গল্প
ব্রিজটার বয়স কত আর, চল্লিশ কিংবা পঁতাল্লিশ। হঠাৎ বয়সের প্রসঙ্গ কেন? তাহলে প্রসঙ্গ কী? প্রসঙ্গ ব্রিজ। যে ব্রিজ দিয়ে প্রতি মুহূর্তে তাকে যাওয়া-আসা করতে হয়। প্রতি মুহূর্ত! কাকে? আবার প্রশ্ন! সারা দিন কতজনই তো ব্রিজ পারাপার হয়। না। সবার সাথে তার একটা মৌলিক তফাত পাওয়া গেছে। অন্যরা চব্বিশ ঘণ্টায় একবার, দুবার; ধরে নেয়া যায় দশবার। তিনি প্রতি মুহূর্তে। অদ্ভুত তো! কীভাবে সম্ভব? তার কি আর কোনো কাজ নাই? আছে তো। অজস্র কাজ তার। ব্রিজ পেরোনোও অন্যতম কাজ।
বুঝা গেছে, থাক ভাই। এতো প্যাঁচঘোচ খোলা আমাদের সাধ্যের বাইরে। আমরা দেখতে পাই বা না পাই, তিনি সত্যি সত্যি প্রতি মুহূর্তে ব্রিজ পেরোচ্ছেন। ব্রিজ দিয়ে যারা পারাপার হয় তাদের সবাইকে তিনি দেখেন। তাকে কেউ দেখে না, উপলব্ধি করতে পারে। ব্রিজ পেরোচ্ছে মানুষ, গাড়ি; জীবজন্তুও। তাদের মধ্যে একজন, প্রতিদিন আসেন, পার হন না। নিজে আসেন না, মানে আসতে পারেন না। কেউ তাকে দিয়ে যায়। একেক দিন একেকজন পশ্চিম শহরতলি থেকে ব্রিজের মাঝ বরাবর নির্দিষ্ট একটি জায়গায় দিয়ে যায়। ওখানে মাদুরের মতো এক টুকরো চট বিছিয়ে তিনি বসে পড়েন। মাথার ওপরে পলিথিনের একটি ছাউনির মতো টানিয়ে দেওয়া হয়। ওই পলিথিন রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-বাতাস কিছুই আটকাতে পারে না। ওটা সান্ত্বনা। অর্থাৎ, মাথার ওপরে একটা কিছু আছে, এই আরকি। এই ভরসায় তিনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, হয়তো বছরের পর বছর দিব্যি টিকে আছেন। এটা কি ব্রিজের বাস্তবতা নাকি মানুষের?
ব্রিজে নিত্যদিনের দুজনকে পাওয়া গেল। একজন থামেন না, প্রতি মুহূর্ত পারাপার হন। আরেকজন, পারাপার হন না, বসে থাকেন। বসে থাকাজন সন্ধ্যা হতে হতে চলে যান। চলে যান বলতে যেভাবে কেউ দিয়ে যায়, সেভাবেই নিয়ে যায়।
সার্বক্ষণিক চলাচলকারীকে কেউ দেখেনি, অনুভব করেছে প্রবলভাবে। বসে থাকাজনকে দেখা যায়। অনেকে খেয়াল করে না। যারা খেয়াল করে তারা দেখে, মলিন চেহারা। ময়লা, ছেঁড়া জামাকাপড়-টুপি, দাড়ি। কিছু চাওয়ার ভঙ্গিতে হাত পেতে ব্রিজের ফুটপাতে বসে থাকেন। পায়ে হেঁটে যারা ব্রিজ পেরোয়, বসে থাকা লোকটা তাদের হাঁটাচলায় বিঘ্ন ঘটান। বলা দরকার, এই পায়ে হাঁটাদের বিঘ্নসৃষ্টিটুকুই তার জীবিকার উৎস্য। যারা সাঁই সাঁই করে পেরোয় তাদের থেকে বসে থাকা লোকটি কিচ্ছু পান না। বরং বিঘ্নভোগীরাই কেউ কেউ টাকাপয়সা দেয়। কী বিচিত্র! যাদের বিঘ্ন হচ্ছে তারা তাদের বিঘ্ন দূর করার বদলে বিঘ্ন জিইয়ে রাখার জন্য বিঘ্নকারীকে দক্ষিণা দিচ্ছে।
ব্রিজে আজকাল প্রায়ই জানজট থাকে। ট্রাক, বাস, অটো, ভ্যান, সাইকেল, মোটরসাইকেল, পথচারী সবটা মিলে এমন অবস্থা দাঁড়ায়, তখন ফুটপাতটাও জটের কবলে চলে যায়। মনে হয় একটা পিঁপড়াও বুঝি আর কোনোদিন ফাঁসতে পারবে না। জানবাহনে অসহায়ভাবে বসে থাকাদের চোখের দিকে তাকানো যায় না। কেউ বুঝতে পারে না জটটা কত সময় স্থায়ী হবে। জটে আটকে থাকাদের মলিন লোকটির ওপর বিরক্ত হতে দেখা যায়। এ সময় বিঘ্নভোগীরা টাকাপয়সার বদলে খিস্তি করে, গালি দেয়। আকাশ থেকে ব্রিজটা হাইফেন চিহ্নের মতো দেখায়। প্রকৃতপক্ষে ব্রিজতেও হাইফেনই। একেকটা ব্রিজ সৃষ্টির পেছনে একেকরকম কাহিনি থাকে। আমাদের ব্রিজের কাহিনিটা রাজনৈতিক। তার আগে বলে নিই, এই ব্রিজের প্রায় এক কিলোমিটার ভাটিতে ব্রিটিশযুগের একটা রেলব্রিজ আছে। সম্বন্ধবিচারে রেলব্রিজটা সড়কব্রিজের বড় ভাই।
