে।’ রাস্তাঘাটে ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইলে বলে, ‘টাকা কি গাছের গোটা, পেড়ে পেড়ে দেই! যা যা, সর সর।’ হাটে মাছ কিনতে যায়, শাকসবজি নিয়ে বাড়ি ফেরে। তাও আবার পচাধচা। বউকে বলে, ‘জাউলারা এমন বজ্জাত হইছে, দাম দশ টাকাও কমায় না।
শাকসবজি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।’ নিজের গায়ের জামাটির রং চটে গেছে কবে। লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে দিয়ে পরে। অথচ জামাল খন্দকার গরিব নয় মোটেই। অনেক বিঘা চাষের জমি। গোয়ালে গরু। বাড়িতে দু-দুটো পুকুর। মাছে ভর্তি। চারপাশে গাছগাছড়া। অধিকাংশই ফলের। পাকলে ফল ছেলেমেয়েদের মুখে ওঠে না। বাজারে যায়।
একমাত্র ছেলে কামাল খন্দকার। বয়স আটাশ-ঊনত্রিশ। বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। তারপরও কামালকে বিয়ে করায় না জামাল। ভাবে- কত্তগুলো টাকা খরচ হয়ে যাবে বিয়েতে। কামাল বাপের মনের ভাব বোঝে। বলে, ‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ের দরকার নাই আব্বা।’
সপ্রশংস দৃষ্টিতে জামাল কামালের দিকে তাকায়। বলে, ‘তুমিই একমাত্র বুঝতে পারছ আমাকে। টাকা যে কী মূল্যবান জিনিস, তোমার মা-বোনে বুঝতে পারল না। মিতব্যয়ী হইও আব্বা। সুখ তোমার হাতে এসে নিজে ধরা দিব।’ কামাল আব্বার কথায় জোরে জোরে মাথা নেড়ে সায় দেয়। জামাল ভীষণ খুশি হয়।
একদিন জামালকে মরণরোগে ধরে। ডাক্তার-কবিরাজ জবাব দেয়- আর বেশি দিন হাতে নেই জামালের।
কামালকে একদিন একান্তে কাছে ডাকে জামাল। ‘বাপরে, বেশি দিন বাঁচব না আমি। অনেক কষ্ট করে জমিজিরাত ধনদৌলত করছি। জলে ভেসে যেতে দিয়ো না বাপ।’ একটু থেমে জামাল আবার বলে, ‘পাশের গ্রামে আমার এক বন্ধু আছে। সেই বন্ধুরে চেন তুমি। শফিক আকন্দ। শফিক খুব ভালো। আমার সঙ্গে শফিকের চরিত্রের অনেক মিল। আমি মারা গেলে বাপ, তুমি তার কাছে যাইও। সে তোমারে মিতব্যয়িতা সম্পর্কে উপদেশ দিব। তার কথামতো চইলো বাপ।’ হু হু করে কেঁদে উঠল জামাল, ‘তোমারে আমি বিয়া করিয়ে যেতে পারলাম না রে কামাল।’
একদিন জামাল খন্দকার মারা গেল। শোক নেমে এলো পরিবারে। কিপটে হলেও পরিবারের গার্জেন ছিল তো! চল্লিশা চুকে গেলে এক সন্ধ্যায় কামাল শফিক আকন্দের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। বাপ যে বলে গেছে শফিক চাচার সঙ্গে দেখা করতে!
বসার ঘরে বসতে দিল কামালকে। কামাল বলল, ‘বাপের নির্দেশনায় চাচার কাছে মিতব্যয়িতা শিখতে এসেছে।’ শফিক আকন্দ খুশি হলো খুব।
‘তা বাজান, এক-দুই কথাতে তো আর মিতব্যয়িতা সম্পর্কে বোঝান যাইব না! ঘণ্টা দেড়েক-দুইয়েক লাগবই। বাতিটা নিবাই দিই কামাল? কারেন্ট বাঁচব, টাকা খরচ কম হইব।’ বলে সুইচটা অফ করে দিল শফিক।
তারপর ঘণ্টা দুই ধরে মিতব্যয়িতা সম্পর্কে কামালকে নানান উপদেশ দিয়ে গেল শফিক আকন্দ। কামাল মনোযোগ দিয়ে শফিক চাচার সব কথা শুনে গেল। শেষে শফিক আকন্দ বলল, ‘কথা এখানে শেষ বাজান। ঠেকায় পড়লে আবার আইসো। বহু দূর যাইতে হবে তোমাকে। এখন উইঠ না, বাতিটা জ্বালাইয়া দিই।’
‘দাঁড়ান চাচা, অখন জ্বালাইয়েন না। লুঙ্গিটা পইরা লই।’
‘লুঙ্গিটা পইরা লই মাইনে! তুমি কি এতক্ষণ ন্যাংটা হইয়া বইসা ছিলে?’
‘হ চাচা।’
‘মাইনে! শফিক আকন্দের চোখ কপালে ওঠে।
‘আপনি বললেন, ঘণ্টা দুইয়েক কথা বলবেন। তাই লুঙ্গিটা খুলে বইসলাম। অই দুই ঘণ্টা তো আয়ু বাড়ল লুঙ্গিটার! কী চাচা, খারাপ করছি?’
বাতিটা জ্বালাতে জ্বালাতে শফিক বলল, ‘মিতব্যয়িতা শিখবার জন্য আমার কাছে তোমারে আর আইতে হইব না বাজান। কিপটেমি শিখতে আমিই তোমার কাছে মাঝেমাঝে যাব।’