বলছিলাম, আমাদের ব্রিজটা সৃষ্টির নেপথ্যে রাজনৈতিক কাহিনি আছে। ব্রিজটা জন্মাবার অনেক আগে রেলব্রিজটার জন্ম। তারপর অনেক বছর নদীটা কোনো ব্রিজ প্রসব করতে পারেনি। রেলব্রিজে ট্রেন চলতে পারলেও, হেঁটে চলা মানুষ এবং অন্যান্য জান চলতে পারে না। নদীর এক পাড়ে শহর আরেক পাড়ে শহরতলি। দুটি জনপদের বসবাস কাছাকাছি হলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এখানে খেয়াঘাট ছিল। খেয়া পারাপার অত্যন্ত সীমিত। এটা বাংলাদেশের উত্তর জনপদের গল্প। এ অঞ্চল ধরতে গেলে নৌকোর ব্যবহার জানেই না। সাঁতরে পার হওয়ার মতো ছোট নদী নয় পুনর্ভবা। দিনাজপুরের মতো একটি প্রাচীন শহরের সাথে পশ্চিম জনপদ বিচ্ছিন্নই থেকে যাবে? চাগিয়ে উঠতে থাকলো মানুষের চাহিদা, ‘ব্রিজ চাই, একটা ব্রিজ চাই।’
বড় বড় নেতা, মন্ত্রী, সরকার প্রধানরা ভোটের দরকারে সফরে এলেই ব্রিজের দাবির মুখে পড়তে হয়, ‘ব্রিজ চাই, একটা ব্রিজ।’
দাবি আর প্রতিশ্রুতির ধস্তাধস্তি শেষে হাজির হলো ধোঁকাবাজির সমাধান। রেলব্রিজের ওপর বসলো কাঠের পাটাতন। নেতার ভাষণে প্রস্ফুটিত হলো ধোঁকার রহস্য।
‘ভাইসব, রেলব্রিজের খুব কাছে আরেকটা ব্রিজ হলে রেলব্রিজটা ভেঙে পড়বে পানির তোড়ে।’
কাঠের পাটাতনের সীমিত চলাচলে দুর্ঘটনার দ্বার উন্মোচিত হলো। দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের আহাজারিতে আবার তীব্র দাবি, ‘ব্রিজ চাই। কিচ্ছু চাই না, একটা ব্রিজ চাই।’
সরকার বদলে যায়, দাবির বদল ঘটে না। দাবি একটাই, ‘ব্রিজ চাই, একটা স্বপ্নের ব্রিজ।’
২. পাখির চোখে অবশেষে দৃশ্যমান হলো সংযোগ চিহ্নের মতো একটা রড-সিমেন্টের ব্রিজ। আনন্দের পদযাত্রা স্বপ্নস্রোতে প্রবাহিত হলো ব্রিজের ওপর দিয়ে। অল্পদিনে পদযাত্রা সংকুচিত হয়ে জানযাত্রা থেকে জানজটে পরিণত হলো। ব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচলে এখন সেই অদৃশ্য সর্বত্রগামী ছাড়া সবাইকে বিঘ্ন পোহাতে হয়। মলিন লোকটিও যানজটের দুর্ভোগ টের পান উপার্জন তলানিতে গেলে। যানজটে অতিষ্ঠ খ্যাপারা মলিনকে ডিঙ্গোবার সময় দাঁত খিঁচিয়ে গালি দেয়, ‘এই ফকিরের বাচ্চা, তোর আর বসিবার জাগা নাই।’
মলিন নির্বিকার। তিনি শুধু রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, ঠান্ডা, গরম, লু সবকিছুতে ব্রিজের ফুটপাতে রপ্ত করেছেন টিকে থাকার কৌশল। ব্রিজের ওপর তুচ্ছ প্রয়োজনে হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে যায় মানবস্রোত। তীব্র দুপুর কিংবা বৃষ্টিবেলার চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার মতো হাঁসফাঁস করতে থাকে মানুষের অসহায় চোখ।
ব্রিজে স্তব্ধতার নূতন উপসর্গ এক্সিডেন্ট। ঠিকঠাক তীব্র দুপুরে একদিন মালবোঝাই ট্রাক মলিন-প্রবীণ বরাবর পিসে দিলো একজন ভ্যানচালকের আপাদমস্তক। হরিহাট কাণ্ড শুরু হলো ব্রিজের ওপর। আটকে পড়া সহস্র জান উপেক্ষা করে দুপ্রান্ত থেকে ভেসে আসতে থাকলো মানবপোকা চেপ্টালাগা ভ্যানচালকের নিথর লাশদর্শনের আকর্ষণে। ট্রাকের চালক-হেল্পার কৌশলে মিশে গেছে পোকাস্রোতে। গুজবের ডালপালা বাতাসে বাতাসে, মানুষের কানে। ট্রাকভর্তি চোরাই মাল। মোবাইল ফোনে লাশের ফটো। পুলিশের পিছে পিছে শহর থেকে ছুটে এলো সাংবাদিকের লাটবহর। তীব্র জটে ঢুকে পড়লো টিভিক্যামেরা। চোরাই মালের ঘ্রাণ যাকে বলে।
৩. আমরা মলিন সেই প্রবীণের প্রতি মনোযোগ হারিয়েছি। আকারআয়তনহীন সর্বত্রগামীর কথাও ভুলতে বসেছি। সাংবাদিক মহাশয়েরা জিগ্গাসাবাদ আর ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। একজন তরুণ মাউথপিসধারী ফেকে নাকি বুম বলে মলিনকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘চাচা, আপনি কী দেখেছেন? দোষ কার, ভ্যানচালক নাকি ট্রাক ড্রাইভারের?’
মলিন বুঝতে পারেননি তরুণ তাকেই প্রশ্ন ছুড়েছে এবং তার দিকেই হাঁ করে আছে ক্যামেরা। তরুণ উচ্চস্বরে আবার প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘চাচা, আপনি কি দেখেছেন?’
ভাবলেশহীন মলিন জবাব দেন, ‘মুই কিছু দেখা পাঁও না বাবা।’
বিস্মিত হতাশ কণ্ঠ তরুণের, ‘দেখা পান না মানে, আপনি অন্ধ?’
মলিন তখনো ভাবলেশহীন, ‘মুই কানা মানুষ বাবা। মোক দশটা টাকা দেও।’
‘হেৎ, চল রে। এর ঠে শুনিবার কিছু নাই। ভিডিও ক্লিপটা থুইস ত, কাজে লাগাবা হবে।’
চরম বিরক্তি সাথে নিয়ে তরুণ মহাশয় অন্য দিকে ছুটলেন। ব্রিজের পূর্ব-পশ্চিমের তফাতটা আত্মগোপনে থাকলো।
সর্বদা সর্বত্র চলাচলকারী আকারআয়তনহীন সবজান্তাকে কেউ প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন করবে কীভাবে, তাকে তো কেউ দেখে না। শুধু অস্তিত্ব অনুভব করে। বুঝতে পারে তিনি আছেন। তিনি সব দেখেন এবং জানেন। তবু তার কাছে প্রশ্ন নেই।
ব্রিজে প্রতিদিন ঘটনার পুনরাবৃত্তির সাথে পাল্লা দিয়ে নূতন ঘটনাও ঘটতে থাকে। নূতন-পুরাতনের প্রচলিত সাক্ষী মলিন ভিখিরি। তিনি কিছুই দেখেন না, শোনেন কি না কেউ জানে না।
৪. একদিন শ্রাবণ মেঘের বৃষ্টি নামলো আষাঢ়ে। স্নানের ফুর্তিতে গাছেদের আর মাছেদের উৎসবে ভেসে গেলো ব্রিজের আকাশ। গাছের আর মাছের অস্তিত্ব অনুভূতিকে স্পর্শ করলো অনেকদিন পর। ব্রিজের নিচে নদী, নদীতে পানি, পানিতে মাছ- এমন স্বাভাবিকতাও মানুষ ভুলে থাকতে পারে। গাছেদের আর মাছেদের বৃষ্টিউৎসব মানুষদের উপেক্ষার তোয়াক্কা করে না।
জলজদের প্রজনন মেলা বসে আষাঢ়ে বৃষ্টি এলে। ওরা যৌনসুখের রঙ্গিন চোখে আকাশ দেখে। মেঘের ভেলায় ভাসতে দেখে পাথরের ব্রিজ। ব্রিজে দোল খেলতে খেলতে বয়ে যাওয়া মানবপোকা। মানবগাড়ি ভাসতে থাকে মেঘের ভেলায়। সর্বত্রগামী বাতাস মায়ার জগতে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। জলজ দেখতে পায় ব্রিজের ওপর মেঘের সমান উঁচুতে শুভ্র দাড়িটুপিআলখাল্লায় স্মিতহাস্যে দাঁড়িয়ে ট্রাফিকের মতো হাত নাড়ছেন একজন অন্ধ ভিখিরি। সম্ভবত ভিখিরি আর অন্ধ নন। মলিনতার কোনো রেশও নেই। তিনি এখন দেবদূত। তাঁর হাতের ইশারায় মেঘের ভেলা, মানুষের স্রোত, থামছে-যাচ্ছে। সর্বত্রগামী বাতাস সর্বত্র গমন করছে আপন মর্জিতে।